দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দুই তৃতীয়াংশই হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যায় বলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএইউ) এক গবেষণায় বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যথাযথ জরুরি চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই ও অধিকাংশ আহত ব্যক্তি প্রাথমিক চিকিৎসা পায় না।
গবেষণায় সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনাকবলিত মানুষের চিকিৎসার জন্য প্রথম ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় যথাযথ চিকিৎসা পেলে আহতের মৃত্যুহার কমে যাবে এবং তারা দ্রুত আরোগ্য লাভ করবেন।
গতকাল রবিবার বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তনে ‘ফরমুলেটিং প্রোটোকল ফর ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস ফর রোড ক্র্যাশ ভিকটিম’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন অনুষদের ডিন ও পাবলিক হেলথ ইনফরমেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল হক এ গবেষণা পরিচালনা করেন। বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগ এ উপলক্ষে এক কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালায় বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পেতে হলে উন্নত দেশের মতো স্বাস্থ্যবীমা জরুরি। স্বাস্থ্যবীমা থাকলে যেকোনো জরুরি অবস্থায় রোগীদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করা যাবে। হাসপাতালগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত গরিব ও দুস্থ রোগীদের জন্য সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ফান্ড থাকা দরকার ও রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের জন্য জরুরি ব্যবস্থা থাকা দরকার।’
তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দুর্ঘটনাকবলিত মানুষের সেবার জন্য একটি ফান্ড রাখার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে হাসপাতালগুলোর আর্থিক সমস্যায় পড়তে না হয়। এজন্য সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সড়ক নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফান্ড গঠনে এগিয়ে আসতে হবে। সড়ক নিরাপত্তা আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। আইনি জটিলতার কারণে দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিদের উদ্ধার কাজের জন্য সাধারণ মানুষ এগিয়ে আসতে ভয় পায়।
উপাচার্য আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ পরিবহন শ্রমিকদের চোখের রোগ, বিশেষ করে ছানিপড়া, চোখে ঝাপসা দেখা, অতিরিক্ত ও টানা পরিশ্রম করাসহ শারীরিক অসুস্থতা অক্ষমতা। এই পরিবহন শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। চোখের সমস্যার জন্য প্রতি বছর কমপক্ষে দুবার চোখ পরীক্ষা করাতে হবে। ছানিপড়া চালকদের দ্রুত অপারেশন করার উদ্যোগ নিতে হবে। গবেষণায় বলা হয়, প্রতি বছর সারা বিশ্বে ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় এবং ২০-৫০ মিলিয়ন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়। এদের অধিকাংশই নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের মানুষ।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, দেশের সড়ক, মহাসড়ক ও রাস্তার সংখ্যাসহ সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা যত বাড়বে, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুর্ঘটনা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, প্রশমন ও প্রতিকারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় জাতীয় সেবা নম্বর ৯৯৯-এর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার হাসপাতাল, উদ্ধাকারী দলের সঙ্গে দ্রুততর সময়ে যোগাযোগ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে। দেশের সড়ক, মহাসড়কের পাশে প্রতিষ্ঠিত ট্রমা সেন্টারগুলোকে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে হবে। এর বাইরেও সেসব এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী দল প্রস্তুত রাখতে হবে। এ দলের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন পেশার মানুষ অন্তর্ভুক্ত করে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ডা. মো. আখতারুজ্জামান, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন আরটিআই প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ ইউনিট (সিআইপিআরবি) পরিচালক ডা. সেলিম মাহমুদ চৌধুরী।
