পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজই সুষ্ঠুভাবে সম্ভব নয়। একটি নিখুঁত পরিকল্পনা করতে হলে যেমন তার খুঁতগুলোকে বুঝতে হয় তেমনি খুঁতগুলোকে দূর করার কৌশলও জানতে হয়। লিখেছেন ব্যবস্থাপনাবিষয়ক লেখক ও প্রশিক্ষক সৈয়দ আখতারুজ্জামান
প্রত্যেকেরই প্রতিষ্ঠানের ধরন ও সংস্কৃতি আলাদা। ফলে পরিকল্পনার ধরন, প্রকৃতি, গুরুত্ব, চরিত্র, বাস্তবায়ন পদ্ধতি, কর্মকর্তাদের বাস্তবায়ন দক্ষতা এ সবই আলাদা আলাদা। কোনো অফিসের ধরন অনুযায়ী প্রতিদিন পরিকল্পনা করতে হতে পারে; আবার কোনো প্রতিষ্ঠানের আগামী ১০ বছরের পরিকল্পনা আগাম করা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু কিছু ব্যাপার আছে যা পরিকল্পনা মাত্রই জরুরি। সে রকম কিছু বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হলো যা সর্বজনীন, কিন্তু বিশেষায়িত নয়।
এক. পরিকল্পনার উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। পরিকল্পনা করে আপনি কী অর্জন করতে চাচ্ছেন সেটা লিখে চোখের সামনে রাখুন। আমরা পরিকল্পনা করতে করতে একসময় উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে সরে যাই। সুতরাং এটা হওয়া চলবে না।
দুই. উদ্দেশ্য অর্জন করতে গিয়ে কী কী কাজ করতে হবে তার তালিকা তৈরি করুন। এই তালিকা তৈরি করার সময় খোলা মনে ভাবুন। কোনো কাজকেই প্রথমে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দরকার নেই। যা মনে আসে লিখতে থাকুন।
তিন. এবার কাজের তালিকার প্রত্যেকটির ডানপাশে অল্প করে ব্যাখ্যা লিখুন। অর্থাৎ কেন এই কাজটি তালিকায় আনলেন, এই কাজটি দিয়ে কী ফল পেতে চান, কাজটি কীভাবে করার কথা ভাবছেন, ইত্যাদি । এই বিস্তারিত লেখাটুকু আপনার ভাবনাকে যেমন স্বচ্ছ করবে তেমনি প্রতিটি বিষয় লিখতে লিখতে আপনি যখন ভাববেন তখন আরও অনেক নতুন কিছু মাথায় আসতে পারে কিংবা আপনি মানসিকভাবে পরিকল্পনা ছকটির সঙ্গে আরও জড়িয়ে যেতে পারবেন। পরিকল্পনাটি যেন আপনার অবচেতন মনেও ছড়িয়ে পড়ে।
চার. সাবলীলভাবে লিখে ফেলা কাজগুলোকে এবার ধরন অনুযায়ী বাছাই করুন। যেমন, প্রশাসনিক কাজ, কাস্টমার সার্ভিসের কাজ, কাঁচামাল কেনার কাজ, হিসাবরক্ষণ সংক্রান্ত কাজ, এভাবে আলাদা আলাদা করে ভাগ করুন।
পাঁচ. এই ধাপে কাজগুলোকে চার ভাগে ভাগ করতে পারেন। ১. খুব গুরুত্বপূর্ণ খুব আর্জেন্ট কাজ, ২. খুব গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আর্জেন্ট নয় এমন কাজ, ৩. গুরুত্বপূর্ণ কাজ, চার. গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন কাজ। এবার সময়োপযোগী ও যিনি কাজটি বাস্তবায়ন করবেন তার দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে কাজগুলোকে গুরুত্ব ক্রমানুসারে সাজান।
ছয়. সময়সীমা ছাড়া বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অর্থহীন। পরিকল্পনার সময়সীমা থাকতে হবে। এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজটি শেষ হচ্ছে কি না সেদিকেও নজর রাখতে হবে। ব্যাপারটাই হচ্ছে তদারকি। তদারকি পরিকল্পনার আরেকটি মূল স্তম্ভ। তদারকি দুর্বল হলে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
সাত. কাজের ধরন অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করুন। কার দায়িত্ব কী এবং কীভাবে পালন করা হবে, দায়িত্ব পালন শেষে রিপোর্টিং কীভাবে হবে ইত্যাদি। যতটা বিস্তারিতভাবে পরিকল্পনা করা যায় ততই ভালো। দায়িত্ব বণ্টন ব্যাপারটিতে একটু সময় নিন। নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন যাকে দায়িত্ব দিচ্ছেন তিনি আসলেই দক্ষ কি না।
আট. মাস্টার পরিকল্পনার মধ্যে থাকে ছোট ছোট আরও অনেক পরিকল্পনা। সেখানে কার দায়িত্ব কী এটা নির্ধারণ করে দিতে হবে আগে থেকেই। যদি আপনি নিজেই কোনো দায়িত্ব বেছে নেন তাও উল্লেখ করুন। যাতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নকালে একটি শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
নয়. এই পরিকল্পনা কতটা সফল কিংবা ব্যর্থ তা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে নির্ধারণ করতে হবে। এই মূল্যায়ন আপনাকে আরও দক্ষ পরিকল্পনাকারী হতে সাহায্য করবে। পরবর্তীতে পরিকল্পনা তৈরি করা ও তা বাস্তবায়নে আপনি আরও চৌকস হতে পারবেন।
দশ. যদি কোনো কারণে পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসে তাহলে বিকল্প পরিকল্পনা কী হবে। একজন চৌকস পরিকল্পনাকারী অবশ্যই একাধিক বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেন।
যারা পরিকল্পনা তৈরিতে নিজেকে অভিজ্ঞ মনে করেন না, তারা অভিজ্ঞ কারও মতামত নিতে পারেন। তবে অফিসে বা জীবনের নানা ক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য পরিকল্পনা করা দারুণ অভ্যাস।
