গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় গড়ে আড়াই থেকে সাড়ে তিন টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ২৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের (ইউনিট-৩) ইউনিট প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৮৬৬ টাকা। পিডিবির এমন অন্তত ১৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে যেগুলোর উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকতাকেও হার মানিয়েছে।
যান্ত্রিক ত্রুটি আর জ্বালানি স্বল্পতার কারণে দিনের পর দিন এসব কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য ব্যয় হওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে বলে পিডিবির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সুবিধা দিতেই এমন কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পিডিবির লোকসান বাড়ছে। সরকারের ভর্তুকি আর পিডিবির লোকসান সামাল দিতে ভোক্তা পর্যায়ে দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে বিদ্যুতের দাম।
নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে থাকে পিডিবি। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে পিডিবির নিজস্ব কেন্দ্র থেকে ১৩ হাজার ৩০৬ কোটি টাকার বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। ভারত থেকে আমদানি করেছে ১০ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকার বিদ্যুৎ। এ ছাড়া অন্যান্য সরকারি, বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আরও প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ কিনেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানিভিত্তিক উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি গড় উৎপাদন ব্যয় হয়েছে ১১ টাকা ৩৩ পয়সা। এর আগের অর্থবছরে (২০২১-২২) এই ব্যয় ৮ টাকা ৮৪ পয়সা ছিল।
২০২২-২৩ অর্থবছরে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বনিম্ন উৎপাদন ব্যয় হয়েছে ২ টাকা ১৪ পয়সা। আর পিডিবির গ্যাসভিত্তিক নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সর্বনিম্ন ইউনিট প্রতি উৎপাদন ব্যয় ২ টাকা ৩২ পয়সা এবং গড়ে ইউনিট প্রতি ব্যয় ৫ টাকা ১৩ পয়সা হয়েছে। অথচ পিডিবির অন্তত সাতটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় ইউনিট প্রতি সর্বনিম্ন ৫৮০ থেকে ৪ হাজার ৮৬৬ টাকা হয়েছে।
পিডিবির তথ্যমতে, ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে ২৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন শুরু হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৮ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ ইউনিট। অথচ কেন্দ্রটি পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক ব্যয় হয়েছে ৪১৯ কোটি ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এ হিসাবে ইউনিটপ্রতি ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৮৬৬ টাকা। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের ২২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে মাত্র ৩ টাকা ৩২ পয়সা খরচ হয়েছে একই অর্থবছরে।
জানতে চাইলে পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী (ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র) মো. জহুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র। এখানে জেনারেল ইলেকট্রিকের তৈরি উন্নতমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি কোনো অখ্যাত কোম্পানি না। কিন্তু কেন্দ্রটি চালুর পর ওয়ারেন্টি পিরিয়ড শেষে দুর্ভাগ্যজনকভাবে গ্যাস টার্বাইনের মধ্যে কমপ্রেশার ব্লেডে সমস্যা দেখা দেয়। এটি মেরামতের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন হয়েছে। ইতিমধ্যে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। আশা করছি মার্চ বা এপ্রিলের দিকে কাজ শুরু হবে। অর্থ ছাড়ের অনুমোদন এবং করোনা ও অন্যান্য কারণে কাজটা শুরু করতে কিছুটা দেরি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘হিসাব-নিকাশের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা না থাকায় উৎপাদন ব্যয়ের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারব না।’
ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের (ইউনিট-১ ও ২) ১১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার অন্য একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে সব মিলে পিডিবির ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অথচ এ কেন্দ্র থেকে এক ইউনিট বিদ্যুৎও উৎপাদন হয়নি।
দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক পিডিবির শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ৬২৯ টাকা। ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রটি থেকে এক বছরে মাত্র ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬১২ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। এজন্য ব্যয় হয়েছে ৫৯ কোটি ৫৭ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।
গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত গ্যাসভিত্তিক ১০৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার টঙ্গী বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ১১৩ টাকার কাছাকাছি। অথচ এ কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
জানতে চাইলে পিডিবির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও কেন্দ্রটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আতিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক সময় গ্যাসের অভাবে এক মাস বন্ধ থাকল। আবার এক মাস পর গ্যাস পেয়ে দুই-তিন দিন চলল। উৎপাদন না হলেও জ্বালানি ছাড়া অন্যান্য ব্যয় তো ঠিকই হচ্ছে। মোট ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনা নেওয়ার ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। আবার গ্যাসের চাপ কম থাকার কারণেও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। তবে বাস্তবে গ্যাসভিত্তিক এই কেন্দ্রের ব্যয় অনেক কম।’ তিনি জানান, গ্যাস সংকটের কারণে কেন্দ্রটি স্ট্যান্ডবাই রাখা আছে। গ্যাস পেলেই শুধু উৎপাদন হয়। আবার জরুরি মুহূর্তে যেমন কয়েক মাস আগে কয়লার অভাবে রামপাল বন্ধ হলে তখন কেন্দ্রটি চালানো হয়।
অন্যদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ ১১৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউনিটপ্রতি ব্যয় ১ হাজার ৮৩৪, শাহজীবাজার ৩৩০ মোগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪ হাজার ৪০৫ এবং শাহজীবাজার ১০০ মেগাওয়াট পি/এস বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫৮০ টাকা ব্যয় হয়েছে।
বাতাসের সাহায্যে বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ায় এতে কোনো জ্বালানির প্রয়োজন হয় না। অন্যান্য কেন্দ্রের মতো জ্বালানি নিয়ে সমস্যা না থাকলেও সিরাজগঞ্জে পিডিবির ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ৫৯০ টাকা। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটি থেকে এক বছরে মাত্র ২৫ হাজার ৩১৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। অথচ পরিচালনা ও অন্যান্য খাতে এক বছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। তুলনামূলক কম মূল্যের পরিবেশবান্ধব কেন্দ্রটির সংস্কারে গাফিলতি থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে সৈয়দপুর গ্যাস টার্বাইন বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ৮২২, এসবিউ হরিপুর ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৮৯৭ টাকা উৎপাদন ব্যয় হয়েছে।
এদিকে ভেড়ামারা বিদ্যুৎকেন্দ্রে গত অর্থবছরে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও এর পেছনে পিডিবির এক বছরে ব্যয় ২০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বরিশাল গ্যাস টার্বাইন বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরে ৮ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা একেবারেই অযৌক্তিক, চরম অন্যায়। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে জনপ্রিয় করতে, তাদের ব্যবসাকে প্রমোট করা এবং বেশি দামের বিদ্যুৎ কেনাকে যৌক্তিক প্রমাণ করতেই সরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এ অবস্থায় নেওয়া হয়েছে। সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে চাহিদার চেয়ে কম গ্যাস সরবরাহ করে উৎপাদন ব্যয় বেশি দেখানো হচ্ছে। যাতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বেশি পরিমাণে বিদ্যুৎ কেনা যায়। এটা সরকারের এক ধরনের পলিসি।’ তিনি বলেন, সরকারি অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সেগুলো বন্ধ করা হচ্ছে না। এতে অপারেশনাল ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এটা এক ধরনের কৌশল। যেসব কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেগুলো বন্ধ করা উচিত।
তার মতে, অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয় সমন্বয় না করে বারবার বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। যার পরিণতি ভয়াবহ। সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করতে চাইছে। কিন্তু এজন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থ দরকার তা সমন্বয় করে গ্যাস-বিদ্যুতের যে দাম হবে, তা সোনার চেয়েও দামি হবে।’
ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করার সক্ষমতা সরকারের নেই। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি সরবরাহ করতে সরকারের ডলার খরচের সক্ষমতা সীমিত হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিকীকরণ থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের উন্নয়ন এবং অযৌক্তিক ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বন্ধ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’
