প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো আম্বর শাহ শাহি মসজিদ। যার অবস্থান রাজধানীর কারওয়ান বাজারে। এই স্থাপনাটি দিন দিনই নগরবাসীর দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছে। অথচ কারওয়ান বাজারের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার নাম। এই মসজিদকে বলা হয়, কারওয়ান বাজারের ঐতিহ্য এবং এটিকে এই এলাকার সবচেয়ে পুরনো স্থাপনা বলে অভিহিত করেছেন ইতিহাসবিদরা। মুঘল আমলে এখানকার সরাইখানায় পথিক আসতেন বিশ্রাম নিতেন। তাদের অনেকেই এই মসজিদে নামাজ আদায় করতেন।
মসজিদটির নির্মাণশৈলী বেশ আকর্ষণীয়। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কালো পাথরের তৈরি মেহরাব। মূল মসজিদটি আকারে ছোট হলেও, এর সৌন্দর্য নজর কাড়ে মুসল্লিদের। আম্বর শাহ মসজিদের মূল ভবনের ওপরে শোভা পাচ্ছে তিনটি গম্বুজ। এগুলো বাড়িয়েছে স্থাপনার বাইরের দিকের সৌন্দর্য। বিভিন্ন সময় সংস্কারের কারণে, মসজিদটির অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছ। এর পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি, আশপাশের স্থাপনার কারণে এখন সরাসরি দৃষ্টিগোচর হয় না মসজিদের মূল স্থাপনা। ঢাকার প্রাচীনতম মসজিদের তালিকায় এর অবস্থান ২২তম। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের শেকড় অনুসন্ধানে এই স্থাপনার গুরুত্ব অনেক বেশি।
বর্তমানে আম্বর শাহ শাহি মসজিদের প্রধান খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা আতাউল্লাহ। তিন গম্বুজবিশিষ্ট একতলা মসজিদ ভবনটি দেখতে খুবই সুন্দর। কয়েক বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী মূল কাঠামো অবিকৃত রেখে চুন-সুরকি দিয়ে সংস্কার করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা ও দানের টাকায় এ কাজ চলছে। পুরনো মসজিদ ভবনটি প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গার ওপর অবস্থিত। মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরনো ভবনের পাশে নতুন মসজিদ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। দুই জায়গাতেই নামাজ আদায় করা হয়।
মসজিদটি মুঘল স্থাপত্য। প্রাপ্ত ইতিহাস মতে, মসজিদের নির্মাণ সাল ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দ। নির্মাতা হলেন- খাজা আম্বর। তিনি সুবেদার শায়েস্তা খানের প্রধান খোয়াজা ছিলেন। মসজিদটিতে দুটি শিলালিপি আছে। কেন্দ্রীয় মেহরাবের ওপরে স্থাপিত প্রথম শিলালিপিতে আয়াত লেখা রয়েছে। আর কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ওপরে বাইরের দিকে স্থাপিত দ্বিতীয় শিলালিপিতে লেখা আছে নির্মাণ সাল।
মসজিদটির নির্মাণশৈলী অত্যন্ত আকর্ষণীয় কারুকাজময়। তিন গম্বুজের এ মসজিদ ভূমি থেকে প্রায় ১২ ফুট উঁচু একটি উত্তোলিত মঞ্চের পশ্চিম অর্ধাংশজুড়ে অবস্থিত। এ ভিত্তিমঞ্চের শীর্ষে রয়েছে বদ্ধ পদ্ম-পাপড়ি নকশার একটি সারি। এর চারকোণে রয়েছে চারটি বিশাল আকৃতির পার্শ্ববুরুজ।
অষ্টভুজাকৃতির বুরুজগুলো ভিত্তিমঞ্চের চেয়ে সামান্য একটু উঁচু এবং এগুলোর শীর্ষে রয়েছে ছোট ছোট গম্বুজ। পূর্ব প্রান্তে একটি সিঁড়ি পেরিয়ে পাথরের তৈরি ফ্রেমবিশিষ্ট খিলানযুক্ত একটি তোরণ পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। এ সিঁড়িপথের ডান দিকে খাজা আম্বরের খননকৃত কূপটি ছিল, তবে বর্তমানে এটিকে মাটি ফেলে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ভিত্তিমঞ্চের পূর্বদিকে রয়েছে খাজা আম্বরের সমাধি। আদিতে এখানে শুধু পাথরের তৈরি কবর ফলক দৃশ্যমান ছিল। তবে বর্তমানে এর ওপরে ইট দিয়ে একটি ইমারত নির্মাণ করা হয়েছে।