কয়েক বছর আগেও ডুবে যাওয়া ঢাকাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। কেউ কেউ আশাহত হলেও অনেকে আবার আশায় বেঁধেছিলেন বুক। গেল দুই বছরে প্রেক্ষাপট বদলেছে, ইন্ডাস্ট্রি পেয়েছে ব্যবসাসফল সিনেমা এমনকি গড়ছে ব্যবসায়িক রেকর্ডও। দেশের পাশাপাশি সাড়া ফেলছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। তাই এখন আর ঘুরে দাঁড়ানো নয়, নিজেদের সিনেমা নিয়ে বিশ্ববাজারে রাজত্ব করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। গতকালের প্রতিবেদনের পর আজ থাকছে আন্তর্জাতিক পরিবেশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কথা। তাদের কথা শুনেছেন ইমরুল নূর
আট বছর আগে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক চেইনে বাংলাদেশি সিনেমা মুক্তির যাত্রা শুরু হয় বিশ্ব পরিবেশক প্রতিষ্ঠান স্বপ্ন স্কেয়ারক্রোর মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ অলিউল্লাহ সজীবের হাত ধরেই ঢাকাই সিনেমা আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সৈকত সালাহউদ্দিন।
স্বপ্ন স্কেয়ারক্রোর মাধ্যমে রিগাল, সিনেমার্ক, সিনেপ্লেক্স এন্টারটেইনমেন্ট, ভক্স, এএমসি, শোকেইস চেইনসহ বিশ্বখ্যাত চেইনে মুক্তি পাচ্ছে বাংলাদেশি সিনেমা। তারা এখন পর্যন্ত দেশের বাইরে ২১টি সিনেমা মুক্তি দিয়েছে যার অনেকগুলোই ভালো ব্যবসা করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী সৈকত সালাহউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি আমরা বছরে চার থেকে ছয়টি সিনেমা নিয়মিত মুক্তি দিতে পারি তাহলে সম্ভাবনা খুবই ভালো। এখন পর্যন্ত আমরা ২১টি সিনেমা মুক্তি দিয়েছি তারমধ্যে ভালো ব্যবসা করেছে ‘আয়নাবাজি’, ‘ঢাকা অ্যাটাক’, ‘দেবী’, ‘হাওয়া’ ও ‘প্রিয়তমা’। ‘হাওয়া’ কানাডা ও আমেরিকায় ৩,৫৮০০০ ডলারের গ্রস আয় করে যা বাংলাদেশের সিনেমার মধ্যে সেরা। ‘প্রিয়তমা’ গত বছরে সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমা। কানাডা ও আমেরিকায় গ্রস ১,৩২০০০ ডলার। আমেরিকার একটি হল জ্যামাইকা থেকেই টানা ছয় সপ্তাহ চলে রেকর্ড গড়ে সিনেমাটি আয় করে ৭৩০০০ ডলার।’
‘শুরুতে বাংলাদেশে মুক্তির পর বিদেশে মুক্তি পেলেও এখন বাংলাদেশের সঙ্গে একযোগে মুক্তি দিচ্ছে স্বপ্ন স্কেয়ারক্রো। এ পর্যন্ত কানাডা, আমেরিকা, আরব আমিরাত, কাতার এবং ওমানে আমাদের সিনেমা মুক্তি দিয়েছি।’-যোগ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক চেইনে বাংলাদেশি সিনেমা মুক্তি দিয়ে আসছেন অনেক দিন ধরে। সেখানে দেশীয় সিনেমার সম্ভাবনা কতটুকু দেখছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মার্কেটে বাংলাদেশি সিনেমার একটা চাহিদা আছে। ধীরে ধীরে সেটা তৈরি হয়েছে। আমরা যখন এখানে প্রথম সিনেমা মুক্তি দিই তখন কানাডায় শুধুমাত্র একটি সিনেমা হল পেয়েছিলাম। এক হল থেকে এখন আমরা একসঙ্গে ১৫০টির মতো হলে সিনেমা মুক্তি দিতে পারছি এবং সেটা কিন্তু শুধু চাহিদার কারণেই সম্ভব হয়েছে। এখানকার চেইনগুলো মনে করছে বাংলাদেশি সিনেমার দর্শক আছে। এই কারণেই এখন অনেক হলে আমাদের সিনেমা মুক্তি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এটা অবশ্যই সম্ভাবনার। তবে বাংলাদেশের ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে আমরা নিয়মিতভাবে সিনেমা মুক্তি দিতে পারি না। মুক্তির তারিখই নিশ্চিত করতে পারেন না নির্মাতারা। এমনও হয়েছে যে, মুক্তির তারিখ ঘোষণা করেও সেটি পিছিয়ে যায়। এছাড়াও এক বছর আগে মুক্তির ঘোষণা দিয়ে ঘন ঘন মুক্তির তারিখ পরিবর্তন করে, তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। একদম শেষ প্রান্তে গিয়ে আবার পেছায়। এডিট করতে চায়, রিশুট করতে চায়, প্রমোশন ম্যাটেরিয়াল সময়মতো দেয় না যেটা কিনা একদমই অপেশাদার আচরণ অন্তত বিশ্ববাজারে। হলিউড কিংবা বলিউড সিনেমা নিয়ে এমনটা হয় না। কারণ তারা আগে থেকে ঘোষণা দিয়ে দেয় এতে করে পরিচালক, প্রযোজক, হল মালিক কিংবা পরিবেশক প্রতিষ্ঠান সঠিক এবং সুন্দর পরিকল্পনা মতো প্রচার করতে পারে। যদি আমরা সঠিকভাবে অর্থাৎ নিয়মিত সিনেমা মুক্তি দিতে পারি তাহলে বাংলাদেশি সিনেমা এখান থেকে এক মিলিয়ন ডলার গ্রস আয় করতে পারবে। মাল্টিপ্লেক্সের খরচ, প্রমোশনের খরচ বাদ দিয়ে এখান থেকে একজন প্রযোজক দুই কিংবা আড়াই লাখ ডলার ঘরে নিয়ে যেতে পারবে। এরজন্য সিনেমার মুক্তির তারিখটা আগে থেকে ঠিক করে রাখতে হবে, সঠিকভাবে প্রমোশন করতে হবে। এই জায়গাগুলোতে হলিউড কিংবা বলিউড থেকে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি অনেক অনেক পিছিয়ে। এগুলো সমন্বয় করতে হবে।’
অন্যদিকে সাত বছর ধরে সিনেমা পরিবেশনা করছে বায়োস্কোপ ফিল্মস। এরমধ্যেই দেশের বাইরে মুক্তি দিয়েছেন ৩৯টি সিনেমা। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার রাজ হামিদ জানান, ১৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের জায়গা বাংলাদেশের সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন। তার মতে, দেশের বাইরে বাজার সম্প্রসারণ না করতে পারলে নতুন লগ্নি আসবে না। হল সংখ্যা কমতেই
থাকবে। তিনি বলেন, ‘এই ৬ বছরে আমরা দুটো কাজ করতে পেরেছি। এক. আমেরিকা এবং কানাডায় নিয়মিতভাবে বাংলা সিনেমা এনে একটা দর্শক বেজ তৈরি করতে পেরেছি; আর দুই. এখন যেহেতু বাইরের বাজারটা নির্মাতারা ধরতে চান তাই ভালো গল্প, উন্নত নির্মাণ এবং কিছুটা ‘ধার’ দিয়ে যত্ন করে তাদের ছবি বানাতে হচ্ছে। আর তার ফল হচ্ছে ভালো। ‘পরাণ’ এবং ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার ভেতর একটা কমন যোগসূত্র আছে। সিনেমার গল্প নির্বাচন, নির্মাণশৈলী এবং গতানুগতিক প্রবাহ থেকে বেরিয়ে আসবার একটা প্রবল আকাক্সক্ষা আছে। ‘সুড়ঙ্গ’ ৩ দিনে নিউ ইয়র্কের ১টি প্রেক্ষাগৃহে ১৪ হাজার ডলারের বেশি আয় করেছে। এর বাইরে আমি যোগ করব ‘প্রহেলিকা’, ‘১৯৭১ সেইসব দিন’।’
দেশি সিনেমার সম্ভাবনা নিয়ে রাজ হামিদ বলেন, ‘বাইরের বাজারে আমাদের সম্ভাবনা প্রচুর। আমি সেই ‘ক্রসওভার’ ফিল্মটার অপেক্ষায় আছি। আমাদের উচিত কোরিয়ানদের হলিউড জয়টাকে অনুকরণ করা। টেকনিক্যালি হলিউডের ছবি অনেক এগিয়ে আছে তাই টোটাল অ্যাকশনের দিকে এগুলে আমরা বেশি দূর যেতে পারব না। আমাদের কনটেন্ট দিয়ে টেক্কা দিতে হবে, গল্পের উৎকর্ষতা দিয়ে টেক্কা দিতে হবে। ‘প্যারাসাইট’-এর কথা যদি বলি, কোরিয়ান ভাষায় সাব টাইটেল করা একটি সিনেমা অস্কার নিয়ে চলে গেল। আমরা পারব না কেন? এর বাইরে বলব, এখানে বর্তমান সরকারের পজিটিভ ভূমিকার কথা। তবে সরকারি অনুদানের ছবিগুলোর ব্যাপারে প্লট সিলেকশনে আরও বৈচিত্র্য আনতে হবে। ওটিটি এখানে বেশ ভালো একটা ভূমিকা রাখছে। তবে এখানেও সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। তাদের মনে রাখতে হবে, ইনডিভিজ্যুয়াল সেলফোন থেকে আস্তে আস্তে তারা টেলিভিশন স্ক্রিনে চলে আসছেন। কনটেন্টের মোড় দর্শকদের মাথায় রেখে ঘোরাতে হবে। আমি আশাবাদী উত্তর আমেরিকার বাজারে সেই ক্রসওভার কনটেন্ট পেলে স্কাই ইজ দ্য লিমিট।’
একই প্রশ্নের উত্তরে পরিচালক ও প্রযোজক রেদওয়ান রনি বলেন, ‘এই সম্ভাবনাটা অনেক বেশি বলে আমি মনে করি। কারণ ইতিমধ্যেই দেখা গেছে সারা পৃথিবীতে যত বাঙালি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেখানে অনেকগুলো বাংলা সিনেমা ভালো ব্যবসা করেছে। এরমধ্যে আমাদের যে নতুন সিনেমার ঘোষণা এলো সেগুলো নিয়েও অনেকের মধ্যে আগ্রহ দেখা গেছে। এই ছবিগুলো মুক্তি পেলে দেশের পাশাপাশি বিশ্ববাজারেও ভালো ব্যবসা করবে। বাঙালি কমিউনিটির আগ্রহ তো অবশ্যই আছে তার বাইরে অন্যান্য ভাষাভাষীর মধ্যেও বাংলা সিনেমার বাজার বাড়তে পারে বলে আমার ধারণা।’
