বিএনপি ও তার রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত দলগুলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় শুরুতে গুরুত্ব পায় তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। চলতি বছর রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পাওয়া এই তিন দলের মধ্যে তৃণমূল বিএনপি ও বিএনএম রাজনীতিতে হইচই ফেলে দিয়েছিল। দলগুলো ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। কিন্তু গত রবিবার ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, দলগুলোর কোনো প্রার্থী জয় পাননি। বরং যেসব আসনে প্রার্থী দিয়েছিল সবগুলোতেই বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে এবং বেশিরভাগ আসনেই জামানত হারিয়েছেন প্রার্থীরা।
এবার আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির পর তৃতীয় সর্বোচ্চ তৃণমূল বিএনপির ১৩৫ জন প্রার্থী ‘সোনালি আঁশ’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) একতারা প্রতীক নিয়ে ৭৯ জন এবং বিএনএমের নোঙর প্রতীক নিয়ে ৫৬ প্রার্থী লড়াই করেন। কিন্তু তৃণমূল বিএনপির চেয়ারপারসন শমসের মবিন চৌধুরী ও বিএনএমের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ মো. আবু জাফর ছাড়া বাকি প্রায় সব প্রার্থীই জামানত হারিয়েছেন।
এই তিন দলের ভরাডুবির কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, বিএনএমের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ মো. আবু জাফর ছাড়া কোনো দলেরই বড় কোনো নেতার সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার অতীত রেকর্ড নেই। বিএসপির কোনো কোনো নেতার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ভিত্তি নেই। এমনকি তৃণমূল ও বিএনএম নেতারা আগে যে দল করতেন সেই দলের নেতা ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ফলে স্থানীয় রাজনীতি ও ভোটের মারপ্যাঁচ তারা বুঝে উঠতে পারেননি। তৃণমূল ও বিএনএমের যেহেতু দল হিসেবে কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম ছিল না ফলে দেশের কোথাও তাদের কোনো ভোটার ছিল না, যা স্পষ্ট হয়েছে ভোটকেন্দ্রে। এই তিন দলের বড় নেতারাই নিজেদের বেশিরভাগ কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে পারেননি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই তিনটি দলই আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার যেহেতু এবার কাউকে জিতিয়ে নিয়ে আসার দায়িত্ব নেয়নি ফলে ভোটের মাঠে তাদের ভরাডুবি ঘটেছে। সুপ্রিম পার্টির একজন প্রার্থীরও রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় তাদের জয়ের কোনো সুযোগ ছিল না। নির্বাচনে যে ৪২ শতাংশ ভোট পড়েছে তার একটা বড় অংশের ভোটাররা হচ্ছেন আওয়ামী লীগের। এর বাইরে যারা ভোটকেন্দ্রে যান তারাও সরকারের সুবিধাভোগী। ফলে তৃণমূল ও বিএনএম প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার মতো কেউ ছিলেন না। আলোচনায় থাকা তৃণমূল ও বিএনএম নেতারা মূলত বিএনপি থেকে বিভিন্ন সময় পদত্যাগ করেছেন কিংবা বহিষ্কার হয়েছেন তাই বিএনপির যেসব ভোটার ভোট দিতে গিয়েছিলেন, তারাও ক্ষোভ থেকে এ প্রার্থীদের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচনের আগে তিন ‘কিংস পার্টির’ শীর্ষ নেতারা সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। ফলে সাধারণ ভোটাররা তাদের সন্দেহের চোখে দেখেছে। সেই কারণে আওয়ামী লীগবিরোধী ভোটাররাও স্বতন্ত্র কিংবা অন্য প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। তরুণ যে ভোটাররা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তাদের আকৃষ্ট করার মতো কোনো কার্যক্রম দল হিসেবে তারা হাতে নেয়নি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মীজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিতে তাৎক্ষণিকভাবে এই তিনটি দল গড়ে ওঠে। আমি মনে করি, রাজনীতিতে এসব দলকে মর্যাদা দেওয়াই উচিত নয়। যারা কিছু পাওয়ার আশায় নির্বাচনের আগে দল গঠন করে ই ফলাফল তাদের জন্য শিক্ষা। জনগণ যেহেতু তাদের ধান্দা বুঝতে পেরেছে, তাই প্রত্যাখ্যান করেছে। এটা ইতিবাচক।’
প্রয়াত মন্ত্রী নাজমুল হুদা প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন তার মেয়ে অন্তরা হুদা। গত ১৯ সেপ্টেম্বর দলটির প্রথম সম্মেলনে চেয়ারপারসন হন বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী এবং মহাসচিব হন বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার। নির্বাচনের আগে তৃণমূল ও বিএনএম নেতারা নির্বাচনে জিতে সংসদে বিরোধী দল গঠনের কথা বলে হইচই ফেলে দেন। তারা বিএনপির কিছু সাবেক এমপি ও নেতাদের নির্বাচনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন, যা সরকারের কাছে তাদের মূল্যহীন করে তোলে। ফলে আওয়ামী লীগ কয়েকটি দলকে আসন ছেড়ে দিলেও তাদের জন্য ছাড় দেয়নি। ব্যর্থ হয়ে এ দুই দলের নেতারা জয়ের আশ্বাসের চেষ্টা করেন। কিন্তু সরকার কাউকে জিতিয়ে আনতে রাজি হয়নি।
সিলেট-৬ আসন থেকে তৃণমূলের চেয়ারপারসন শমসের মবিন চৌধুরী নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাত্র ১০ হাজার ৯৩৬ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। অল্পের জন্য তার জামানত রক্ষা হয়। এ আসনে বড় জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তৃণমূলের মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের নেতা হওয়ার কথা বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জামানত হারিয়েছেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে তৈমূর মাত্র ৩ হাজার ১৯০ ভোট পেয়েছে। অনেক কেন্দ্রে এজেন্টও দিতে পারেননি তিনি। এমনকি ভোটের দিন কোনো কেন্দ্রের তার আশপাশে প্রত্যাশিত জনগণকেও দেখা যায়নি। অনেকটা একা একাই তিনি কেন্দ্রে কেন্দ্রে ঘুরেছেন। তার আসনে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৩ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী।
আরেক ‘কিংস পার্টি’ বিএনএমের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবু জাফর ফরিদপুর-১ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন। চারবারের এমপি আবু জাফর এ নিয়ে পাঁচবার দলবদল করে আলোচনায় ছিলেন। সাবেক এমপি হওয়ায় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন তিনি জয় পেতে পারেন। গুঞ্জন ছিল তাকে আসন ছেড়ে দিয়ে হলেও সরকার জিতিয়ে নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু তা হয়নি। এ আসনে নৌকার প্রার্থী আবদুর রহমান ১ লাখ ২৩ হাজার ৩৩১ ভোটের বিপরীতে আবু জাফর ২২ হাজার ৪৬৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। বিএনএমের মহাসচিব মো. শাহজাহান চাঁদপুর-৪ আসনের প্রার্থী হয়ে ১ হাজার ৭৪ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন।
বিএসপির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভাণ্ডারীর পক্ষে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী সক্রিয় ছিল বলে আলোচনা থাকলেও তিনি জিততে পারেননি। এ আসনে ১ লাখ ৩৭০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী খাদিজাতুল আনোয়ার সনি। সাইফুদ্দিন মাইজভা-ারী ৩ হাজার ১৩৮ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছেন।
নির্বাচনে ব্যর্থতা নিয়ে তৃণমূলের মহাসচিব তৈমূর আলম খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা কোনো নির্বাচনই হয়নি। আমি হতাশ ও ক্ষুব্ধ। দলের চেয়ারপারসন শমসের মবিন সিলেটে আছেন উনার সঙ্গে কথা বলে আমাদের দলীয় অবস্থান জানাব।’
বিএনএমের মহাসচিব মো. শাহজাহান বলেন, ‘এখনই নির্বাচন নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আমাদের দলীয় মিটিং ডেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করব।’
