হাফেজে কোরআন, ইসলামিক স্কলার ও মিডিয়াব্যক্তিত্ব শায়েখ জিয়াউর রহমান। লন্ডনের মসজিদে উমরের ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন মারকাযুস সুন্নাহ দারুল উলুম ও আর রাহমা হিফজুল কোরআন মাদ্রাসা। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি শিশুদের কোরআন শেখানোর গুরুত্বসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি আপনার পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো সম্পর্কে কিছু যদি বলেন।
শায়েখ জিয়াউর রহমান : প্রথম কথা হলো, আমি খুব বড় লেখক নই; এ পথে একেবারেই নতুন। আমি মূলত জীবন থেকে দেখে সমাজের প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কলম ধরার চেষ্টা করেছি। এটা বইয়ের তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে। কোরআনে কারিম শিক্ষার বই ‘তাজবীদুল কুরআন’, দোয়ার বই ‘চব্বিশ ঘণ্টার সুন্নত আমল ও দোয়া’, মাসয়ালার বই ‘কুরবানীর মাসায়েল’ ও ‘হজ’ এবং আলোকিত সমাজ গঠনের যাদের ভূমিকা ছিল, এমন কয়েকজন আলেমের জীবনী- ‘জীবন যাদের সফল ছিল।’ আমি দেখেছি, দেশে মসজিদ-মাদ্রাসা বাড়ছে, কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে মানুষ কোরআন শেখার প্রতি অমনোযোগী, সেই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে আমলের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে। আবার অভিজ্ঞতার আলোকে দেখেছি, মানুষ হজপালন করতে গিয়ে, নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়, অনেক ভুল করে। বিষয়গুলো আমাকে নানাভাবে পীড়া দিয়েছে, তাই এ বিষয়গুলো নিয়ে বই লেখা হয়েছে।
আশা করি, বইগুলো মানুষের উপকারে আসবে। বিশেষ করে, জীবন যাদের সফল ছিল বই নিয়ে বলব, বইটি আমাদের মাদ্রাসার প্রতিটা শিক্ষকের পড়া দরকার। প্রতিদিন এসব বুজুর্গদের জীবনীর কিছু অংশ বাচ্চাদের পড়ে শোনানোর দরকার।
দেশ রূপান্তর : আপনি দুটি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। আবার কোরআন শিক্ষার ওপর বই রচনা করেছেন, শিশুদের কোরআন শেখানোর বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?
শায়েখ জিয়াউর রহমান : নিজের সন্তানকে স্বচক্ষে কোরআনকে ভালোবাসতে দেখা, প্রত্যেক মুসলিম মা-বাবার জন্য অত্যন্ত গৌরব এবং সৌভাগ্যের। এ জন্য শিশুদের কোরআন শেখার ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাবা-মাকে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ নিয়মে কোরআন শিক্ষা দেবে, আমি বলতে চাই অভিভাবকদের জন্য। সন্তানের হৃদয়কে কোরআনের ভালোবাসায়, কোরআনের শিক্ষায় আলোকিত করতে- তাদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা, সন্তানকে কোরআন তেলাওয়াত করে শুনানো, পারলে কোরআনের গল্পগুলো বলা, এভাবে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে থাকা। যেকোনো কিছুর ফলাফল কেবলমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। আমরা প্রত্যেকেই জান্নাতে আমাদের সন্তানদের সঙ্গে মিলিত হতে চাই। এ জন্য ভালো কাজের জন্য চেষ্টা করা খুব বেশ জরুরি।
দেশ রূপান্তর : অনেক পিতামাতার আগ্রহ থাকে, মেয়েকে হেফজ করানোর। তবে আশঙ্কাও হয় পরবর্তী জীবনে সে হেফজ ঠিক রাখতে পারবে কি না। এক্ষেত্রে কী করণীয়?
শায়েখ জিয়াউর রহমান : আমি বলি, সুযোগ-সুবিধা থাকলে মেয়েকে হেফজ করানো ভালো। তখন ভবিষ্যতের চিন্তাও সেভাবেই করতে হবে, যেন হেফজ ঠিক থাকে। তবে এটা ব্যাপকভাবে হওয়া উচিত নয়। আর চাপ প্রয়োগ করার তো প্রশ্নই আসে না। সহজভাবে যদি হয় ভালো। তবে কোরআন মাজিদ বোঝার মতো যোগ্যতা অর্জন করা প্রত্যেকের কর্তব্য। কোরআন মাজিদের স্বাদ থেকে যেন কেউ বঞ্চিত না হয়।
দেশ রূপান্তর : সন্তানকে কোরআন না শেখানোকে কীভাবে দেখেন, এখন তো অনেক অভিভাবকই এ বিষয়ে পিছিয়ে বা সচেতন নয়।
শায়েখ জিয়াউর রহমান : একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, কোনো এক রমজান মাসের কথা। মাঝবয়সী এক লোক মসজিদে বসে কোরআন মাজিদ খুলে বুক ভাসিয়ে কাঁদছিলেন। নিজেকে কিছুতেই সংবরণ করতে পারছিলেন না। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, চাচা কী হয়েছে? এ কথা শুনে আরও জোরে কেঁদে উঠলেন। এরপর বললেন, বাবা! আমি তো এই পবিত্র কালাম পড়তে পারি না। আমার জীবন তো শেষ প্রায়। আমার কী হবে। আমার বাবা আমাকে ডাক্তার বানিয়েছেন, কিন্তু কখনো কোরআন পড়াননি।
বলুন তো, লোকটির পিতা ওই সময় কবরে কী পাচ্ছিলেন? বাবার বিরুদ্ধে ছেলের দুনিয়াতেই অভিযোগ শুরু হয়ে গেছে! শুধু কি তাই? স্বয়ং নবী কারিম (সা.) ও আল্লাহর দরবারে এমন লোকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন। ‘রাসুল বলবেন, হে আমার রব, আমার কওম এই কোরআনকে পরিত্যাগ করেছে!’ -সুরা ফুরকান : ৩০
তাই আমাদের সচেতন হওয়া কর্তব্য। সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত, এ ব্যাপারে ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানান তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু তাদের ইমানদার বানানোও আপনার কর্তব্য। সন্তান কোরআন পড়তে ও বুঝতে পারে এতটুকু যোগ্যতা তার মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।
দেশ রূপান্তর : বর্তমান সময়ে বাবা-মা কতটা ইসলামিক অনুশাসন মেনে সন্তানকে বড় করছেন?
শায়েখ জিয়াউর রহমান : এটা নির্ভর করে দেশ ও সমাজের ওপর। বাংলাদেশের চিত্র একরকম, ব্রিটেনের চিত্র আরেক রকম। তবে এটা ঠিক যে, মুসলিম বাবা-মাকে অবশ্যই নিজেদের যেমন ইসলামিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে, ঠিক তেমনি সন্তানকে বড় করে তুলতে হবে ইসলামিক নিয়ম অনুসারে। বর্তমানে দেখবেন অনেক সন্তান বিপথগামী হচ্ছে, এ জন্য কিন্তু বাবা-মার বিশাল দায় রয়েছে। তাই বাবা-মার উচিত সন্তান যখন ছোট, তখন থেকেই ইসলামি আদর্শে গড়ে তোলা।
দেশ রূপান্তর : পিতামাতা কীভাবে আচরণ দ্বারা সন্তানকে প্রভাবিত করতে পারে?
শায়েখ জিয়াউর রহমান : পিতা-মাতাই তো সন্তানের প্রথম পাঠশালা। সন্তানের সুশিক্ষার ক্ষেত্রে তাদেরই ভূমিকা বেশি। সন্তানকে ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া, সর্বদা সত্য কথা বলতে অনুপ্রাণিত করা, ইবাদত-বন্দেগির প্রতি আগ্রহী করে নানা কৌশল অবলম্বন করা। কোনো ভালো অভ্যাস বা কাজের জন্য তাকে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজনে পুরস্কারও দেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে সে আগ্রহ পাবে ও প্রভাবিত হবে। এক কথায়, সন্তানের সঙ্গে বাবা-মাকে বন্ধুর মতো কিংবা ভাইয়ের মতো মিশতে হবে। সন্তানকে সময় দিতে হবে। তাহলেই সন্তান সঠিকভাবে গড়ে উঠবে বলে আশা করি।
দেশ রূপান্তর : ব্রিটেনে মুসলমানদের দিনকাল কেমন যাচ্ছে? ধর্মপালনে কি কোনো প্রতিকূলতা আছে?
শায়েখ জিয়াউর রহমান : ব্রিটেনে প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো হয়। ছোটখাটো কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা বাদে সবকিছুই সন্তোষজনক। প্রচুর কাজের ক্ষেত্র রয়েছে। গত এক দশকে ব্রিটেনে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ব্রিটেনের প্রচারমাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের টার্গেট চিত্রায়িত করা সত্ত্বেও মুসলমানদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত গতিতে চলছে। নও মুসলিমদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রসারিত হচ্ছে মসজিদের পরিধি। গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, প্রতি বছর পাঁচ হাজার নারী-পুরুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পবিত্র কোরআনের তাফসির, হাদিস, ফিকাহ, ইসলামের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থাদি ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে ব্রিটেনের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে। ইসলামিক স্কুলের পাশাপাশি গড়ে উঠছে বিভিন্ন মাদ্রাসা। বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বহু মেধাবী আলেম দাওয়াত, তাবলিগ, তালিম ও গবেষণার কাজে ব্রিটেনের নানা স্থানে, নানা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত রয়েছেন।
কেবল লন্ডনে বাস করে চার লাখের বেশি মুসলিম। ব্রিটেনে মসজিদ বা নামাজ ঘরের সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। প্রায় প্রতিটি মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ইসলামিক সেন্টার। মসজিদের ভূমিকা অনেকটা আমাদের দেশের মাদ্রাসার মতোই। শিশু-কিশোরদের ইসলাম ও কোরআন সম্পর্কে প্রাথমিক পাঠদানের ক্ষেত্রে মসজিদগুলোর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটেনজুড়ে রয়েছে তাবলিগ জামাতের কাজ। সমসাময়িক বিবিধ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা, ইসলামি ধ্যান-ধারণার বিকাশ, ইসলামি সাহিত্য সৃষ্টিসহ বিভিন্ন কাজে গণমানুষকে সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে ব্রিটেনে মুসলমানরা নানাধর্মী সেবা ও শিক্ষা সংস্থা গড়ে তুলেছেন। এসব সংস্থা বৈরী পরিবেশে দ্বীনের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে।
দেশ রূপান্তর : ব্রিটেনে থেকে কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন? বিশেষ কিছু কি করতে চান?
শায়েখ জিয়াউর রহমান : ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যহীন, নিরাপদ খাদ্য, সবার জন্য চিকিৎসা নিশ্চিতকরণসহ শিক্ষার আলোয় আলোকিত এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। দেশের জনগণ বিশেষ করে আলেম-উলামারা ভালো ও মর্যাদার আসনে থাকুন- এটা কামনা করি। মনে কিছু স্বপ্ন লালন করি। আল্লাহ চাইলে সব কিছুই সম্ভব। মানুষের জন্য কিছু করার সৎ নিয়ত আর আল্লাহর প্রতি ভরসাই আমার মূল নিয়ামক।
