ভোট মানে উৎসব। অনেক মানুষের সমাগম। কিন্তু তারপর? নির্বাচনের আলোটা যখন নিভে আসে, ঢোল-কাড়া-বাদ্য-বাজনার শব্দ থেমে যায়, তখন একাকিত্ব আসে। সেই একাকিত্ব পূর্ণতা পায় মন্ত্রী নামের মহৌষধ লাভের পর। মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখেন তার সঙ্গে নেই কেউ। তিনি একদিকে আর পুরো মন্ত্রণালয় আরেকদিকে। যারা এতদিন রাজনীতির ময়দানে সঙ্গী ছিলেন, কেউ তার পাশে নেই। চারদিকে শুধু ছোপ ছোপ করে সুবিধালোভীরা। আর মন্ত্রীর উল্টোদিকে ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন একদল আমলা। মন্ত্রীর সঙ্গে যারা যান, তারা নামমাত্র। ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা মন্ত্রীর ফুটফরমায়েশ খাটার জন্য তার সঙ্গে থাকেন মাত্র। বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো কাজে লাগেন না। মন্ত্রী একাকিত্বে গুমরে মরেন। চাকচিক্য আর ভিড়ের মধ্যেও একা তিনি।
মন্ত্রীর সঙ্গে যদি উপদেষ্টা, সিস্টেম অ্যানালিস্ট, আইন বিশারদ, পলিসি বিশারদ, পরিকল্পনাবিদ আর তার মন্ত্রণালয়ের খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশেষজ্ঞ থাকতেন, তাহলে কেমন হতো? যে সাহস নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে তিনি এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, সেই সাহস তিনি দেখাতে পারতেন মন্ত্রণালয় পরিচালনাতেও। কিন্তু মন্ত্রীরা কি তা পারেন? মোটেই না। কোনো মন্ত্রণালয়েরই কোনো নতুন কাজ নেই। নেই নতুন কর্মসূচি, যা কিছু নতুন তা আসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। কখনো কখনো নগণ্য সিদ্ধান্তের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর মুখপানে চেয়ে থাকেন মন্ত্রীরা। তাহলে কি প্রধানমন্ত্রী চান না মন্ত্রণালয়গুলো সাফল্যের পথে চলুক বা নিত্যনতুন উদ্ভাবনী ধারণা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াক। নিশ্চয়ই তিনি তা চান। তাহলে মন্ত্রীদের কাজে নতুনত্ব নেই কেন? এর কারণ হচ্ছে মন্ত্রী আমলা দ্বন্দ্ব। আমলারা মন্ত্রীকে অন্ধকারেই রাখতে চান। মন্ত্রী অন্ধকারে থাকলে আমলার লাভ। কিন্তু এই লাভ যে সব নয়, তা বুঝতে চান না সচিবরা। যতদিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমলাতন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন কোনো কিছুতেই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হবে না। সবাই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করবেন।
এখনকার সচিবরা মন্ত্রীকে ফাইল ধরে ধরে ব্রিফ করেন না। মন্ত্রী ডাকলে সচিবরা যান। না ডাকলে সচিব তার পিএসের মাধ্যমে মন্ত্রীর পিএসের কাছে ফাইল পাঠিয়ে দেন। এ চর্চার কারণে মন্ত্রী তার খাতের বিভিন্ন সমস্যার গভীরে যেতে পারেন না। আর এ সুযোগে সচিব আরও বেশি কর্র্তৃত্বের চর্চা করেন। মন্ত্রীর অজ্ঞতার কারণে সচিব আরও বেপরোয়া আচরণ করেন। তিনি সচিব পদকে উপভোগ করতে শুরু করেন।
সচিবদের লক্ষ্য থাকে মন্ত্রী না বরং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কর্মকর্তাদের পদোন্নতিতে মন্ত্রীর কোনো ভূমিকা না থাকায় তারা পারতপক্ষে কোনো কাজে মন্ত্রীকে জড়ান না, বরং মন্ত্রীর অদক্ষতার চিত্র নানা ফোরামে তুলে ধরে তাদের উপহাস করেন। এটাই এখনকার রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তান আমলে আমলা তৈরি হয়েছে সেনাশাসকের অধীনে এবং সিএসপি হলো তাদের সেরা পণ্য। সেই সিএসপিরা দেশ স্বাধীনের পর পাকিস্তান আমলের পদ, জ্যেষ্ঠতা ও বেতনসহ সব ধারাবাহিকতার সুবিধায় স্বাধীন বাংলাদেশে বহাল তবিয়তেই ছিলেন। তবে পেশাদারিত্ব থাকায় যেকোনো সরকারের সঙ্গে কাজ করতে তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। তারা যেকোনো সরকারের বিশ্বস্ত ছিলেন। তবে তারা রাজনীতিকদের তাদের থেকে নিচেই রেখেছিলেন বলে সেনাশাসকরা দেশ শাসন করেছে। সেই অনুভব এখনো কিছু আমলার মধ্যে রয়েছে। এ কারণেই তারা বলেন, মন্ত্রী কিছুই জানেন না।
ব্রিটিশ সরকারে একজন মন্ত্রীর সহকারীর অনেক পদ রয়েছে। মন্ত্রণালয় বা সচিবালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভোট দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। অস্থায়ী সরকারি কর্মচারী হিসেবে তারা মন্ত্রীকে পরামর্শ বা সহায়তা দেন। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ছাত্রজীবনে একজন অর্থমন্ত্রীর উপদেষ্টা ছিলেন। ক্যামেরন বহুবার তার বক্তৃতায় এ কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশই স্পয়েল সিস্টেমে মন্ত্রীদের জন্য স্পেশাল অফিসার নিয়োগ দেয়। সরকারের নিয়মিত কাজে তাদের হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই। দেশটিতে রাজনৈতিক দলগুলো আমলাদের নিয়োগ দেয়। সরকারের মেয়াদের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও মেয়াদ শেষ হয়। দেশটির প্রশাসনে তিন স্তরের স্থায়ী আমলা রয়েছেন। কিন্তু তারা জ্যেষ্ঠ কোনো পদে যেতে পারেন না। জ্যেষ্ঠ পদে বসেন দলীয় লোকজনই।
বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র নিরপেক্ষ হওয়ার কথা। কিন্তু এ আমলাতন্ত্র বহু আগেই তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। দলীয় কর্মী না হলে পদোন্নতি পাওয়া যায় না। যদি দলীয় লেবাসই ধারণ করবে তাহলে নীতিনির্ধারণী পদে আমলারা কেন। দলীয় নেতারাই সচিবের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কেন আমলাদের হাতে নিগৃহীত হবেন রাজনীতিকরা? এসব কারণেই দাবি উঠেছে সংস্কারের।
২০১৪ সালের সরকারে মির্জা আজম বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সেখানে পূর্ণমন্ত্রী ছিলেন ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক। তাদের সঙ্গে ছিলেন বিভিন্ন ডাকসাইটে সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ অন্যান্য কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে মির্জা আজম মন্ত্রণালয় পরিচালনায় দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। এর নেপথ্য কারণ হচ্ছে তিনি এমন কিছু জুনিয়র অফিসার বাছাই করেছিলেন, যারা ফাইল স্টাডি করে প্রতিমন্ত্রীকে ব্রিফ করতেন। তারা প্রতিমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন বিষয়ের খুঁটিনাটি তুলে ধরতেন। এ অবস্থায় প্রতিমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দিতেন, তাই টিকে যেত। প্রতিমন্ত্রী জুনিয়র অফিসারদের সহায়তায় নিজেকে ঋদ্ধ না করলে সচিব ও পূর্ণমন্ত্রীর চাপে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে যেতেন। জুনিয়র অফিসাররা অফিস শেষে সচিবের অগোচরে গভীর রাত পর্যন্ত ফাইল স্টাডি করে সকালে প্রতিমন্ত্রীকে ব্রিফ করতেন।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর জন্য পিএস খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদ। যদিও অধিকাংশ পিএস পদকে প্রিভিলেজ হিসেবে উপভোগ করেন। প্রশাসনে বহুল আলোচিত বাক্য হচ্ছে ‘পিএসের অনেক ক্ষমতা’! পিএস তার বসের নাম ব্যবহার করে নানা অনিয়ম করেন। অনেকে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দলাদলি করেন। এমনকি খুব দৃষ্টিকটুভাবে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন। পিএসের এসব অপকর্ম ঢাকতে প্রশাসনের কর্মকর্তারাই আবার জোট বাঁধেন। তারা বলেন, ‘পিএসের কী দোষ? মন্ত্রী যেভাবে চেয়েছেন পিএস সেভাবেই করেছে।’
অথচ যেসব পিএস পরিচ্ছন্ন থাকেন, তারা সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে পড়াশোনা করে, দেশ-বিদেশের নীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহযোগিতা করেন। এ কারণে চৌকস মন্ত্রীরা সবসময় পিএস পদে মেধাবী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতেন। কিন্তু রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ঘটলে পিএসদের হয়রানি করা হয়। তাদের পদোন্নতি আটকে দিয়ে ক্যারিয়ার বাধাগ্রস্ত করা হয়। এ কারণে জুনিয়র মেধাবী কর্মকর্তারা আর পিএস হতে চান না।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী, অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার ইত্যাদি থাকলেও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর জন্য সেসব নেই। বাংলাদেশে একসময় কাজের ক্ষেত্র সীমিত ছিল, আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতা আরও সীমিত ছিল। ১৯৯১-এর আগে সরকারে ডিক্টেটরশিপ থাকায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের পিএস বা এপিএস ছাড়া আর কিছুই দেওয়া হয়নি। ইদানীং শাসন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে, আর্থসামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ড বেড়েছে, দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীকে শুধু মন্ত্রিসভার কলেবর বৃদ্ধি বা শোভাবর্ধনের জন্য নয়, বরং খাতভিত্তিক ব্যাপক উন্নয়নের জন্য তাদের কাজে লাগানো দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ক্ষেত্রে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীর জন্য বিশেষ জনবল নিয়োগ করা যেতে পারে। এতে সরকারের নীতি গ্রহণ এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সাসটেইনেবল বা টেকসই হবে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রীরা শুধু শক্তিশালী নয়, আমলাতন্ত্রের ঘেরাটোপকে অতিক্রম করতে সক্ষম হবেন। এতে শুধু যে তাদের অসহায়ত্ব কাটবে তা নয়, একই সঙ্গে সরকারের সুনাম হবে।
২০১৮ সালের আগে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা তাদের পিএস নিজেরাই বাছাই করতেন। ২০১৮ সালে এসে তা কেন্দ্রীয়ভাবে করা হয়েছে। সেই সময় থেকে পিএস কে হবে তা মনোনীত করছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এতে গুণগত কী কী পরিবর্তন হয়েছে, তা জানতে চাইলে একজন সচিব বলেন, তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যে আদেশ জারি করে সেখানে লেখা থাকে মন্ত্রী যতদিন ইচ্ছাপোষণ করেন বা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে। অর্থাৎ মন্ত্রীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। সে ইচ্ছাকে ২০১৮ সালে গুরুত্ব না দিয়ে একটি গ্রুপ নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের পিএস নিয়োগ দেয় বলে গুঞ্জন আছে।
