ইন্টারপোলের পরোয়ানা সত্ত্বেও আরাভ ঘুরছেন প্রকাশ্যে

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৩৬ এএম

জিয়া উদ্দিন ২০ বছর ধরে দুবাইয়ের আলেকজান্ডারে ব্যবসা করছেন। মাস ছয়েক আগে তার সঙ্গে পরিচয় হয় আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী আরাভ খানের। মাসখানেক হলো তার সঙ্গে আরাভের খাতির জমেছে।

সম্পর্কের একপর্যায়ে তাকে সোনার ব্যবসায় পার্টনার হওয়ার কথা বলেন আরাভ। প্রথমে রাজি হননি জিয়া। বুঝিয়ে-সুজিয়ে জিয়াকে একদিন আরাভ স্থানীয় একটি মসজিদে নিয়ে যান। সেখানে তাকে বলেন, ‘খোদার কসম, আপনি ঠকবেন না।’ তার কথায় বিশ্বাস করে ২০ কোটি টাকা দেন জিয়া। পরে জানতে পারেন ব্যবসার ঠিকানাটি ভুয়া। জিয়া টাকা দাবি করলে তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

জিয়ার মতোই রহিম মিয়া নামের আরেক প্রবাসীর কাছ থেকে ৬ কোটি টাকা নিয়েছেন আরাভ খান। পরে তিনিও টের পান, তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তাদের মতো অন্তত ৩০ প্রবাসীকে ব্যবসার কথা বলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আরাভের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি দুবাইয়ে সরেজমিনে গিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাকে হত্যার মামলার আসামি হয়েও দুবাইয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আরাভ। ব্যবসার আড়ালে তিনি নানা অপকর্মে লিপ্ত। তাকে ধরতে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করেছে। তারপরও বহাল তবিয়তে আছেন তিনি। দিব্যি প্রতারণা ব্যবসা চালাচ্ছেন, পাওনাদাররা অর্থ ফেরত চাইলে প্রাণনাশের হুমকিও দিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আরাভ খান ওরফে রবিউল ইসলাম পুলিশ হত্যা মামলার আসামি। নিরপরাধ যুবক আবু ইউসুফকে কারাগারে ঢুকিয়ে তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান। প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেন। পরে সেখান থেকে নাম পাল্টে ভারতীয় যুবক হিসেবে সরকারি কাগজপত্র তৈরি করে দুবাই চলে যান। সেখানে সোনার দোকান উদ্বোধনের জন্য জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও হিরো আলমকে নিয়ে যান। আলোচনায় আসেন আরাভ। নড়েচড়ে বসেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার শীর্ষ কর্তারা। আরাভকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

২০১৮ সালে এসবির পরিদর্শক মামুন ইমরান খানকে হত্যার পর আলোচিত মডেল পিয়াসা ও নজরুল রাজের সঙ্গে আঁতাত করে সোনা কারবারে জড়িয়ে পড়েন আরাভ। দুবাইয়ে গড়ে তোলেন সোনার কারবার। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার আশকারা পেয়েছেন প্রতিনিয়ত। মামলা থেকে রেহাই পেতে নিজের নাম পরিবর্তন করেন। অল্প সময়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়ে যান।

পুলিশ, ব্যবসায়ী ও মডেলরা দুবাইয়ে গেলে তার সান্নিধ্য পেতেন। সোনার দোকান উদ্বোধনের পর আলোচিত আরাভকে নিয়ে বাংলাদেশ ও দুবাইয়ে সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করে। ফেসবুক লাইভে নিজেকে ‘ভালো মানুষ’ দাবি করেন আরাভ। আলোচিত হয়ে ওঠার সময়ই পুলিশ সদর দপ্তর ইন্টারপোল সদর দপ্তরে যোগাযোগ করে নোটিস পাঠায়। তিন দিন পর ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, নামে-বেনামে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে বসে আছেন আরাভ। সর্বশেষ মোবাইল ফোনের দোকান খুলেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি, আজমান, ফুজাইরাহ, শারজাহ, দুবাই, রাস আল-খাইমাহ ও উম্ম আল-কুওয়াইসহ বেশ কিছু এলাকায় আরাভ চলাফেরা করেন।

কয়েকজন ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকারি হিসাবে ১০ লাখের বেশি প্রবাসী আছেন মধ্যপ্রাচের এই শহরে। বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক হয়ে আসা ব্যক্তিরা ছাড়াও অনেকে ব্যবসায়িক চিন্তায় এ দেশে এসে থাকেন; শ্রমিক ভিসায় এসে যারা আত্মনির্রভশীল হয়েছেন, তারাও নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। আমিরাতের দুবাই, শারজাহ ও আজমান অঞ্চলের ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান চোখে পড়ার মতো। আবায়া সেক্টরে অনেক বাংলাদেশি টেইলর কাজ করেন। ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন কয়েক হাজার বাংলাদেশি। আমিরাত জুড়ে যতগুলো বোরকা বা আবায়ার দোকান ও টেইলরিং শপ আছে এর ৮০ ভাগই বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন। এসবে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়েছেন আরাভ। প্রতারণার ব্যবসাও চালাচ্ছেন বেশ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আরাভকে দুবাই থেকে ফেরত আনতে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। আমাদের একটি টিমের দুবাইয়ে যাওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রও নেওয়া হয়েছিল। ইন্টারপোল আমাদের বলেছিল, আরাভকে তাদের নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। ওই দেশের পুলিশপ্রধানের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছিলাম। এর মধ্যেই তথ্য পাওয়া গেল সোনার দোকান উদ্বোধনের পর তিনি গাঢাকা দিয়েছেন। পরে আবার প্রকাশ্যে আসেন।

নাম প্রকাশ না করে দুবাইয়ের এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরাভের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। মাস ছয়েক আগে সাকিবসহ মডেলদের নিয়ে সোনার দোকান উদ্বোধনের পরিকল্পনা করেন আরাভ। তবে তিনি যে পুলিশ হত্যা মামলার আসামি তা আমাদের জানা ছিল না।’

আরাভের সঙ্গে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও তাদের স্ত্রীদের যোগাযোগ ছিল। তারা দুবাই এলে সোনার বার গিফট করতেন তিনি। ঘটনা জানাজানি হলে আরাভ ‘নিখোঁজ’ হয়ে যান। নিখোঁজের মধ্যেই আরাভ ফোন করে বলেছেন, ‘দুবাইয়ে আর ব্যবসা করা হবে না। কানাডা ও আমেরিকায় আমি যাব না। ইতালি যাব।’ কিন্তু যাননি।

আরাভের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন হিরো আলম ও মডেল পিয়াসা। আরাভ একজন মহাপ্রতারক। ব্যবসার কথা বলে প্রবাসীদের কাছ অন্তত ১০০ কোটি টাকা হাতিয়েছেন। কিছুদিন আগে ইউসুফ নামে এক পাওনাদার টাকা ফেরত চাইলে তাকে মারধর করা হয়। প্রবাসীরা টাকা দাবি করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও জয়ের সঙ্গেও আরাভের ভালো সম্পর্ক আছে। ঢাকার গুলশান ও বনানী এলাকার নামিদামি মডেলদের সঙ্গে পরিচয় আছে। কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও দুই শীর্ষ ব্যবসায়ীর আশকারা পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। রিয়েল এস্টেট ব্যবসার পাশাপাশি সোনা চোরাচালানে জড়িত আরাভ। লেখাপড়া বেশি না থাকলেও অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। কানাডা ও আমেরিকার নাগরিক আরাভ।’

কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরাভ খান বলেন, ‘ইন্টারপোল একটি ছাগলের আখড়া। তাদের রেড নোটিসকে আমি ভয় পাই না। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাকে ধরতে কি না করেছে। পারেনি। কারণ আমি কোনো অন্যায় করিনি।’ আরাভ বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। মন্ত্রী-মিনিস্টাররা টাকা লুটেপুটে খাচ্ছে। তাদের নিয়ে কেউ কথা বলে না। শুধু আরাভকে নিয়ে বলে।’

সাংবাকিদের নিয়েও আজেবাজে কথা বলেন আরাভ। বলেন, ‘কেউ আমার কাছে টাকা পায় না। আমি অনেকের কাছে টাকা পাই। আমার নামে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কয়েকজনকে আমি আইনের আওতায় নিয়েছি।’

আরাভ বলেছেন, ‘দুবাইয়ের মানুষ আমাকে অনেক পছন্দ করেন। কিছুদিন আগে মোবাইল ফোনের দোকান উদ্বোধন করার সময় মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। ২০-২৫ হাজার লোক বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। ভালোবাসা না থাকলে এত লোক হতো না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত