ভালো কাজে নবীন-প্রবীণের একসঙ্গে চলা উচিত

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:০০ এএম

জাকির হোসেন রনি। বাবুবাজারের দারোগা আমির উদ্দিন ওয়াকফ এস্টেট ঘাট মসজিদ কমিটির সভাপতি, বাবুবাজার জুমা মসজিদ কমিটিসহ বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। সম্প্রতি এ তরুণ সমাজসেবকের সঙ্গে মসজিদ-মাদ্রাসা পরিচালনা, সমাজসেবাসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহসান সিরাজ

দেশ রূপান্তর : দারোগা আমির উদ্দিন ঘাট মসজিদের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাই?

জাকির হোসেন রনি : বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অনন্যসুন্দর একটি মসজিদ। মসজিদটি ১৮৪০ সালের দিকে নির্মিত। ইতিহাসের সূত্রে জানা যায়, ঊনিশ শতকে ঢাকার একজন প্রতিপত্তিশালী নাগরিক ছিলেন আমির উদ্দিন। উপাধি দেখে মনে হয়, সম্ভবত তিনি কোম্পানি আমলে দারোগা ছিলেন। ওই সময় তিনি ত্রিপুরা জেলার বরদাখাত পরগনায় জমিদারি কিনেছিলেন, যার মৌজার সংখ্যা ছিল বাইশ। জমিদারি কেনার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অর্জন করেছিলেন আভিজাত্যও। কিন্তু জমিদার নয়, সবাই তাকে দারোগা আমির উদ্দিন নামেই চিনতেন। তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে একটি বাড়ি ও মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটিতে মোগল আমলের নির্মাণছাপ চোখে পড়ে। বুড়িগঙ্গার আশপাশে যারা থাকতেন, তারা ওই মসজিদে নামাজ পড়তেন। এটি ঢাকার পুরনো মসজিদগুলোর একটি। দারোগা আমির উদ্দিনের সমাধি প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্র্তৃক সুরক্ষিত সম্পদ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : শুনেছি, একসময় মসজিদটি অযত-অবহেলায় ছিল?

জাকির হোসেন রনি : হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। একসময় মসজিদের টয়লেট বাইরের মানুষদের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল। মসজিদের পাশের জায়গাও ইজারা দেওয়া হয়। যেখানে কাঠের মার্কেট গড়ে ওঠে। মসজিদে দীর্ঘদিন রঙের কাজ করা হয়নি। কোনো তদারকি ছিল না। নদীর পাড়ে মসজিদ হওয়ায় ঠা-া বাতাস আসত, যাতে মানুষদের কষ্ট হতো। টয়লেট এবং অজুখানার মেঝে স্যাঁতসেঁতে ছিল। বাথরুমগুলো ছিল দুর্গন্ধময়। মুসল্লিরা ব্যবহারই করতে পারতেন না। এলাকার ট্রাক ড্রাইভার, ভ্রাম্যমাণ দোকানদার, ফল ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকরা বাথরুমগুলো ব্যবহার করতেন। পরিবেশটা এমন হয়ে গিয়েছিল, এটাকে মসজিদ হিসেবে মনে হতো না। খুবই অযতœ-অবহেলায় পড়েছিল।

দেশ রূপান্তর : মসজিদ কমিটি কবে গঠন করা হয়?

জাকির হোসেন রনি : সাত বছর আগে প্রশাসনের মাধ্যমে মসজিদ কমিটি গঠন করা হয়। এখানে কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে দুটি পক্ষ ছিল। তখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিদর্শক আসে। তিনি আমাদের (যুবকরা কাজ করছি) পক্ষে নিরঙ্কুশ সমর্থন দেখে মসজিদ পরিচালনার জন্য আমাদের কমিটিকে অনুমোদন দিয়ে দেন।

দেশ রূপান্তর : আপনি কবে সভাপতির দায়িত্ব পান?

জাকির হোসেন রনি : মসজিদ কমিটি গঠনের শুরুতেই আমি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পাই। এলাকার বাসিন্দাদের সবাই আমাকে মসজিদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার জন্য বলেছেন। যেহেতু মসজিদের হিসাবনিকাশ নেই, বিদ্যুতের বিল অনেক বকেয়া, মসজিদের একটা ভবন প্রয়োজন, একটা কমপ্লেক্স প্রয়োজন, এমতাবস্থায় আমাকে সভাপতি করা হয়। তখন মসজিদের পক্ষে যারা ইতিবাচক মন-মানসিকতা রাখেন, তাদের নিয়ে কমিটির প্রস্তাব করি। পরে এই কমিটি অনুমোদন করা হয়।

দেশ রূপান্তর : দায়িত্ব পাওয়ার পর কোন ধরনের পরিবর্তন এনেছেন?

জাকির হোসেন রনি : দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমে মুসল্লিদের সুবিধার জন্য কী কী করতে হবে সেগুলা নির্ণয় করি। পরে ধাপে ধাপে কাজ শুরু করি। এর মধ্যে মুসল্লিদের সুপেয় পানির জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পানির ফিল্টারের ব্যবস্থা করেছি। অতঃপর নামাজের প্রতিবন্ধক যে অসুবিধাগুলো আছে, যেমন কোন জায়গায় ফ্যান লাগবে, কোথায় কার্পেট লাগবে। এগুলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। অজুখানা নিচু ছিল, এতে মুসল্লিদের বিশেষ করে একটু স্বাস্থ্যবান লোকদের বসতে কষ্ট হতো, অজুখানার সংস্কার করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কাজ যেটা করেছি তা হলো, দুর্গন্ধময় এবং ব্যবহার অনুপযোগী বাথরুমগুলো সুন্দর ও আধুনিকভাবে পুনর্নির্মাণ করেছি। হাই ও লো-কমোডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ খাদেমদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করেছি। তাদের আলাদা রুম দেওয়া হয়েছে। মসজিদে একটি মেহমানখানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে বড় বড় আলেম-উলামা এবং মেহমানরা এলে একটু বিশ্রামের সুযোগ পান। মসজিদের সভাপতির পদকে কোথাও নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করিনি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, মসজিদকে নিরাপদ রাখতে, নিজে স্বচ্ছ থাকতে। আমাদের হিসাবনিকাশ খুবই স্বচ্ছ। এই মসজিদের জায়গা ৩৫ শতাংশ। এটা কারও ব্যক্তি মালিকানাধীন নয় বা এলাকার নয়। এটা ওয়াকফ করা সরকারি জায়গা। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের। আমরা চাই, পরবর্তী প্রজন্ম এই মসজিদকে অনাদিকাল পর্যন্ত দেখাশোনা করুক।

দেশ রূপান্তর : মসজিদের সঙ্গে মাদ্রাসা কেন প্রতিষ্ঠা করলেন?

জাকির হোসেন রনি : কোনো এলাকায় যখন একটা দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অর্থাৎ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন তাকে কেন্দ্র করে এলাকার মধ্যে একটি ইসলামি ভাবধারা তৈরি হয় এবং সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন হয়। বিভিন্ন জেলা শহর ও মহানগরে দেখেছি, মাদ্রাসাগুলোকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছোটবেলায় দেখেছি, বাবুবাজার জুমা মসজিদ ও দারোগা আমির উদ্দিন মসজিদে মক্তব হতো, তা এখন বিলুপ্তপ্রায়। তাই আমরা চিন্তা করলাম, এলাকার কোমলমতি শিশুরা যাতে সহিহ-শুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত শিখতে পারে, সেজন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটা কাঠামো প্রয়োজন; আর সেটা হলো মাদ্রাসা। সেই আলোকে বাবুবাজার জুমা মসজিদে বায়তুল কোরআন মাদ্রাসা এবং দারোগা আমির উদ্দিন ঘাট মসজিদে দারুল কোরআন মাদ্রাসা চালু করা হয়েছে। এই মাদ্রাসাগুলোয় শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। মাদ্রাসার পাশে একটা মাঠ করেছি, যাতে শিক্ষার্থীরা অবসর সময়ে খেলাধুলা করতে পারে।

দেশ রূপান্তর : আপনি কি মনে করেন, মসজিদ-মাদ্রাসা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যুবকদের এগিয়ে আসা উচিত?

জাকির হোসেন রনি : নিশ্চয়ই। আপনি দেখেন, অধিকাংশ মসজিদ কমিটিতে বয়স্ক ও অবসরজীবন কাটানো লোকদের প্রাধান্য। তাদের সঙ্গে যদি সমাজের যুবক শ্রেণি যুক্ত হয়, তাহলে কাজের গতি-

প্রকৃতি পরিবর্তন এবং আরও বেগবান হবে। নবীন-প্রবীণ একসঙ্গে বসতে পারলে সুবিধা হলো প্রবীণরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে কথা বলবেন আর যুবকরা নতুন তথ্যপ্রযুক্তি এবং নিত্যনতুন আইডিয়া নিয়ে কথা বলবেন। উভয় শ্রেণির সমন্বয়ে যখন কাজ হবে, তখন কাজটা সুন্দর এবং টেকসই হবে। এতে করে বিশৃঙ্খলা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে একদম শূন্য। এর মাধ্যমে আগামী দিনের পথচলাও হয় আরও সুন্দর।

দেশ রূপান্তর : মসজিদ কমিটিগুলো তো মাদক ও যৌতুকবিরোধী কাজ করতে পারে?

জাকির হোসেন রনি : নিশ্চয়ই। মসজিদ কমিটির সদস্যদের নিয়ে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে এসব বিষয়ে সব সময়ই কথা বলি। এ ছাড়া আমাদের এলাকায় যদি কোনো অসামাজিক কার্যকলাপ হয়, যেমন মেলা, জুয়া আসর ও হাউজি এসব ব্যাপারে আমরা জোরালো পদক্ষেপ নিই। প্রয়োজনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি। মাঠ উদ্ধার আন্দোলনে মসজিদ কমিটি পূর্ণ সহযোগিতা করেছে। এর আগে সেখানে নানা খারাপ কাজ হতো। মসজিদ কমিটি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে প্রশাসন পাশে থেকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে নিয়মিত। তাদের মাধ্যমে গাজার আসর এখান থেকে উচ্ছেদ করা সহজ হয়েছে। মসজিদের আশপাশে কোথাও মাদকদ্রব্য বিক্রি হয় না। কেননা কমিটি সম্বন্ধে তাদের ধারণা রয়েছে এবং তারা ভয় পায়। এভাবে প্রতিটি মসজিদ কমিটির লোকজন সোচ্চার হলে সমাজের অনাচার সহজেই দূর হয়ে যেত।

দেশ রূপান্তর : আপনি আর কোন কোন কাজের সঙ্গে যুক্ত?

জাকির হোসেন রনি : আমি মসজিদ-মাদ্রাসা পরিচালনা ছাড়াও আলিফ-লাম-মিম ফার্মার স্বত্বাধিকারী, বাবুবাজার বাদামতলী সমাজকল্যাণ সংসদ ও আরমানিটোলা সমাজকল্যাণ সংসদের সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রাইচ মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এবং আলিফ-লাম-মিম মেডিসিন প্লাজা দোকান মালিক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজের সঙ্গে যুক্ত।

দেশ রূপান্তর : মিডিয়ায় ইসলামের প্রসার কেমন দেখতে চান?

জাকির হোসেন রনি : আমি মনে করি, মিডিয়ায় ইসলামের যে বিষয়গুলো আসে সেগুলো যেন স্বচ্ছ ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়। মিডিয়ায় যেসব আলেম কথা বলবেন, লিখবেন তারা যেন যোগ্য হন, কোনোভাবেই যেন কোনো ভুল তথ্য উপস্থাপন না করেন। এ বিষয়ে যারা পারদর্শী, তারাই মিডিয়ায় আসবেন। যারা সত্যিকারের আলেম, তারা যদি সহজভাবে ইসলামের বিধিবিধানসহ যাবতীয় বিষয়গুলো মিডিয়ায় সহজে তুলে ধরেন, তাহলে সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপকার হবে ইনশাআল্লাহ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত