মৌলভীবাজারের জুড়ীর ভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা নুনু মিয়ার সন্তান রুয়েল আহমদ ও সীমা আক্তার। এ দুই ভাইবোন মিলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে গড়ে তুলেছিলেন ভয়ংকর এক মানব পাচার চক্র। তারা টার্গেট করত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে দেশটিতে যাওয়া যুবক ও তরুণদের। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হতো কিরগিজস্তানে। সেখানে ভাইবোনের চক্রের বিদেশি সহযোগীদের সহযোগিতায় ঘরে আটকে রেখে দেশে যোগাযোগ করে আটকা পড়া তরুণ ও যুবকদের পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হতো মোটা অঙ্কের টাকা।
সিলেটের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে এরকম ঘটনা ঘটিয়েছে রুয়েল আহমদ ও সীমা আক্তার। দেশেও তাদের রয়েছে আরও সহযোগী। তবে শেষ পর্যন্ত রুয়েল ধরা পড়েছে পুলিশের জালে। অবশ্য সে আটক হলেও তার বোনসহ চক্রের অন্য সদস্যরা এখনো পলাতক। গত রবিবার বিকেলে ৭ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অপস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স টিম জুড়ী উপজেলা সদর থেকে রুয়েলকে গ্রেপ্তার করে।
এপিবিএন কর্মকর্তারা জানান, গত বছর মার্চ ও এপ্রিলে দুটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে ৭ এপিবিএনের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার ফরিদুল ইসলামের নির্দেশে সংস্থাটির অপস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স টিম। দীর্ঘ তদন্তে ভয়ংকর মানব পাচারকারী রুয়েল সম্পর্কে বেরিয়ে আসে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। এরই মধ্যে রুয়েলের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হওয়া জুড়ীর মো. কামরুজ্জামানের স্ত্রী সৈয়দা জলি বেগম (৩০) ৭ এপিবিএন সিলেটের অধিনায়ক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। এ অভিযোগের তদন্তেও রুয়েলের অপকর্মের একাধিক ঘটনা উঠে আসে।
অভিযোগে বলা হয়, জলির স্বামী কামরুজ্জামান শ্রমিক হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়ে পরিচয় হয় রুয়েল ও তার বোন সীমার সঙ্গে। একপর্যায়ে কামরুজ্জামানসহ আরও ২০-২৫ জন প্রবাসীকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ফ্রান্স পাঠানোর কথা বলে রুয়েল ও সীমা। এ বিষয়ে কামরুজ্জামানের পরিবারের সঙ্গে ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকার মৌখিক চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ সালের ১ অক্টোবর রুয়েলের সহযোগী কামরুল ইসলামের কাছে কামরুজ্জামানের পরিবার ৮০ হাজার টাকা দেয়। পরদিন রুয়েলের চাচাতো ভাই রকি ইসলামের কাছে নগদ ৮০ হাজার ও ৭০ হাজার টাকার ব্যাংক চেক দেওয়া হয়। টাকা দেওয়ার পর ৪ অক্টোবর ফ্রান্সে পাঠানোর কথা বলে কামরুজ্জামানসহ আরও ১৮ জনকে কিরগিজস্তান নিয়ে যায় রুয়েল। সেখানে সবাইকে একটি ঘরে আটকে রাখে। এ সময় কামরুজ্জামানের কাছে থাকা ১ লাখ ২০ হাজার টাকা রুয়েল কেড়ে নিয়ে ফের সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে আসে। পরে মুক্তিপণ হিসেবে কামরুজ্জামানের পরিবারের কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করে। এভাবে পাঁচ মাস গড়ালে তার পরিবারের পক্ষ থেকে ৪ লাখ টাকা পেয়ে রুয়েল কিরগিজস্তানে গিয়ে কামরুজ্জামানকে নিয়ে ফের সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসে। দুবাই নিয়ে আসতে বিমান ভাড়া বাবদ ৫০ হাজার টাকাও সে নেয় কামরুজ্জামানের কাছ থেকে। পরে গত বছর ৭ অক্টোবর রুয়েল দেশে এলে কামরুজ্জামানের পরিবারের পক্ষ থেকে সালিশি বৈঠকের আয়োজন করা হলে সম্পূর্ণ ঘটনা অস্বীকার করে রুয়েল উল্টো গালাগাল ও হত্যার হুমকি দেয়। পরে বাধ্য হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হন কামরুজ্জামানের স্ত্রী। রুয়েল চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের বাদেদেউলী গ্রামের যুবক সুরঞ্জিত চন্দ্র দাস। তিনিও জীবিকার তাগিদে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়েছিলেন। কামারুজ্জামানের মতো সুরঞ্জিতকেও এভাবে কিরগিজস্তানে নিয়ে গিয়ে আটক করে তার পরিবারের কাছ থেকে ৭ লাখ মুক্তিপণ নেয় রুয়েল চক্র।
