ব্রাদার্স যেন ‘গোল স্টোরেজ’

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:১৯ এএম

দেশের বিক্রমপুর অঞ্চল প্রসিদ্ধ আলু চাষে। আলু তোলার মৌসুমে গ্রামবাংলার কোল্ড স্টোরেজগুলো যেমন আলুতে ভরে যায়, গোপীবাগের ঐতিহ্যবাহী ব্রাদার্স ইউনিয়নের অবস্থা হয়েছে অনেকটা এরকমই। পার্থক্য হলো, তারা কোল্ড স্টোরেজ নয়, বনে গেছে ‘গোল’ স্টোরেজে। দুই মৌসুম পর শীর্ষ লিগে ফিরে একের পর এক ম্যাচে গোল খেয়েই যাচ্ছে ব্রাদার্স। স্বাধীনতা কাপ, প্রিমিয়ার লিগ ও ফেডারেশন কাপে খেলা ছয় ম্যাচে তারা হজম করেছে ২৪ গোল!

মৌসুম শুরু স্বাধীনতা কাপের ‘এ’ গ্রুপে খেলেছিল ব্রাদার্স। দুই ম্যাচে হেরে সেই গ্রুপে তারা তলানির দল। পুলিশের কাছে হার ২-০ গোলে। এরপর শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব হারিয়েছে ৪-০ গোলে। লিগে এখন পর্যন্ত খেলেছে তিন ম্যাচ। বসুন্ধরা কিংসের কাছে ৫-২ গোলে হারার পর রহমতগঞ্জের সঙ্গে ২-২ ড্র করে ব্রাদার্স। সর্বশেষ লিগ ম্যাচে মোহামেডানের কাছে বিধ্বস্ত হয় ৫-১ গোলে। আর মঙ্গলবার ফেডারেশন কাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আবাহনীর কাছ থেকে পেয়েছে ৬-০ গোলের লজ্জা।

এই মৌসুমে এখনো পাওয়া হয়নি জয়ের স্বাদ। এমন বিবর্ণ রূপে ব্রাদার্সের শীর্ষ ফুটবলে ফেরারই বা কী দরকার ছিল? অথচ এই ব্রাদার্সকে একটা সময় ধরা হতো দেশের ফুটবলের তৃতীয় পরাশক্তি। ঐতিহ্যবাহী কমলা রঙা জার্সিতে ঢাকার মাঠ কাঁপাতে দেখা গেছে কত-কত তারকা ফুটবলারকে। অথচ তারাই শেষ দেড় দশকে বড্ড বিবর্ণ। কেন এই দুর্দশা ব্রাদার্সের? নিজ বাসা ছেড়ে দিয়ে ফুটবল দলকে থাকতে দেওয়া শহীদ উদ্দিন আহমেদ সেলিমের মতো নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকদের ব্রাদার্স কেন এভাবে হোঁচট খাচ্ছে?

১৯৪৯ সালে মতিঝিলের পাশের এলাকা গোপীবাগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রাদার্স ইউনিয়ন। সে সময়কার ডাকসাইটে রাজনীতিবিদ ও পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী জহিরুদ্দিন ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আর প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা ছিলেন প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক। এরপর ধীরে ধীরে এই ক্লাবটিকে দেশের ফুটবলের পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, সাদেক হোসেন খোকা, আমিনুল হক মনির মতো নানা অঙ্গনের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা। ১৯৭৩ সালে তৃতীয় বিভাগ লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাদার্স। পরের বছর দ্বিতীয় বিভাগ লিগ জিতে নেয়। ১৯৭৫ সালে তারা প্রথম চলে আসে শীর্ষ লিগে। অভিষেকেই তারা তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন আবাহনীকে হারিয়ে চমক জাগায়। এর পর থেকেই আবাহনী, মোহামেডানের পর তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো ২০০৩ ও ২০০৪ সালে টানা প্রিমিয়ার লিগজয়ী ব্রাদার্স।

সেই দলটিই পেশাদার যুগে পদার্পণের পর থেকে ভীষণ সাদামাটা। বড্ড বিবর্ণ এর পেশাদারী অতীত। ব্রাদার্সের মান নামতে নামতে এখন ঠেকেছে তলানিতে। যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ২০২১-২০২২ মৌসুমে, প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমনের লজ্জায় ডুবতে হয়েছিল তাদের। ৪৬ বছর পর তাদের নেমে যেতে হয় নিচের লিগে। সেই লজ্জায় সেবার চ্যাম্পিয়নশিপ লিগেই অংশ নেয়নি ব্রাদার্স। তবে পরের বছর চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে অংশ নেয়, এবং সেরা দুইয়ে জায়গা করে ফিরে আসে প্রিমিয়ার লিগে। এর আগে অবশ্য ম্যাচ পাতানোর মতো কলঙ্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে একাধিকবার জড়িয়েছিল ক্লাবটির ফুটবলারদের নাম। তার জন্য শাস্তিও পেতে হয়েছে তাদের।

এই মৌসুমে শীর্ষ ফুটবলে ফেরার পর মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে ক্লাবটির ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা কর্তাদের হুঁশ ফিরবে। সেটা আর হলো কই? নিম্নমানের দল গড়ে তারা আরেকবার ক্লাবটির সুনাম মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। সেটা মৌসুমের প্রথম ছয় ম্যাচেই পরিষ্কার। তাই তো ব্রাদার্স এখন আর পরাশক্তি নয়, তাদের গায়ে লেগে গেছে ‘গোল’ স্টোরেজ দুর্নাম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত