মাঘের দুপুর, রোদ উঠলেও তেজ নেই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একাডেমি মাঠ থেকে একে একে বের হয়ে আসছেন দুর্দান্ত ঢাকা’র ক্রিকেটাররা। অধিনায়ক মোসাদ্দেক হোসেন এসে দাঁড়ালেন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে। এসব দেখতে দেখতে মাথায় ফ্ল্যাশব্যাকে খেলে গেল ঢাকা দলটার গত বিপিএলের দুর্দশার কথা। ভুগতে থাকা ঢাকা দলটাকে যা একটু অক্সিজেন জুগিয়েছিলেন নাসির হোসেন। ১২ ম্যাচে ৩৬৬ রান, ১৬ উইকেট। ব্যাটিং এবং বোলিং দুই ভূমিকাতেই দলের সেরা পারফরমার। দলটার অধিনায়কও ছিলেন নাসির। তার এই সাফল্য অন্তত নির্বাচকদের সামনে জনাকয়েক সাংবাদিককে নাসিরের জাতীয় দলে ফেরা সংক্রান্ত প্রশ্নটাও তুলে এনেছিল, কিন্তু ২০১৮’র পর তার আর জাতীয় দলে ফেরা হয়নি। হবে সেই আশাও কম। কারণ ক্রিকেটে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে নাসিরের বিরুদ্ধে। আরব আমিরাতে টি-টেন লিগ খেলতে গিয়ে আইফোন ১২ উপহার নিয়েছেন জুয়াড়িদের কাছ থেকে, সেই আইফোন দিয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে তদন্তে অসহযোগিতা করেছেন। এসব অভিযোগে নাসিরকে ২ বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেটে নিষিদ্ধ করেছে আইসিসি। কাগজে কলমে ৩২ বছর বয়সী নাসির নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ কাটিয়ে ফের ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজেকে প্রমাণ করে জাতীয় দলে ফিরতে পারবেন কি না সেই প্রশ্নের উত্তরে সরাসরি ‘না’ বলার উপায় নেই, তবে বলতেই হবে পথটা অনেক কঠিন।
নিষিদ্ধ হয়েও ফিরে এসে অধিনায়কও হয়েছেন সাকিব আল হাসান। তাহলে নাসির কেন পারবেন না? এই প্রশ্নের উত্তরেই লিখতে হবে আক্ষেপের দীর্ঘ তালিকা। নাসিরও সাকিব হতে পারতেন। নাসিরও পড়েছেন বিকেএসপিতেই। সেই কৈশোরেই বিকেএসপির দলটাকে প্রথম বিভাগ থেকে প্রিমিয়ার লিগে উত্তরণে বড় একটা ভূমিকা ছিল তার। সাকিবের মতোই নাসিরও অলরাউন্ডার। যে কোনো পজিশনে ব্যাট করতে পারেন, লোয়ার মিডল অর্ডার থেকে ওয়ান ডাউন। অফস্পিন বোলিংটা বুদ্ধিদীপ্ত। ফিল্ডিং ধারালো। থ্রোর নিশানা চমৎকার। অ্যাথলেটিক গড়ন। হ্যান্ড-আই কো-অর্ডিনেশন দারুণ। আর ছিল বুকভর্তি সাহস। শিস বাজাতে বাজাতে ব্যাটিং করতেন। চাপ সামলাবার ক্ষমতাটা অন্যদের চেয়ে ছিল বেশি। এক কথায় ভালো খেলোয়াড় হওয়ার, বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক বড় সম্পদ হওয়ার সব কিছুই ছিল। ছিল না শুধু শৃঙ্খলাবোধ। যার পরিণতি এই নিষেধাজ্ঞা।
যুব বিশ্বকাপের যে আসরে খেলেছিলেন বিরাট কোহলি, কেন উইলিয়ামসন, স্টিভেন স্মিথরা; সেই একই আসরে খেলেছিলেন নাসিরও। ২০০৮ সালে। জাতীয় দলে অভিষেক হয় ২০১১’র জিম্বাবুয়ে সফরে। আন্তর্জাতিক অভিষেকেই নাসির করেছিলেন হাফসেঞ্চুরি। ওপরের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার পর সপ্তম ও অষ্টম উইকেটে সাকিব এবং আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে নাসিরের দুটো হাফসেঞ্চুরির জুটি না হলে দলের রানটা ১৮৮ হয় না। তাতে নাসিরেরই ৬৩! সেই বছর পাকিস্তানের বিপক্ষে সেঞ্চুরিও করলেন। ক্যারিয়ারের একমাত্র ওয়ানডে সেঞ্চুরি।
১৯ টেস্টে ১০৪৪ রান, ৬৫ ওয়ানডেতে ১২৮১ রান আর ৩১ টি-টোয়েন্টিতে ৩৭০ রান নাসিরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার রীতিমতো হতশ্রী। এই পরিসংখ্যান দেখে দূর ভবিষ্যতের কেউ তাকে আঁস্তাকুড়েই ছুড়ে ফেলবেন। অবশ্য নিজের সর্বনাশ তো নাসির ডেকে এনেছেন নিজেই। কুসঙ্গে পড়েছিলেন। অনুশীলনে অনিয়মিত হয়েছেন, শরীরের প্রতি যতœ নেওয়া থামিয়ে দিয়েছিলেন। পেশাদার ক্রিকেটের কঠিন জগতে শুধু প্রতিভার জোরে টিকতে পারেননি। ৮০টা সিমকার্ড, ৮০টা গার্লফ্রেন্ড; এমন অনেক চটকদার খবরের শিরোনাম হতেন। এক মডেলের সঙ্গে অশ্লীল ফোনালাপ ফাঁস হলো, সেসব কথাবার্তা শুনলে মনে হবে বাংলা ছবির অশ্লীলতার স্বর্ণযুগের ডিপজলও তার কাছে সাধু! বিয়ে করলেন, সেও আরেক জনের বৈধ স্ত্রীকে। আগের স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের আগেই। এই নিয়ে ঘটনা গড়ায় আদালত পর্যন্ত।
২০১৬ সালে নিজের নামে সুগন্ধি এনেছিলেন নাসির। আদ্যাক্ষর ‘এন’ আর ‘এইচ’-এর সঙ্গে জার্সি নম্বর ৬৯ মিলিয়ে এনএইচ ৬৯ নামের সুগন্ধি। সেই নাসিরের গায়েই এখন ম্যাচ গড়াপেটার দুর্গন্ধ। অনেক আক্ষেপ আর প্রত্যাশাকে হতাশায় রূপান্তরিত করে নাসির এখন নিঃশেষ, একসময়ে যাকে ‘ফিনিশার’ বলা হতো তিনি নিজেই এখন ফিনিশড। নাসির চেষ্টা করছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়ে সেই দেশের হয়েই খেলতে। হয়তো মার্কিন পাসপোর্ট পেয়ে যাবেন এক সময়, সেটা স্ত্রীর কর্মসূত্রে কিংবা বিনিয়োগের মাধ্যমে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বোধহয় আর খেলতে পারবেন না নাসির। মোহাম্মদ আশরাফুলও পারেননি। পেরেছেন শুধুই সাকিব। শুধু তাই নয়, সাংসদও হয়েছেন। সব বিতর্কের মধ্যেও হাঁস যেমন পালক থেকে জল ঝেড়ে ফেলে, সাকিবও সব কিছু ঝেড়ে ফেলেছেন। কারণ মাঠের পারফরম্যান্স। সাকিবের সঙ্গে এখানেই অন্যদের পার্থক্য। সাকিব মাঠের ভেতরে সব ঠিক রেখে বাইরে অনেক কিছুই করেছেন। নাসির ভেতরে বাইরে সব জায়গাতেই। তাই তো সাকিব সংসদে আর নাসির নিষিদ্ধ।
