সত্যনিষ্ঠ ইমানের শক্তি

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৪, ০১:০০ এএম

ইসলামকে তার সব অপরিহার্য অনুষঙ্গসহ মনেপ্রাণে মেনে নেওয়াকে ‘ইমান’ বলে। ইমানের ভিত্তিতেই সূচিত হয় মুমিন জীবনের পথরেখা এবং সীমান্তসীমা। তবে সত্যনিষ্ঠ ইমানের স্বাদ ও প্রাপ্তি প্রাত্যহিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে এবং ইবাদতে ভিন্নমাত্রা যোগ করে। সত্যনিষ্ঠ ইমানের সর্বাধিক উপস্থিতি এবং এর প্রভাব আমরা হজতর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচার্য ও সান্নিধ্য-ধন্য সাহাবায়ে কেরামের জীবনে দেখতে পাই। নিম্নের বর্ণনাগুলো তারই প্রমাণ বহন করে।

এক. হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা আস-সাহমি (রা.)। হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে রোম অভিমুখী এক যুদ্ধবাহিনীর সঙ্গে তাকেও পাঠানো হয়। রোম সম্রাট তাকে বন্দি করে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণের আহ্বান জানায় এবং তার আহ্বানে সাড়া দিলে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসিত করার আশ্বাস দেয়। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফা (রা.) তার এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন, ‘এর চেয়ে এক হাজার বার মৃত্যুও আমার জন্য সম্মানের।’ রোম সম্রাট তাকে নিজ ক্ষমতায় অংশীদার এবং অর্ধ সম্রাজ্যের মালিক বানানোর প্রস্তাব দিলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর শপথ, আপনি যদি আমাকে আপনার সাম্রাজ্য এবং আরবের সব সাম্রাজ্য দান করেন, তারপরও আমি চোখের এক পলকের জন্যও ইমান ত্যাগ করব না।’ তাকে হত্যার ভয় দেখানোর জন্য এক মুসলিম বন্দিকে ফুটন্ত তেলের পাত্রে নিক্ষেপ করা হয়। পুনরায় তাকে খ্রিস্টান হওয়ার আহ্বান করে নিরাশ হলে তাকেও ফুটন্ত তেলের পাত্রে নিক্ষেপের নির্দেশ দেয়। এ সময় সম্রাটের এক লোক তাকে ভারাক্রান্ত দেখে মনে করে- তিনি মৃত্যুভয়ে চিন্তিত। আব্দুল্লাহ ইবনে হুজাফ (রা.) বলেন, ‘আমি পেরেশান এ কারণে যে, ফুটন্ত এ পাত্রে আমাকে একবার নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে আমার জীবনের ইতি ঘটতে চলেছে; অথচ আমার মন চায়- আমার শরীরে যত পশম আছে, এতবার যদি আমার জীবন থাকত, সব জীবনকেই ফুটন্ত এ পাত্রে আল্লাহর রাস্তায় বিসর্জন দিতাম...।’ সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা : ১/২৯-৩২

দুই. আনসারি সাহাবি হজরত খুবাইব ইবনে আদি (রা.)। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) দশজনের এক কাফেলার সঙ্গে কোরআনের শিক্ষক হিসেবে তাকেও পাঠান। দীর্ঘ বর্ণনা, এক পর্যায়ে তিনি কাফেরদের হাতে বন্দি হলে ‘হত্যাবদলা’ নেওয়ার জন্য হারিস ইবনে আমেরের পুত্ররা তাকে ক্রয় করে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। হত্যার পূর্বে তিনি তাদের কাছে দু’রাকাত নামাজ পড়ার অনুমতি চাইলে, তারা মঞ্জুর করে। নামাজ শেষে তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি ধারণা না করতে আমি মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি, তাহলে আমি নামাজ আরও দীর্ঘ করতাম...।’ অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন, ‘আমি যখন মুসলিম হিসেবে শহীদ হচ্ছি, তখন আমি পরোয়া করি না আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমাকে কোন্ পাশে শোয়ানো হচ্ছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই আমার মরণ হচ্ছে, তিনি ইচ্ছা করলে আমার খ-িত টুকরোসমূহে বরকত দান করতে পারেন।’ সহিহ বোখারি : ৩০৪৫

তিন. হজরত খুবাইব ইবনে আদি (রা.)-এর সঙ্গে বন্দি হওয়া আরেক সাহাবি হজরত যায়েদ ইবনে দাছানা (রা.)। হত্যার পূর্বে আবু সুফিয়ান তাকে বলেন, ‘যায়েদ, তুমি কি এটা পছন্দ করো- তোমার স্থলে আমরা মুহাম্মদকে হত্যা করি আর তুমি তোমার পরিবারের সঙ্গে নিরাপদে থাক। তিনি বলেন, কখনোই না; আল্লাহর শপথ, আমি এমনটাও চাই না- তার পায়ে একটা কাঁটা বিঁধুক আর আমি পরিবারের সাতে নিরাপদে থাকি। তার এ কথা শুনে আবু সুফিয়ান বলেন, মুহাম্মদের সাথীরা মুহাম্মাদকে যেমন ভালোবাসে, এমন কাউকে আমি দেখিনি।’ সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/১৭২

সত্যনিষ্ঠ ইমান ব্যক্তিকে গোপন শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত রাখে। মহান আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রগাঢ় হয়। নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদার্শে জীবনের প্রকৃত সুখ খুঁজে পায়। হজরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.) বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সে ব্যক্তিই ইমানের স্বাদ লাভ করতে পেরেছে- যে আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মদ (সা.)-কে নবী হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছে।’ সহিহ মুসলিম : ৩৪

হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিনটি বিষয় যার মধ্যে আছে, সে ইমানের স্বাদ আস্বাদন করতে পেরেছে। এক. আল্লাহ ও তার রাসুল তার কাছে অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হওয়া। দুই. একমাত্র আল্লাহর জন্যই কাউকে ভালোবাসা এবং তিন. কুফরিতে প্রত্যাবর্তনকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মতো অপছন্দ করা।’সহিহ বোখারি : ১৬

তবে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যার কারণে ইমানের প্রকৃত স্বাদ ও মিষ্টতা অনুভূত হয় না। আল্লাহর অবাধ্যতা ও গোনাহের কাজ তার মধ্যে অন্যতম। গোনাহের কারণে মানুষের অন্তর শক্ত ও কুলষিত হয়ে যায়; এমন অন্তর ইবাদতে তৃপ্তি ও মজা পায় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত