গ্ল্যাডিয়েটর্স থেকে দুর্দান্ত, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে রাজধানীর ফ্র্যাঞ্চাইজির নাম বদলেছে ছয় বার। ষষ্ঠবারে নতুন মালিকানায় ‘দুর্দান্ত ঢাকা’ নামে আত্মপ্রকাশ করা দলটি আবির্ভাবেই ৫ উইকেটে হারিয়ে দিয়েছে বিপিএলের সফলতম দল, চার বারের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসকে। উদ্বোধনী ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেছেন ঢাকার পেসার শরিফুল ইসলাম।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব ইসমাঈল হায়দার মল্লিককে দর্শকদের আগ্রহ নিয়ে যতটা আত্মবিশ্বাসী শোনা গিয়েছিল, টিকিট কাউন্টারের ফাঁকা চেহারা তাতে ভরসা দেয়নি। তবে শুক্রবার ভুল ভাঙল দর্শক স্রোত দেখে। গ্যালারির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভরেছে, গেটগুলোর বাইরেও ছিল লম্বা লাইন। ক্রীড়ামন্ত্রী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের হাতে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে টস জয়ী ঢাকা ব্যাট করতে পাঠায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসকে। বর্তমান অধিনায়ক লিটন দাস আর সাবেক অধিনায়ক ইমরুল কায়েসের উদ্বোধনী জুটিটা মাত্র ২৩ রানে ভেঙে গেলেও ওয়ান ডাউনে ইমরুলের সঙ্গে তাওহীদ হৃদয়ের জুটিটা পার করে শতরান। ১৮.৩ ওভারে হৃদয় যখন ৪১ বলে ৪৭ রান করে আউট হলেন দলের রান তখন ১৩০। একই ওভারের শেষ বলে ৫৬ বলে ৬৬ রান করে আউট হন কায়েসও। তাদের ৮৭ বলে ১০৭ রানের জুটিটা ছিল একই সঙ্গে দলের জন্য আশীর্বাদ এবং অভিশাপ। আশীর্বাদ কারণ সিংহভাগ রান তারাই করেছেন, অভিশাপ এই অর্থে যে তারা যখনই রান তোলার গতি বাড়াবার দরকার সেই সময়টাতেই আউট হয়ে গিয়েছেন, শেষ সময়ে উইকেটে নতুন ব্যাটসম্যানদের আসতে হয়েছে। শেষদিকে খুশদিল শরিফুলের বলে পরপর দুটো ছয় মারার পর ওভারের চতুর্থ বলে হলেন আউট। বাকি দুটো বলে শরিফুল আরও দুই উইকেট নিয়ে করলেন হ্যাটট্রিক। জীবনে প্রথমবারের মতো স্বীকৃত যে কোনো ক্রিকেটে টানা তিন বলে এই বাঁহাতি পেসারের তিন শিকার। ২০ ওভার শেষে কুমিল্লার সংগ্রহ ৬ উইকেটে ১৪৩ রান। প্রথম ইনিংস শেষে ড্রেসিং রুমে ফেরার পর শরিফুলের মনে হচ্ছিল, এই সংগ্রহটা তাড়া করে জেতা সম্ভব। সেই সঙ্গে শরিফুল জানালেন, ‘প্রথমবারের মতো পরিবার (স্ত্রী) মাঠে খেলা দেখতে এসেছে। অনেক দূরে থাকে। কষ্ট করে এসেছে। প্রথম দুটো ম্যাচ দেখে চলে যাবে। তাদের সামনে হ্যাটট্রিক করতে পেরে ভালো লাগছে। দুটো ছক্কা হজম করার পর মনে হচ্ছিল এখন আমাকে ভালো কিছু করতে হবে। উইকেট নেওয়া বা সিঙ্গেল দেওয়া। হ্যাটট্রিক হবে ভাবিনি।’
ঢাকার কাজটা সহজ করে দেয় নাঈম শেখ (৪০ বলে ৫২) আর দানুস্কা গুণাতিলকের (৪২ বলে ৪১) শতরানের উদ্বোধনী জুটি। দুই ওপেনারের বিদায়ের পর দ্রুত কয়েকটা উইকেট হারায় ঢাকা। বিশেষ করে লাসিথ ক্রসপুলের দ্রুত বিদায়টা (৮ বলে ৫) ভুগিয়েছে ঢাকাকে। ইরফান শুক্কুরও বিদায় নেন ১৬ বলে ২৪ রান করে। জয়ের জন্য শেষ ১২ বলে ১৩ রান দরকার ছিল কুমিল্লার, খুশদিল বোলিংয়ে এসে সাইফ হাসানকে তুলে নিলেও সেটা হিতে বিপরীতই হয় কুমিল্লার জন্য! শেষ ওভারে মাত্র ৪ রানের পুঁজি ছিল মোস্তাফিজুর রহমানের হাতে। দ্বিতীয় বলে ইরফানকে আউট করে মোস্তাফিজ খেলা জমালেও পরের বলেই উইকেটে সদ্য আসা চতুরঙ্গা ডি সিলভা এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে মারা ছয়ে নিশ্চিত করেন অভিষেকেই দুর্দান্ত ঢাকা’র দুর্দান্ত জয়।
হারের পর কুমিল্লা অধিনায়ক লিটন খুব একটা বিচলিত নন। কারণ আগের আসরেও টানা ৩ ম্যাচ হেরেও কুমিল্লা হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন। কোচ সালাহউদ্দিনের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল এই নিয়েই, বললেন সংবাদ সম্মেলনে, ‘স্যার (কোচ) এর সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল, উনি তো বলেন হারা উনার জন্য লাকি। কুমিল্লা কখনোই প্রথম ম্যাচন জেতে না। আমি অবশ্যই চাইছিলাম অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ম্যাচটা জিততে। তবে সবসময় তো সবকিছু হয় না।’ লিটনের আক্ষেপ ওপরের ব্যাটসম্যানদের স্ট্রাইক-রেট নিয়ে, ‘পঞ্চাশ বলের বেশি খেললে ইনিংসটা শেষ করে আসা উচিত ছিল। আমাদের দুই ব্যাটসম্যান যদি আর ১০টা করে রান বেশি করে আসত তাহলে আমরা ম্যাচটা জেতার জন্য অনেক ভালো অবস্থায় থাকতাম।’
এবারই কুমিল্লায় খেলছেন হৃদয়, সরাসরি সই করিয়ে তাকে নিয়েছে ভিক্টোরিয়ানস। বিদেশিদের আধিপত্যে হৃদয় কতটা সুযোগ পাবেন এমন প্রশ্নে লিটন বললেন, ‘কাউকে সরাসরি চুক্তিতে নেওয়া হয়েছে তার মানে তাকে পরিকল্পনা করেই নেওয়া হয়েছে। তাকে সুযোগর দেব কি না? পর্যাপ্ত সুযোগই তাকে দেওয়া হবে।’ হৃদয় করেছেন ৪৭ রান, তবে খেলেছেন ৪১ বল। চার একটি আর দুটো ছক্কা। পরের ম্যাচে লিটন নিশ্চয়ই চাইবেন হৃদয় যেন রান তোলার গতিটা আরেকটু বাড়ান।
কাগজে কলমে কুমিল্লার সঙ্গে শক্তির পার্থক্যটা বিশাল হলেও আবির্ভাবেই জিতে ঢাকা বুঝিয়ে দিলেও মাঠের হিসাবটা আলাদা। বড় কোনো তারকা ছাড়াই কুমিল্লাকে হারিয়ে দুর্দান্ত ঢাকার শুরুটাও হয়েছে দুর্দান্তভাবেই। অন্যদিকে হেরে খুব একটা অখুশি নয় কুমিল্লাও, কারণ লম্বা এই দৌড়ে শুরুটা নয় শেষটাই যে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
