সাধারণত ছোটবেলা থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে, মেডিকেলে কিংবা রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন থাকে তরুণদের। তাদের বড় একটা অংশ কোথাও ভর্তি হতে না পেরে যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কোনো কলেজে ভর্তি হন তখন অনেকেই আশাহত হন। নানান প্রতিবন্ধকতা আর সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে চলতে থাকা এসব শিক্ষার্থীর লালিত স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায় একসময়। স্বপ্নাহত এসব তরুণকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে ‘হাউজ অব এনইউবিডিয়ানস’ নামে ব্যতিক্রমী প্ল্যাটফর্ম চালু করেছেন তরুণ প্রকৌশলী মো. পলাশ হোসাইন, যিনি ‘পলাশ সকাল’ নামে বেশি পরিচিত।
এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম দেশে এটাই প্রথম। এর মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মোন্নয়ন, মানসিক কাঠামোর পরিবর্তন ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও সহযোগিতা করা হয় বিনামূল্যে। আত্মোন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও উন্নত ক্যারিয়ার গঠনে বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করা হয় এ প্ল্যাটফর্মে।
২০২০ সালের জুলাই মাসে যাত্রা শুরুর পর অনলাইন এ প্ল্যাটফর্মে এখন পর্যন্ত যুক্ত হয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ তরুণ। এখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দক্ষতার উন্নয়নের জন্য অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে চাকরির প্রস্তুতির জন্য মাসিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়। কুইজ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, চাকরি মেলা, ক্যারিয়ার মিটআপ, ম্যাগাজিন প্রকাশ প্রভৃতি কাজও চলে এখানে। অনলাইনে ক্লাস নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে ‘শিক্ষা গুরু’ নামের একটি অনলাইন অনুষ্ঠান হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার দলাদিয়া গ্রামের শুক্কুর আলী ও মোছা. আমেনা বেগমের ছেলে পলাশ ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) থেকে বস্ত্রকৌশলে (টেক্সটাইল) বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন ২০১২ সালে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ) থেকে এমবিএ (মার্কেটিং) ডিগ্রি নেন তিনি।
পলাশ বর্তমানে বিভিন্ন তারকা ক্রিকেটারের ‘স্পোর্টস এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। প্রকৌশলবিদ্যাটাও পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখেননি। গড়ে তুলেছেন একটা বায়িং হাউজ। এতকিছুর পরও তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে ঘুরে বেড়ান দেশের নানাপ্রান্ত। তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশের একাধিক অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন।
কেন, কীভাবে এ উদ্যোগের যাত্রা জানতে চাইলে পলাশ সকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতে শিক্ষাসংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। নানারকম সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সেখানকার শিক্ষার্থীদের মেধাবিকাশের গন্ডি বেশ ছোট। ক্যারিয়ার ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে এক ধরনের মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন তারা।
‘আবার শিক্ষাজীবন শেষে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বুয়েটিয়ান, ডুয়েটের শিক্ষার্থীরা ডুয়েটিয়ান এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও নিজেদের পরিচয় দিতে পারেন, তাদের একটা প্ল্যাটফর্ম আছে। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন কোনো পরিচয় নেই বলে তাদের অনেকে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। কর্মজীবনেও তাদের মোকাবিলা করতে হয় নানা চ্যালেঞ্জ। অথচ তাদের মধ্যেও রয়েছেন অসংখ্য মেধাবী। প্রতিকূলতাকে জয় করে তাদের অনেকে পেশাগত জীবনে ঈর্ষণীয় সাফল্য পেয়েছেন। সুযোগ পেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নিজেদের মেলে ধরতে পারবেন। এমন ভাবনা আর বিশ্বাস থেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এ প্ল্যাটফর্ম’, যোগ করেন পলাশ।
আলাপচারিতায় জানা গেল, ২৫টি জেলায় ৩০টিরও বেশি ক্যাম্পাসে ‘হাউজ অব এনইউবিডিয়ানস’-এর ‘ক্যাম্পাস দল’ রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তরুণদের চাকরির সুযোগ দিতে ইতিমধ্যে ১৫টির বেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহী ও বরিশালে দুটি ক্যারিয়ার মিটআপের আয়োজন করা হয়েছে যেখানে শত শত শিক্ষার্থী অংশ নেন। চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে সিভি সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। পর্যায়ক্রমে অনেকেরই কর্মসংস্থান হয়েছে।
পলাশ বলছিলেন, ‘ক্যারিয়ারবিষয়ক ৫২০টিরও বেশি অনলাইন ক্লাসের পাশাপাশি ১২৫টি লাইভ অনুষ্ঠান করা হয়েছে। ১০টির বেশি ক্যাম্পাসে লাইব্রেরি করে দেওয়া হয়েছে, যেখানে আত্মোন্নয়নমূলক বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে এসব বই পড়ার সুযোগ পান। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, শীতবস্ত্র বিতরণ প্রভৃতি সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হয়। বহুমুখী উদ্যোগের ফলে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক উন্নয়ন লক্ষ করছি। হীনম্মন্যতা, দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে তারা এখন অনেক আত্মবিশ্বাসী। এটা দেখে খুব ভালো লাগে। তাদের জন্য আরও কাজ করার উৎসাহ পাই।’
ক্যাম্পাসে তুখোড় বিতার্কিক ছিলেন পলাশ। সাংবাদিকতাও করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ২০১০ সালে হাজার প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে ইন্টার ইউনিভার্সিটি ইংলিশ ডিবেটে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর টেক্সটাইল ও ফ্যাশন ডিজাইনের ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত ‘টেক্সটাইল ট্যালেন্ট হান্ট-২০১২’-তে পেয়েছেন প্রথম রানারআপের পুরস্কার।
পাস করার পর পলাশ যোগ দেন একটি বায়িং হাউজে। কিন্তু চাকরিতে মন বসছিল না তার। কারণ ছোটবেলা থেকেই তার মন ছিল ক্রিকেটের বাউন্ডারি লাইনে। ক্রিকেট নিয়ে নতুন কিছু করার ভাবনায় তার মাথায় এলো স্পোর্টস এজেন্ট হিসেবে কাজ করলে কেমন হয়? বাংলাদেশে স্পোর্টস এজেন্টের ধারণা একেবারেই নতুন হওয়ায় লোকজনকে বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হয় তার। কিন্তু লেগে থাকেন তিনি।
২০১৪ সালের শেষদিকে কাজে নেমে পড়েন পলাশ সকাল। চাকরি তখনো ছাড়েননি। বিকেলে অফিস শেষে ছুটে যেতেন ক্রিকেটারদের কাছে। কিছুদিন পর বুঝলেন, এভাবে হবে না। চাকরি অথবা স্পোর্টস এজেন্ট, যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর চাকরি ছেড়ে দেন তিনি।
এরপর এক ক্রিকেটার থেকে আরেক ক্রিকেটারের পেছনে ঘুরেছেন। প্রতিষ্ঠান না থাকায় তেমন পাত্তা পাচ্ছিলেন না। ২০১৫ সালের এপ্রিলে পাওয়ার প্লে কমিউনিকেশনস নামে একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি পরিচিতি পায় ও সুনাম ছড়াতে থাকে।
মাঠের বাইরে ক্রিকেটারদের বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তির ব্যবস্থাপনা, ক্রিকেটারদের সঙ্গে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ স্থাপন ও যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করেন একজন স্পোর্টস এজেন্ট। অনেকটা ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপকের মতো। ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও কাজ করেন পলাশ। মাঠের বাইরে ক্রিকেটারদের দৈনন্দিন রুটিনের যাবতীয় বিষয়ের দেখভাল করা, ক্রিকেটারদের খারাপ সময়ে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা তার কাজের মধ্যে পড়ে বলে তিনি জানান।
প্রায় সব ক্রিকেট তারকার সঙ্গেই কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে উল্লেখ করে পলাশ বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন খেলে তখন অন্যদের চেয়ে আমার টেনশন হয় বেশি। কারণ খেলোয়াড়দের মাঠের পারফরম্যান্সের ওপর আমার পারফরম্যান্সনির্ভর করে।’
