প্রযুক্তি মানবজীবনকে সহজ সুন্দর সমৃদ্ধ সাবলীল করেছে। এর ছোঁয়ায় মানুষের জীবনে এসেছে নবদিগন্ত। তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে মানুষ এখন বিশ্ব নিয়েছে হাতের মুঠোয়। পৃথিবী পরিণত হয়েছে বিশ্বগ্রামে। প্রযুক্তি আমাদের শুধু সফলতাই বয়ে নিয়ে আসে তা কিন্তু নয়, ক্ষতিরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তির অপব্যবহারে নতুন প্রজন্ম বিপথগামী হচ্ছে। একসময় শিশুদের শৈশব ছিল প্রাণোচ্ছলতায় ভরপুর। খেলাধুলা, সাঁতার কাটা, মাছ ধরা, রোদে ঘুরে বেড়ানো, পাখির ডিম, পাখির খাঁচা থেকে বাচ্চা নিয়ে আসা, আশপাশের খালি জায়গায় নানা ধরনের খেলাধুলা ছিল নিখাঁদ আনন্দের। অথচ বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিষয়টি স্বপ্নবিলাস মনে হতে পারে। দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, গোল্লাছুট, রসকস, লাটিম, কুতকুত, ফুটবল খেলা ছিল নৈমিত্তিক বিষয়। অথচ সেগুলো গ্রাস করে নিয়েছে মোবাইল, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো, ফেসবুক।
বৈশ্বিক বাস্তবতায় প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ সময়ে, প্রযুক্তির কল্যাণমুখিতার দিক বিবেচনায় আমাদের চিন্তাচেতনা যাপিত জীবনে বহুমাত্রিক উৎকর্ষ নিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহারে নতুন প্রজন্মের স্বাভাবিক জীবন প্রণালি, রীতি-নীতি, অভ্যাস, আইনকানুন, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আদর্শ মূল্যবোধ, লোকজ-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনোদন জগতকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। এক কথায় পাল্টে দিয়েছে সমাজ কাঠামোকে। তৈরি হচ্ছে সাংস্কৃতিক ব্যবধান।
প্রযুক্তির অপব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অসীম সম্ভাবনাময় দেশ-জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের কর্ণধার শিশু-কিশোরদের ওপর। প্রজন্ম বিনাশী প্রযুক্তি আমাদের উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ, হতাশার জাল বুনছে। তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ, আকাশ সংস্কৃতির দাপটে বিশ্বব্যাপী সংস্কৃতির আগ্রাসন চলছে, দেশ থেকে দেশান্তরে। তথ্যের অবাধ প্রবাহের অপব্যবহারে ডুবে যাচ্ছে আমাদের কোমলমতি শিশু-কিশোরা। খুব সহজে নিজের অজান্তে ক্রমে ধাবিত হচ্ছে বিপথগামিতার দিকে। প্রযুক্তির দুষ্টচক্রে ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে আমাদের শিশু-কিশোররা।
দিন দিন আমাদের শিশুরা মমতাহীন, মায়া-দয়াহীন, বোধ-বিবেচনাহীন, যন্ত্রমানবে রূপ নিচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহারে শিশু-কিশোররা সামাজিক না হয়ে, হয়ে উঠছে অসামাজিক-পাশবিক। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। হয়ে উঠছে কিশোর অপরাধী। তৈরি করছে নিত্যনতুন গ্যাং কালচার। রবীন্দ্রনাথ যথার্থ বলেছেন ‘আধুনিকতা দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ।’ প্রযুক্তির অপব্যবহারে নষ্ট হচ্ছে সুন্দর আগামী। বিবর্ণ হচ্ছে সোনালি শৈশব। স্বপ্ন বুননের উপযুক্ত সময় দখল করেছে টিকটক, লাইকি, সাইবার বুলিংয়ের মতো সোশ্যাল মিডিয়াগুলো।
আজকাল শিশু-কিশোরদের সুবিশাল আকাশ, সবুজ মাঠ, বন-বনানি, সবুজে শ্যামলে শস্যে ভরা ক্ষেতখামার দেখার এতটুকু সময় নেই। প্রযুক্তির সান্নিধ্য তাদের আকর্ষণ করে না। তাই তো বেড়াজালে আটকে, জীবনে আশার আলো হারিয়ে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। তারা জীবনকে তুচ্ছ মনে করে। তারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে তৈরি করছে গ্যাং, জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদ। বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়।
এক গবেষণা থেকে জানা যায়, রেডিয়েশনের কারণে মস্তিষ্কের ব্লাড ব্রেন বেরিয়ার লিক করে। ফলে রক্তের বিষাক্ত পদার্থ এই পর্দা ভেদ করে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে মস্তিষ্কের কোষের ক্ষতি হয়। ৩০ মিনিটের বেশি মোবাইলে কথা বললে, মস্তিষ্কের কাজের ক্ষমতা কমে যায়। এ ছাড়াও মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে হতে পারে, থাইরয়েড গ্রন্থিতে ক্যানসার এবং প্রজনন সমস্যা। বেশি সময় ধরে মোবাইল ব্যবহারের ফলে পুরুষের শুক্রাণু হ্রাস, মহিলাদের গর্ভপাতের সম্ভাবনা, শিশুদের ক্যানসার, ঘুমের সমস্যা, স্মৃতি হ্রাস, হৃদরোগ, শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মোবাইল কল যখন দুই মিনিট স্থায়ী হয় তখন তা শিশুদের মিস্তষ্কের হাইপার অ্যাক্টিভিটি সৃষ্টি করে, যা পরবর্তী এক ঘণ্টা পর্যন্ত তাদের মিস্তষ্কে বিরাজ করে। ফলে শিশুরা স্নায়ু দুর্বল, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, জীবনী শক্তি হ্রাস, সৃজনশীলতা হ্রাস, অস্বাভাবিক আচরণ, এমনকি অটিজমের মতো ভয়াবহতার দিকে ধাবিত হয়।
ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের এক গবেষণায় উঠে এসেছে স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট নিয়ে বেশি সময় কাটানো শিশু-কিশোরদের দিনে এক ঘণ্টা মোবাইল ফোন ও ট্যাবলেটের টাচস্ত্রিন নিয়ে নাড়াচাড়ার কারণে প্রতিদিন অন্তত প্রায় ১৫ মিনিটের ঘুম কমে যায়। এসব ডিভাইস থেকে নীল রঙের এক ধরনের আলো বিচ্ছুরিত হয়। যা মানুষের ঘুমানোর সক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ২০১০ সালে স্টিভ জবস সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, তার সন্তানরা এটি ব্যবহার করে না। তাদের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। শুধু স্টিভ জবসই নয়, অন্যান্য প্রযুক্তির আইকনরাও সন্তানদের প্রযুক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেছেন, মোবাইল আসক্তি মাদকের চেয়েও ভয়াবহ। বিশ্বের টেকজায়ান্টরা শিশুদের ওপর প্রযুক্তির বিরূপ প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ও তাদের জন্য প্রযুক্তিবিহীন স্কুলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
মার্কিন প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ওজনিয়াক ফেসবুক নিয়ে কতগুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবভিত্তিক কথা বলেছেন। জানিয়েছেন, ‘ফেসবুক মানুষের প্রাইভেসি নষ্ট করে। ফেসবুকের সুবিধা পাওয়া সম্ভব কিন্তু আমার পরামর্শ হচ্ছে, কীভাবে ফেসবুক ছাড়া যায় তা খুঁজে দেখা।’ ফ্রান্সের সরকার পার্লামেন্টে আইন পাস করেছে, ১৫ বছরের নিচে কোনো শিশু-কিশোরদের হাতে স্মার্টফোন ট্যাবলেট বা ইন্টারনেট সংযুক্ত ডিভাইস বা এ ধরনের কাজ করতে পারে এমন ডিভাইস তাদের থেকে দূরে রাখতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের পথ সুগম হবে। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
লেখক: প্রভাষক ও কলাম লেখক
