সবার সুযোগ ফিরছে ভোটে

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:০২ পিএম

স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ের ভোটে দলীয় প্রতীক চালু করার পর সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা, মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার রাজনীতি উধাও হয়ে গেছে। এ কথা রাজনীতিক, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষশ্ব সবাই স্বীকার করছেন। টানা চতুর্থ দফায় সরকার গঠনের পর আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে দলের নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সবাই।

বিশেষজ্ঞ, রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষ বলছেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় আওয়ামী লীগেরও যে কেউ চাইলে প্রার্থী হতে পারবেন। আর যদি স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক রাখা না হয়, তাহলে বিএনপিসহ অন্য বিরোধী দলের নেতারাও ভোটে আসতে পারেন। এতে করে মাঠপর্যায়ে আগের মতোই ভোট উৎসব হবে।

তারা বলেছেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের কারণে দলগুলোতেই দ্বন্দ্ব-কোন্দল বেড়েছে। প্রতীক বাদ দিলে বিরোধ-সংঘাত থেকে পরিত্রাণ মিলবে। সামাজিক কর্মকা-ে যুক্ত থেকে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যায় পাশে দাঁড়িয়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের ধারাটিও আবার ফিরে আসবে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রার্থী হতে উৎসাহিত হবেন। দলকেন্দ্রিক বিরোধের কারণে সৃষ্ট সামাজিক বিরোধ কোন্দলও থাকবে না।

দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার আওয়ামী লীগ-বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ দুটি দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারাও জনপ্রিয় হওয়ার রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন সামাজিক কাজে যুক্ত থাকার রাজনীতি থেকে। প্রতীকে নির্বাচন আওয়ামী লীগ শুরু করলেও তৃণমূলে দলটির নেতাকর্মীদেরই অপছন্দের হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, প্রতীক বরাদ্দ রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন করার কারণে তৃণমূলের রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব-কোন্দলের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। পাড়া-মহল্লার রাজনীতিতে ভদ্রতা-সৌজন্যতা এসব নষ্ট করে ফেলেছে। তবে তারা এটাও মনে করছেন, প্রতীক রাখা না রাখার সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের সুবিধার জন্য।

আগামী এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে ধাপে ধাপে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গত ২৩ জানুয়ারি এ কথা জানানো হয়েছে। এর আগের দিন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের এক জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, উপজেলা নির্বাচনে কাউকে দলীয় প্রতীক নৌকা বরাদ্দ দেওয়া হবে না। দলের নেতারা যার যার মতো করে প্রার্থী হতে পারবেন। আর যেকোনো প্রার্থীর পক্ষে দলের নেতারা ভোট করতে পারবেন।

অবশ্য বিএনপি বলেছে, এ সরকারে অধীনে তারা কোনো নির্বাচনেই যাবে না।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং রাজনীতিতে জড়িত ননশ্ব এমন মানুষের ধারণা যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক স্থানীয় রাজনীতির সৌন্দর্য নষ্ট করে দিয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় বিভেদ ও বিরোধ জেঁকে বসেছে। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না করার আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের ফলে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে নেতাকর্মীদের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি অর্জনের চেষ্টাকে চাঙ্গা করবে।

এ বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তারা বলেন, জনপ্রিয়তা অর্জন করে জনপ্রতিনিধি হবেনশ্ব এ প্রত্যাশা নিয়ে পাড়া-মহল্লা ও সমাজে হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো নেতার সংখ্যাও বেড়ে যাবে। সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করার জন্য সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও আবার এগিয়ে আসবেন।

সাধারণ মানুষের এ অভিমতের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও একমত পোষণ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেননি। একমত প্রকাশ করেছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরাও।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন স্থানীয় রাজনীতিকে বিশৃঙ্খল করে তুলেছে। দলাদলি-কোন্দলের রাজনীতি সমাজসেবার রাজনীতিতে নিরাশ করেছে মানুষকে। এখন সমাজসেবার কাজে অনেকেরই এগিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে সবকিছু হবে ঠিকই, তাতে কোনো লাভ হবে মনে করেন না এ বিশেষজ্ঞ।

আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সঠিক প্রার্থী বাছাই করতে আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা অনাগ্রহী করে তুলেছে দলীয় নেতাকর্মীকে। সারা বছর ভালো কাজ করে, জনগণের পাশে থাকার রাজনীতি করেও যখন দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হন, হতাশ হয়ে সামাজিক কর্মকান্ড থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করেন তারা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি ঠিকই ছিল। সংকট মূলত সৃষ্টি করেছে অনিয়মের মধ্য দিয়ে প্রতীক পেয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ব্যক্তি কিন্তু মনোনয়ন তিনিই পাবেন এর কোনো নিশ্চয়তা থাকত না। তাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা, এলাকার মানুষের পাশে থাকার রাজনীতির চর্চা করা বন্ধ করে দেন তারা। শুধু আওয়ামী লীগই নয়, সামাজিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা এগিয়ে আসতে চাইতেন না।

তবে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। তা হলোশ্ব প্রতীক উঠে যাওয়ার মধ্য দিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে জামায়াত ইসলামী সবচেয়ে বেশি সুবিধা নেবে। তারপর বিএনপি নেবে। তারা মনে করছেন, বিএনপি সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন বর্জন করলেও, দলটির নেতারা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রার্থী হবেন।

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা বছর জনপ্রিয় হয়ে ওঠার রাজনীতি করলেন, জনপ্রিয়ও। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন বোর্ডে এসে ওই ব্যক্তি মনোনয়ন পান না। এরকম ঘটনা অনেক হয়েছে গত নির্বাচনগুলোতে। অনেক ক্ষেত্রে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা নেতাকর্মীরাও মনোনয়ন পেয়েছেন, এ নজির রয়েছে। ফলে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সরব উপস্থিতি দেখিয়ে পরিচিতি পাওয়া, জনপ্রিয় হয়ে ওঠার রাজনীতি করার মানসিকতা থাকে না।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, সারা দেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলার মূলে রয়েছে স্থানীয় নির্বাচন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের তদবির, মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অর্থ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিকদের নিরাশ করেছে। আবার স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাবের কাছেও ধরাশায়ী হতে থাকেন যোগ্যতাসম্পন্ন নেতারা। এসব কারণে সংগঠনের সব স্তরে কোন্দল রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে সারা দেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিভেদ-বিরোধ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটি প্রকাশ্যে এসেছে। তাই সাংগঠনিক রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমলে নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতীক বরাদ্দ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’

এদিকে সরকারি দলের কলাকৌশলে টিকে থাকতে পারবেন না মনে করে বিএনপিসহ অন্য দলের নেতারাও স্থানীয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থেকেছেন গত এক যুগের বেশি সময় ধরে। আবার বিএনপির নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণেও দলটির নেতাকর্মীরা দলীয় প্রতীক নিয়ে অংশ নিতে পারেন না। আওয়ামী লীগ মনে করছে, নৌকা প্রতীক না দিলে বিএনপির যারা মাঠপর্যায়ে নিজেদের ভোটের মাঠ ধরে রাখতে চান, তারা দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ভোটে আসবেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের রাজনীতি সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার ব্যক্তিদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘দলগুলো বিশেষ করে ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগের সঠিক প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যর্থতার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। জনপ্রিয় রাজনীতিকের হাতে প্রতীক বরাদ্দ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি অজনপ্রিয় করে তুলেছে।’

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘প্রতীকে হলেই কি, না হলেও কি। আওয়ামী লীগ নিজস্ব সমস্যার কারণে প্রতীকবিহীন নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাধারণ মানুষের আশা বাড়বে, সামাজিক কর্মকা-েও অংশগ্রহণ করবে। আমার শেষ কথা হলোশ্ব বাড়লেই কি আর না বাড়লেই কি? প্রতীকে নির্বাচন শুরু করা হয়েছে আওয়ামী লীগের সুবিধার জন্য। প্রতীক দেবে না, সেটাও তাদের সুবিধার সিদ্ধান্ত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত