পশ্চিমারা সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করবে

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২৪, ০৯:৩১ এএম

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন। নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাব, ভূ-রাজনীতি, যুদ্ধ, মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। এসব সাম্প্রতিক বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : আমাদের রাজনীতিতে নির্বাচনকে ঘিরে বিদেশিদের প্রভাব বেশ আলোচনায় ছিল এবার। নির্বাচনের পরে বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়াও দেখতে পাচ্ছি। সামনের দিনগুলোতে বিষয়টা কেমন থাকবে? 

মো. তৌহিদ হোসেন : আমাদের নির্বাচন নিয়ে গত কয়েক মাসে দেখা গেছে যে, পৃথিবীর যে বড় শক্তিগুলো আছে তারা এক ধরনের দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একদিকে চীন, ভারত, রাশিয়া তারা চেয়েছে বাংলাদেশে যেভাবে সরকার নির্বাচনের আঞ্জাম করছে, সেভাবে হয়ে যাক; এটা বাংলাদেশের ব্যাপার, এ ব্যাপারে কারও হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই। পক্ষান্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপ যেটা বলছে, সেটা হলো তারা বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর পাশাপাশি খানিকটা হুমকিমতো দেওয়া হয়েছে, যারা সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে বাধা সৃষ্টি করবে তারা রাজনীতিবিদ হতে পারে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হতে পারে, প্রশাসন হতে পারে, জুডিশিয়ারি হতে পারে তাদের তারা ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেবে। একপর্যায়ে সম্ভবত সেপ্টেম্বরের দিকে তারা ঘোষণা করল ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়া শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে ভারত অনেকটা চুপ ছিল, তাদের অবস্থানটা মোটামুটি বোঝা যাচ্ছিল কিন্তু তারা খুব বেশি ফোর্সফুলি কিছু বলছিল না। তবে শেষ মুহূর্তে তারা ফোর্সফুলি বলল এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এ ব্যাপারে কারও কোনো হস্তক্ষেপ ভারত চায় না। বিষয়টা খুব স্পষ্ট, এটা ভারতীয় অনেক পত্রপত্রিকাতে লেখা হয়েছে, তারা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কনসার্ন এবং তারা মনে করে বর্তমান সরকার কন্টিনিউ করলে তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি নিরাপদ থাকবে। এটা হলো অবস্থান নির্বাচনের আগে পর্যন্ত। এখন নির্বাচনের পরে যারা নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছিল বা আপত্তি করছিল, তারা বলেছে যে নির্বাচন সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হয়নি। কিন্তু লক্ষণীয় যে, তারপরে তারা এপারেন্টলি টোন ডাউন করেছে। তারা এখন বলছে, সরকারের সঙ্গে কাজকর্ম চালিয়ে যাবে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ভাষা বিভিন্ন জনের বিভিন্ন হয়েছে কিন্তু বক্তব্যটা এরকম যে, তারা আগে যাই বলে থাকুক না কেন বা এখন যাই করুক না কেন তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক যে কমিয়ে দেবে বা ছিন্ন করবে তা তো নয়ই বরং তারা এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করবে।

দেশ রূপান্তর : এটা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে যে আসলে পশ্চিম কি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলেছে কি না?

মো. তৌহিদ হোসেন : আমি ভুলও হতে পারি। আমি যেভাবে দেখছি সেটা হলো যে,  নির্বাচন কী হয়েছে সেটা আমরা জানি; সেটা নিয়ে আর কথা বলার প্রয়োজন নেই তাই না? যাই হোক, এখন এদের রিয়েকশনটা আমার কাছে অনেকটা মনে হয়েছে জেনারেল, যেমনটা নরমালি হয়ে থাকে। এখন তো তারা বলতে পারে না যে না, এ সরকারকে মানি না; বাংলাদেশের সরকারকে তাদের মানা বা না মানার কী আছে? কাজেই তারা তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক যেটুকু সম্পর্ক সেটুকু বজায় রাখতে চায়।

দেশ রূপান্তর : প্রথম দিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বলয় বেশ শক্ত মনোভাব দেখালেও পরে তাদের এই টোন ডাউনের বিষয়টি সম্পর্কে কী বলবেন?

মো. তৌহিদ হোসেন : একটা জিনিস আমাদের বুঝতে হবে, সেটা হলো যে কোনো অবস্থান কিন্তু স্থায়ী না। প্রত্যেক দেশ তার নিজের স্বার্থে অবস্থান ঠিক করে। আজকাল তো নতুন একটা কথা বেশ উচ্চারিত হচ্ছে যে, গণতন্ত্রের অর্থ সবখানে এক না। এই বাক্যটা বেশ প্রচার লাভ করছে, অনেকেই এটা বলতে খুব পছন্দ করে। কিন্তু তারা ভুলে যান যে গণতন্ত্রের কিছু মৌলিক বিষয় আছে। সেই মৌলিক বিষয়ের একটা হলো যে, অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন। আবার এই অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের বিভিন্ন সংজ্ঞা বিভিন্ন জন দিয়ে যাচ্ছে সেদিকে আমরা না গেলাম। যেটা মূল প্রসঙ্গ সেটা হলো, প্রত্যেক দেশ তাদের নিজের স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নেয়। পশ্চিমারা যে আগে থেকে আমাদের বলছিল, তারা যে চাপ সৃষ্টি করছিল সেটা তাদের স্বার্থেই। এই মুহূর্তে তাদের স্বার্থ যেভাবে উদ্ধার বা রক্ষিত হতে পারে বলে মনে করবে তারা সেরকমভাবেই সিদ্ধান্ত নিবে। এখানে লক্ষ্য একটাই, নিজেদের স্বার্থরক্ষা করা। এখন এটা করতে গিয়ে তারা আজ যে ভাষায় কথা বলছে, তিন মাস-ছয় মাস বা এক বছর পরে সে এই ভাষায় কথা বলবে এমন নিশ্চয়তা নেই এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। পশ্চিমারা খুব ভালোভাবেই জানে যে, আমরা তাদের পুরোপুরি এবানডন করতে পারব না। যেমন আমরা জানি, কারণ আমাদের যে বিরাট বন্ধুরা ভারত, রাশিয়া, চীন আছে তারা কেউ আমাদের কাছ থেকে এমন কিছু জিনিসপত্র কেনে না, আমাদের বাজার হচ্ছে পশ্চিমে। আমরা এদের কাছ (রাশিয়া, চীন, ভারত) থেকে কিনি, আমরা হলাম এদের কাস্টমার। পশ্চিমারা হলো আমাদের কাস্টমার। আমাদের কাস্টমারদেরই তো আমাদের নজরে রাখতে হবে। কাজেই আমাদের চেষ্টা থাকতেই হবে পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার এবং এটার কোনো বিকল্প নেই। এই পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে আমি মনে করি যে সরকারও হয়তো চেষ্টা করবে সম্পর্কটাকে পুনর্নির্মাণ করার। আবার পশ্চিমারাও কীভাবে তাদের স্বার্থ রক্ষিত হতে পারে সেভাবেই এগোনোর চেষ্টা করবে। কিন্তু আমি মনে করি যে, সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে এ-রকম মনে করা ঠিক হবে না।

দেশ রূপান্তর : আমরা জানি ভারত ও চীনের সম্পর্ক বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধাত্মক। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশ্নে এই দুই দেশের অবস্থান একই দিকে হেলে থাকছে। আগামীতে কি বিষয়টা নতুন কোনো টানাপড়েন তৈরি করবে? 

মো. তৌহিদ হোসেন : এটা বলা কঠিন। আপনি একটা জিনিস চিন্তা করুন, এই নির্বাচন যেভাবে হয়েছে এটাতে চীন সমর্থন দিয়েছে, ভারতও সমর্থন দিয়েছে। চীন এবং ভারত কি জিওপলিটিক্যাল ইস্যুতে একদিকে থাকতে পারবে? কাজেই এটা একটা ইস্যু বটে কিন্তু বৃহত্তর ইস্যুতে ভারতেরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করার ব্যবস্থা করতে হবে এবং রাখতে হবে। তারা হয়তো ভাবছে এভাবেই তারা ঠিক রাখতে পারবে। টু প্লাস টু মিটিংয়ে তো এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি এটা খুব পরিষ্কার। কারণ এরপরেই ভারত যে বিবৃতি দিয়েছে সেখানে এটা খুব স্পষ্ট হয়েছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা মনে করে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত তার সঙ্গে একমত না।  কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের বিরুদ্ধে গিয়ে ভারত চীনের পক্ষে চলে যাবে, তা তো হবে না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে কতটা চীনের হেলে পড়া সম্ভব হবে? বাংলাদেশ কি এতই ইন্ডিপেন্ডেন্ট একটা পলিসি নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করেছে? বাংলাদেশ কি ভারতকে অসন্তুষ্ট করে চীনের দিকে যেতে পারবে? আমি তো সেটা মনে করি না। আমাদের ক্ষমতার যথেষ্ট লিমিটেশন আছে, আমরা যতই নিজেদের বিশাল কিছু মনে করি না কেন।

দেশ রূপান্তর : মিয়ানমারের জান্তা সরকার বিদ্রোহীদের কাছে বিভিন্ন স্থানে মার খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা ইস্যুর ভবিষ্যৎ কী?

মো. তৌহিদ হোসেন : রোহিঙ্গা ইস্যুর ভবিষ্যৎ খুবই সমস্যাসংকুল এতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ ধরুন মিয়ানমারে জান্তা সরকারের পতন হলো এবং জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) নেতৃত্ব দখল করল, এখানে অন্য যে গ্রুপগুলো আছে তারা সম্মুখযুদ্ধে একেবারে পরাজিত করে রাজধানী দখল করে নিতে পারবে এটা আমার মনে হয় না। তবে তারা যেটা হয়তো পারবে কিছু কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ তারা দখল করে নেবে এবং নিচ্ছে। কিন্তু তারা যে একেবারে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে, যুদ্ধ করে জয়ী হয়ে নেতৃত্ব পর্যন্ত পৌঁছে যাবে এটা খুব তাড়াতাড়ি হবে এরকম আমার মনে হয় না। যেমন খবর পাওয়া যাচ্ছে, ম্যাক্সিমাম সম্ভাবনা হলো- রাখাইন রাজ্য অথবা তার একটা বড় অংশ হয়তো পুরোপুরি আরাকান আর্মির হাতে চলে যাবে। এখন আরাকান আর্মির হাতে গেলেই যে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হয়ে গেল এমনও কিন্তু না। মিলিটারির সঙ্গে গত ছয় বছরে কোনো সমাধান একটুও আগায়নি। আরাকান আর্মি নিজেরাও কিন্তু রোহিঙ্গাদের খুব একটা পছন্দ করে না। তবে সাম্প্রতিকালে তারা একটা বাক্য শুধু বলেছে, আরাকান আর্মি বলেছে যে, তাদের ভবিষ্যৎ প্রশাসনে তারা রোহিঙ্গাদেরও ইনক্লুড করবে। এই প্রথম তারাও রোহিঙ্গা সম্বোধন করে কথা বলেছে। এনইউজি দুটো স্টেটমেন্টে তাদের রোহিঙ্গা বলে সম্বোধন করেছে এবং তাদের আহ্বান জানিয়েছে এনইউজির সঙ্গে কাজ করার জন্য এবং জান্তার বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামে যোগ দেওয়ার জন্য।

দেশ রূপান্তর : দেশটির বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ভূমিকা ও বাংলাদেশের অবস্থান কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

মো. তৌহিদ হোসেন : আমার জানা মতে, আমরা বা রোহিঙ্গারা এ-ব্যাপারে কিছুই করিনি। রোহিঙ্গাদের অবস্থা খুব যে শক্তিশালী তা না। আমি মনে করি, যেহেতু মিলিটারিদের সঙ্গে হচ্ছে না, মিলিটারিদের সঙ্গে কথাবার্তা চলতে থাকুক, পাশাপাশি আনঅফিশিয়ালি এনইউজির সঙ্গে আমাদের আরও ওপেন আপ করা দরকার ছিল এবং তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের যুক্ত করে দেওয়ার দরকার ছিল। রোহিঙ্গাদের বলা বা ইঙ্গিত দেওয়া দরকার ছিল যে, ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টর মধ্যে তোমরা ঢুকো। তাদের সেভাবে মোটিভেট করা হয়নি, কিছুই হয়নি। বরং এখানে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা নিজেরা নিজেরা মারামারি করতে এবং ড্রাগ পাচারে ব্যস্ত। সত্যিকার অর্থে তারা কোনো ইনফ্লুয়েন্সে নেই। দু-একটা গ্রুপ কেবল নামে মাত্র আছে। আরসাকে তো আমার মনে হয় তারা মিয়ানমার মিলিটারির সঙ্গেই কাজ করছে। যাই হোক, এটা আমার পক্ষে প্রমাণ করার সুযোগ নেই, কিন্তু আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। এই অবস্থায় রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান খুব চট করে হয়ে যাবে, এমন না। মিয়ানমারের নেক্সট সেটআপটা কী হয় সেটা দেখতে হবে। আমি এখনো বিশ্বাস করি যে সেটআপই হোক সেটা আলটিমেটলি একটি আলোচনা টেবিলে বসে ঠিক হবে। সম্ভবত ফেডারেল স্ট্রাকচারের দিকেই যাবে, যেটাতে হয়তো এথনিক এলাকাগুলো হয়তো বেশ খানিকটা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। আর সেক্ষেত্রে রাখাইন স্টেটে নিঃসন্দেহে আরাকান আর্মির কর্তৃত্ব থাকবে। মানে ফেডারেল স্ট্রাকচারের দিকে গেলে তারাই হবে রাখাইনের আসল কর্র্তৃপক্ষ। তাদের সঙ্গেই আমাদের নেগোশিয়েট করতে হবে। কাজেই, আগে থেকেই তাদের সঙ্গে কথা চালানোর সুযোগ তৈরি করা দরকার।

দেশ রূপান্তর : মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে ‘বার্মা অ্যাক্টের’ প্রভাব কতটা?

মো. তৌহিদ হোসেন : বার্মা অ্যাক্টে বলা আছে যে, এখানকার যুদ্ধমান যে দলগুলো আছে সেগুলোকে ননলিথাল সাপোর্ট দেবে আমেরিকা। এই সাপোর্ট অনেক কিছুই হতে পারে। তারা যদি বাকি সবকিছুতে ননলিথাল সাপোর্ট পায় তবে অন্যদের থেকে তারা হয়তো লিথাল সাপোর্ট জোগাড় করে নিতে পারবে।

দেশ রূপান্তর : মনে হচ্ছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের যুদ্ধক্ষেত্র ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপের দিকে যাবে। কিন্তু বর্তমানে গাজা পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ফের মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কতটা?

মো. তৌহিদ হোসেন : এটা আসলে সতত পরিবর্তনশীল একটা পরিস্থিতি, কী হয় বলা কঠিন। তবে প্রত্যেকটা যুদ্ধই তো বাস্তব, একটা থেকে আরেকটার দিকে নজর সরে গেলেও তো আগের যুদ্ধটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। মানুষের সাফারিং তো হতেই থাকবে, তবে যেটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সেটা হলো যে, ইউক্রেন যেরকম মনে হচ্ছিল যে বেশ আপার ফ্যাসিলিটি পাবে সেটা হয়তো নাও পেতে পারে। কারণ বিশেষ করে যদি ট্রাম্প সাহেব আসেন তাহলে তো তিনি ইউক্রেনকে কোনো পয়সাপাতি দেবেন বলে মনে হয় না। আর পয়সা না থাকলে তো কেউ কোনো কিছু করতে পারবে না।

দেশ রূপান্তর : গাজা পরিস্থিতিতে পশ্চিমা মানবতাবোধ ও গণতন্ত্র কি মৌলিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে না? এ অবস্থায় তারা কি ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা ও ছাড় দেওয়া বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করবে? আমেরিকাতেই এ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

মো. তৌহিদ হোসেন : এটাকে আপনি এভাবে দেখবেন না। আমেরিকা বা প্রত্যেক দেশেই শক্তকিছু অবস্থান থাকে যেগুলোর ব্যাপারে তাদের কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিকারাগুয়ার স্বৈরশাসক আনাস্তাসিও সোমোজা সম্পর্কে একটা বহুল আলোচিত মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, He [Somoza] may be a son of a bitch, but he’s our son of a bitch. এখন শুদ্ধ হোক বা ভুল হোক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতির কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ইসরায়েলের স্বার্থ।

দেশ রূপান্তর : দ্বি-রাষ্ট্র নীতির কথা তো এখন আমেরিকাও বলছে...।

মো. তৌহিদ হোসেন : আমার মতে দ্বি-রাষ্ট্র নীতি হলো ইসরায়েলির স্বার্থের পক্ষে, কিন্তু ইসরায়েলের বর্তমান নেতৃত্ব সেটা মনে করে না। যে দুই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান চেয়েছিলেন তাদের দুজনেরই প্রশ্নবিদ্ধ মৃত্যু হয়েছে। একজনকে প্রকাশ্যে দিবালোকে গুলি করে মেরে ফেলছে, আরেকজন কোমাতে চলে গিয়ে মারা গিয়েছেন। কোমায় কীভাবে গেছেন, সেটাও আমরা জানি না। দেখেন নেতানিয়াহু তো সরাসরি বলছেন এটা সম্ভব না। এখন সেটা সম্ভব না হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা সেটা হচ্ছে তাদের জিজ্ঞাসা করা দরকার যে, ঠিক আছে, দ্বী-রাষ্ট্র সমাধান সম্ভব না, তাহলে কী সম্ভব বলো? কারণ এই যে বর্ণবাদী ব্যবস্থা এটা তো স্থায়ী হতে পারে না, ৭০ বছর যাবৎ চলছে। তোমরা তাদের ঘরবাড়ি, ভূমি দখল করে নেবে, তাদের কোনো অধিকার থাকবে না, তোমরা তাদের পিটাবে-মারবে, তারা প্রতিবাদ জানায়, দু-একবার লাঠি তুলে প্রতিরোধ করতে যায় তুমি তখন সেলফ ডিফেন্স, নিরাপত্তার কথা তুলে মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে এটা তো চলতে পারে না। দিনের পর দিন ফিলিস্তিনিদের ভূমি, ঘরবাড়ি দখল করে থাকা আল্ট্রা অর্থোডক্সরা ফিলিস্তিনিদেরই বলছে তোমরা এখান থেকে চলে যাও, এবং এটা চলছে। এটার কোনো বিচার নেই। তো এই হলো অবস্থা। এখন এই অবস্থায় প্রথম বারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু ইসরায়েলের কর্মকান্ডের কিছু বিরোধিতা হচ্ছে। যেটা আগে কেউ সাহস করেনি কখনো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোতে এ বিষয়ে এক ধরনের গোপনীয়তার ব্যাপার স্যাপারও আছে, ফলে সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। সেখানে ইহুদি লবি যেটা আছে সেটা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা ফাইনান্স কন্ট্রোল করে, তারা মিডিয়া কন্ট্রোল করে। এই দুইটা কন্ট্রোল করার পরে অন্য কারও আর তেমন কোনো ক্ষমতা থাকে না। অ্যাকাডেমিয়াও তারা নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের জনসংখ্যার তুলনায় তাদের গবেষক, বিজ্ঞানীদের সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক ইউনিভার্সিটিতে এমন অবস্থা যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে না।

দেশ রূপান্তর : সামনে পাকিস্তান, ভারত, রাশিয়া, আমেরিকারও নির্বাচন আছে আপনি জানেন। ২০২৪ বিশ্বের ভূ-রাজনীতি এবং গণতন্ত্র কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন? বাংলাদেশে এর প্রভাব কেমন হবে?

মো. তৌহিদ হোসেন : রাশিয়ার নির্বাচনে কিছু আসে যায় না। আবার ভারতের নির্বাচনেও কিছু আসে যায় না, কারণ মোটামুটি সবারই ধারণা ভারতে বিজেপিই ফের ক্ষমতায় আসছে। এমনকি যেসব স্টেটে বিজেপি হারবে বলেছিল, সেগুলোতেও বিজেপি জিতে আসছে। বিজেপিকে এই মুহূর্তে সরানোর মতো শক্তি কংগ্রেস অর্জন করেনি। কাজেই ভারতের নির্বাচনে কোনো তফাৎ হবে না, যে সরকার আছে, যেই নীতি আছে সেটাই তারা বহাল করবে। রাশিয়াতে তো চেইঞ্জের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনই এদিক থেকে ডিফারেন্ট। কারণ সমূহ সম্ভাবনা আছে বাইডেন সাহেবের হেরে যাওয়ার এবং ট্রাম্পের ফেরত আসার। ট্রাম্প যদি ফেরত আসেন তাহলে কিছু পরিবর্তন হবে। যেমন তিনি অলরেডি বলেছেন যে, রাশিয়া যদি ইউরোপকে আক্রমণ করে আমেরিকা তাদের উদ্ধার করতে যাবে না। সে ন্যাটোর বিরোধী। তারপরে রাশিয়ার পুতিনকে সে পছন্দ করে। কাজে সব মিলিয়ে এই কারণে হয়তো পূর্ব-পশ্চিম সম্পর্কের মধ্যে বন্ড সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের এখানে বড় কোনো অধিকার থাকবে বলে আমি মনে করি না। আমরা আমাদের যে স্বার্থ আছে সেগুলোকে যদি আমরা ফলোআপ করতে থাকি, বাইরের ভূ-রাজনৈতিক যে পরিবর্তন সেটা আমাদের বড়ভাবে এফেক্ট করবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন যা-ই হোক চীন আমাদের বাজার হবে না, রাশিয়াও আমাদের বাজার হবে না।           

অনুলিখন : মোজাম্মেল হক হৃদয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত