শুধু ফলের দোকান নয়, রাস্তাঘাটে বিভিন্ন ভ্যানেও বড় আকৃতির কাজী পেয়ারার আধিপত্য চোখে পড়ে। মূলত ভালো স্বাদ ও সারাবছর সহজলভ্যতা হওয়ায় কাজী পেয়ারার এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ। তবে যার নামে এই পেয়ারা তিনি জানিয়েছিলেন কাজী পেয়ারার উদ্ভাবন বা নামকরণ, কোনোকিছুর সঙ্গেই সম্পর্ক ছিল না তার!
এক সাক্ষাৎকারে বিজ্ঞানী কাজী এম বদরুদ্দোজা বলেন, কাজী পেয়ারার নামকরণ আমার নামে হয়েছে। কিন্তু আমি এটা করিনি। আমি ওইসময় চাকরিও করতাম না, এগ্রিকালচার রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে অবসর নিয়েছি। পেয়ারাটা যখন নতুন বের হলো, আমার অনুসারীরা ভালোবাসা থেকে নামটা দেয়।
তিনি আরও বলেন, প্রথমদিকে ওদের সঙ্গে একটু রাগারাগি করেছি। কিন্তু তাদের যুক্তি ছিল ওরা আমি চাকরিতে থাকাকালে পড়াশোনা করেছে, বিজ্ঞানী হয়ে কাজ করেছে, তাই আমার নামে নাম রাখার অধিকার আছে ওদের।
কাজী এম বদরুদ্দোজা ছিলেন বাংলাদেশের নামকরা কৃষিবিজ্ঞানী। ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট বর্ষীয়াণ এই বিজ্ঞানী মারা যান। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মীর্জা হাসানুজ্জামানের মতে, বাংলাদেশের কৃষি বলতেই কাজী এম বদরুদ্দোজাকে বোঝায়। অনেকেই তার কাজের ব্যাপারে বিস্তারিত জানেন না। কৃষিবিজ্ঞান ও গবেষণায় তার অনেক অবদান।
দেশে আধুনিক জাতের গম উদ্ভাবন ও চাষ শুরু করেন কাজী এম বদরুদ্দোজা। এমনকি ভুট্টার বাণিজ্যিক আবাদও তার মাধ্যমে শুরু হয়। ভুট্টা থেকে তেল উদ্ভাবন এবং তা পোল্ট্রি শিল্পের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার শুরুর ধারণাটিও তারই ছিল।
কাজী এম বদরুদ্দোজার জন্ম বগুড়া জেলায়। ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি তিনি মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস গাইবান্ধায়। ১৯৪২ সালে গোবিন্দগঞ্জ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। এরপর ১৯৪৪ সালে আইএসসি পাশ করেন রাজশাহী কলেজ থেকে। এক বছর পর ভর্তি হন রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বেঙ্গল কৃষি ইনস্টিটিউটে (বর্তমান নাম, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমএসসি সম্পন্ন করেন। পিএইচডি করেন যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
কাজী এম বদরুদ্দোজার কর্মজীবন শুরু হয় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান রিসার্চ কাউন্সিলের অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। পরে তিনি ধারাবাহিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তান রিসার্চ কাউন্সিলের পরিচালক ও মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পাকিস্তান কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের পদ ছেড়ে দেশে চলে আসেন। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণাগারের প্রথম পরিচালক হিসেবে যোগ দেন তিনি। পরে তিনি একই ইনস্টিটিউটে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচারের সভাপতি ও বাংলাদেশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলে তিনি তঘমা-ই-পাকিস্তান এবং তঘমা-ই-ইমতিয়াজ খেতাব অর্জন করেছিলেন। পরে ১৯৯৯ সালে তাকে সম্মাননা দেয় বিশ্ব কৃষি গবেষণা সংস্থা। কৃষিক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০১২ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ লাভ করেন।
