এই বিশ্বকাপকে মন্দের ভালো বলা যাবে?

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৩ এএম

লিওনেল পারেদেস ও গাভির হাতাহাতির মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে কোথায় স্থান করে নেবে, তার একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন করা যাক।

‘বালোগুন ইস্যু’র এখনো বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে। এ মুহূর্তে মনে হতে পারে বিশ্ব এগিয়ে গেছে এবং বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে গেছে, কিন্তু যেকোনো টুর্নামেন্টের গতিপথই এমন। তাদের নিজস্ব একটি গতি থাকে, শেষের দিকে পৌঁছানোর এমন একটি তীব্র টান থাকে, যা অন্য সবকিছুকে পেছনে ঠেলে দেয়। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, রাজনৈতিক চাপের কাছে মাথা নত করে ৬৪ বছরের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকে একপাশে সরিয়ে কোনো এক নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে মাঠে নামার সুযোগ করে দেওয়া ঠিক যেমনটা জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রে করেছিলেন, কিংবা ক্লাব বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির খেলা নিশ্চিত করতে যোগ্যতা অর্জনের নিয়ম কাটছাঁট করেছিলেন ফুটবলের ইতিহাসে একটি বড় নেতিবাচক মোড় হয়ে রইল।

হয়তো ভবিষ্যতেও সহজভাবে এই নীতি মেনে নেওয়া হবে যে বিখ্যাত খেলোয়াড়রা বিশেষ ছাড় পাবেন। কারণ ফুটবলের সুশাসন বা সততার চেয়ে অর্থ উপার্জন বেশি গুরুত্বপূর্ণ, এবারের টুর্নামেন্টে যেমনটা হয়েছে। অথবা হতে পারে এটি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে বিরোধিতার শক্তিকে আরও জোরদার করবে। উদাহরণস্বরূপ বেশ লক্ষণীয় বিষয় হলো কতসংখ্যক ব্রিটিশ ও কিছু আমেরিকান রাজনীতিবিদ ফিফা এবং এর সভাপতির সমালোচনা শুরু করেছেন। এর একটি তাৎক্ষণিক পরিণতি হতে পারে বিশ্বকাপের পরিধি বাড়িয়ে ৬৪ দলে রূপান্তর করা, যাতে ইনফান্তিনো তার সমর্থক গোষ্ঠীকে ধরে রাখতে পারেন বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের (এবং কানাডার) অভিবাসন নীতি গ্লোবাল সাউথের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে তার করা দাবিগুলোর যে ক্ষতি করেছে, তা সামাল দিতে।

ম্যাচগুলোর হইচইয়ে ঢাকা পড়ে যাওয়া অন্য বিতর্কিত বিষয়গুলো নিশ্চয়ই আবার সামনে আসবে। উদাহরণস্বরূপ, ইরানের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা ছিল এক কথায় কেলেঙ্কারি এবং তা একটি উদ্বেগজনক নজির স্থাপন করেছে। ২০৩০ বিশ্বকাপে টিকিটের দাম হয়তো খানিকটা কম হতে পারে, কিন্তু প্রতি সপ্তাহে লিগ ফুটবল দেখতে যাওয়া সাধারণ সমর্থকদের জন্য একটা বড় অংশের টিকিট বরাদ্দের যে বিষয়টি ছিল, তা এখন চিরতরে অতীত। বিশ্বকাপ আর কোনো গণমানুষের উৎসব নয়, এটি এখন স্রেফ একটি বিলাসবহুল ইভেন্ট।

এটি এই টুর্নামেন্টে গণমাধ্যমের প্রতি ফিফার সামগ্রিক অবহেলা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের সঙ্গেই মিলে যায়। যদিও কিছু ভেন্যু বিশেষ করে হিউস্টন এবং আটলান্টা সাংবাদিকদের স্বাগত জানাতে দারুণ চেষ্টা করেছে, তবে সামগ্রিক সুযোগ-সুবিধা এবং মৌলিক ব্যবস্থাপনা ছিল বিগত অন্তত ছয়টি বিশ্বকাপের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। অবশ্য সাধারণ মানুষের সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধা বা ওয়াইফাই কাজ করছে কি না তা নিয়ে মাথাব্যথা না থাকাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এটি ফিফার চিন্তাভাবনার একটি রূপ তুলে ধরে : সমর্থক বা দর্শকরা হলো শুধুই টাকা আদায়ের যন্ত্র; আর মিডিয়া হলো এক বিরক্তিকর বাধ্যবাধকতা।

এদিকে মাঠের ফুটবল ভালো হলেও খুব ‘মহান’ বা ঐতিহাসিক স্তরের ছিল না। বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত এবং রোমাঞ্চকর ম্যাচ আমরা দেখেছি ব্রাজিল বনাম জাপান, মরক্কো বনাম নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড বনাম মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা বনাম কেপ ভার্দে, নরওয়ে বনাম আইভরি কোস্ট, বেলজিয়াম বনাম সেনেগাল, নরওয়ে বনাম ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বনাম মিসর কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো এর প্রায় সবই ছিল শেষ ৩২ বা শেষ ১৬-র লড়াইয়ে। কোয়ার্টার ফাইনালগুলো খুব একটা আকর্ষণীয় বা রোমাঞ্চকর ছিল না। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার জয়টি রোমাঞ্চকর ছিল এবং তাতে ইংল্যান্ডের এমন এক বিপর্যয় জড়িত ছিল, যা নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হবে, তবে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে স্পেনের জয়টি ছিল বড্ড সহজ। স্পেন দ্রুতই ফরাসিদের ওপর এমন আধিপত্য বিস্তার করেছিল, যা পুরো ম্যাচে আর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি।

আর ফাইনালটি ছিল এক কথায় হতাশাজনক এবং কুরুচিপূর্ণ। সঠিক দলটিই জিতেছে, তাদের সেই পরিচিত ও শীতল আধিপত্য বজায় রেখে; কিন্তু ফাইনালের এই বিষাদময় রূপটি ছিল টুর্নামেন্টের শুরুতে আর্জেন্টিনাকে দেওয়া অতিরিক্ত প্রশ্রয়েরই সরাসরি ফলাফল। শেষ দৃশ্যটি স্বাভাবিকভাবেই আগের স্মৃতিগুলোকে মøান করে দেয়, যা এই টুর্নামেন্টকে ২০২২ এবং ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের চেয়ে পিছিয়ে রাখবে ৮০-এর দশকের বা ১৯৯৮ সালের গৌরবোজ্জ্বল বিশ্বকাপগুলোর কথা না হয় বাদই দেওয়া হলো। ইতিহাসই বিচার করবে মধ্যম সারির বিশ্বকাপগুলোর মধ্যে এটি ঠিক কোথায় বসবে ২০১৪ এবং ২০০৬ সালের ওপরে নাকি নিচে। ‘এটি হয়তো ইতিহাসের সেরা ছিল না, তবে ভালো ছিল’ ফিফা হয়তো এমন কথা বলে কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত