এবছর ভারতের লোকসভা বা জাতীয় নির্বাচন। ভোটের আগে বিতর্কিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) নিয়ে ফের আলোচনা তুঙ্গে। ভারতে শুরু হওয়া অন্তর্বর্তী বাজেট অধিবেশনেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কার্যকর করতে চাইছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
২০১৯ সালে আইনে পরিণত হয়েছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ। এই আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ সহ ৬টি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষদের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রদানের আশ্বাস দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। তবে দেশ জুড়ে তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে সিএএ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এরপর বিগত প্রায় ৫ বছর ধরে এই আইনের ধারা এবং নিয়ম বানাতেই চলে গিয়েছে সরকারের। সিএএ কার্যকর হয়নি। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই ফের তুঙ্গে সিএএ আলোচনা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, সোমবার কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর দাবি করেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে সিএএ কার্যকর হতে চলেছে। আসন্ন অন্তর্বর্তী বাজেট অধিবেশনেই বিতর্কিত আইনের ধারায় সংসদীয় অনুমোদন দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে তৎপরতা শুরু করেছে কেন্দ্র। এরপর দ্রুত ‘গেজেট নোটিফিকেশন’ জারি করবে ভারত সরকার। যাতে করে এই আইন বাস্তবায়ন করা যাবে।
সিএএ বিতর্ক
নাগরিকত্ব আইন স্বাধীন ভারতের পুরনো আইন। সেই আইনেই বেশ কিছু সংশোধনী এনেছে বিজেপি সরকার। বলা হয়েছে, বাইরে থেকে আসা ব্যক্তিরা সংশোধিত আইনে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত নাগরিকত্ব পাবেন।
কিন্তু কারা এই সুযোগ পাবেন? সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে আক্রান্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন,তারা নাগরিক হওয়ার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখদের কথা বলা হয়েছে এখানে। এক্ষেত্রে তাদের ভারতে আসার সময় যাচাই করা হবে। শুরুতে নাগরিকত্ব আইনে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ভারতে আসা ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিজেপি এতে সংশোধন করেছে, সেই সংশোধনী অনুযায়ী যে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, শিখরা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে এসেছে তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
কিন্তু আক্রান্ত মুসলিমদের কথা বলা হয়নি। মূল বিতর্কের জায়গাটি এখানেই। কেন মুসলিমদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীদের একটি অংশ। সিএএ-বিরোধী আন্দোলনও শুরু হয়েছিল সে কারণেই।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অবশ্য বলেছেন, এই আইন নাগরিকত্ব দেওয়ার আইন, কেড়ে নেওয়ার নয়। মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর সম্প্রতি জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির মধ্যেই দেশে সিএএ চালু হবে।
শঙ্কায় পশ্চিমবঙ্গের সম্প্রীতি
শান্তনু ঠাকুরের ওই ঘোষণার পরেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উত্তেজনা তীব্রতর হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, সিএএ নিয়ে ভোটের রাজনীতি হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনায় অন্তত দুইটি আসন মতুয়া ভোটের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়াও নদীয়ায় মতুয়া ভোটও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু মতুয়া সম্প্রদায়ের অনেকেই এখনও নাগরিক অধিকার পাননি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্রমশই এই মতুয়া ভোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই ভোটের আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যে এসেই প্রথম সিএএ-এর কথা তুলেছিলেন।
ভোটের আগে মমতাও এর বিরোধিতায় সরব হয়েছেন। কারণ, সিএএ চালু হলে মতুয়ারা বিজেপির পাশে থাকবে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা। ইতিমধ্যেই মতুয়া ভোটের একটি বড় অংশ বিজেপির পক্ষে চলে গেছে।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে এই আইন কার্যকর করা নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেরই শঙ্কা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের রোষানলে পড়বে মুসলিমরা, তাদের বিরুদ্ধে এই আইনের অপপ্রয়োগ হতে পারে। রোহিঙ্গাদের মতো করুন পরিণতি হতে পারে এমন চরম শঙ্কাও তাদের। একই অবস্থা বিরাজ করছে আসাম রাজ্যে। যেখানে বিজেপি দলীয় মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকার ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেনস (এনআরসি) কার্যকর করতে চাইছে। ফলে সেখানে বসবাসরত বিপুল সংখ্যক মুসলমান নাগরিকত্ব হারানোর শঙ্কায় আছে।
