বুধবার (৩১ জানুয়ারি) তোশাখানা দুর্নীতির এক মামলার পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৪ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। রায়ে ইমরান ও বুশরাকে ১০ বছরের জন্য সরকারি পদে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া দুজনের প্রত্যেককে ৭৮৭ মিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি জরিমানা করা হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) রাষ্ট্রীয় গোপন নথি ফাঁসের এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয় দেশটির আদালত।
তবে, পাকিস্তানের ইতিহাসে সাবেক কোনো প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও পাকিস্তানের কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
পাকিস্তানের ইতিহাসে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ও সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের তালিকা এখানে দেওয়া হলো।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী
হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ছিলেন একজন পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালি রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৫৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ছিলেন তিনি। তিনি জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলকে সমর্থন করতে অস্বীকার করলে ১৯৫৯ সালে ইলেক্টিভ বডি ডিসকোয়ালিফিকেশান অর্ডার অনুসারে তাকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অপরাধ দেখিয়ে তাকে ১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার এবং করাচি সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়। তবে ১৯৬২ সালের আগস্টের ১৯ তারিখে তিনি মুক্তি পান।
জুলফিকার আলী ভুট্টো
১৯৭৩ সালের আগস্ট থেকে ১৯৭৭ সালের জুলাই পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন দেশটির নবম প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। তবে অল্পদিনের মধ্যেই এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যূত হন তিনি। ১৯৭৪ সালে একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৭৯ সালে সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে। এবং ওই বছরেই ৪ এপ্রিল তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বেনজির ভুট্টো
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর মেয়ে এবং দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির স্ত্রী বেনজির ভুট্টো। ১৯৮৬ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি কিন্তু ১৯৯০ সালে বেনজির ভুট্টোকে বরখাস্ত করা হয়। পুনরায় ১৯৯৩ সালের নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করেন ও দ্বিতীয়বারের মত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে ১৯৯৬ সালের ৬ নভেম্বর তাকে পুনরায় বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তী ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে তিনি হেরে যান।
১৯৮৫ সালের আগস্টে তিনি তার ভাইয়ের শেষকৃত্যের জন্য পাকিস্তানে ফিরে আসলে তাকে ৯০ দিনের জন্য গৃহবন্দী করে রাখা হয়। এছাড়া ১৯৮৬ স্বাধীনতা দিবসে করাচির এক সমাবেশে সরকারের নিন্দা করায় বেনজির ভুট্টোকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সুইজারল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ১৯৯৯ সালে বেনজির ও তার স্বামী আসিফ আলী জারদারিকে পাঁচ বছরের জেল ও ৮৬ লাখ ডলার জরিমানা করে পাকিস্তানের একটি আদালত।
২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির এক নির্বাচনী সমাবেশ শেষে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন বেনজীর ভুট্টো।
নওয়াজ শরীফ
পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ মিয়া মুহম্মদ নওয়াজ শরীফ তিন বার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। প্রথমবার ১৯৯০-০১৯৯৩ সাল পর্যন্ত, দ্বিতীয় বার ১৯৯৭-১৯৯৯ পর্যন্ত এবং তৃতীয় বার ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দ্বায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০১৮ সালে দুর্নীতির দায়ে নওয়াজ ও তার মেয়ে মরিয়ম নওয়াজকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয় ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো (এনএবি)। ২ মাস পরে আদালত সাজা স্থগিত করলে তিনি মুক্তি পান।
এছাড়া একই বছরে ডিসেম্বরে সৌদি আরবের ইস্পাত মিলে পারিবারিক মালিকানার অভিযোগে নওয়াজ শরীফকে পুনরায় কারাগারে নেওয়া হয় এবং ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের নভেম্বরে তাকে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর চার বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে ২০২৩ সালের অক্টোবরে দেশে ফিরেন তিনি।
শাহবাজ শরীফ
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের ভাই শাহবাজ শরীফ ২০২২ সালে ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তবে ২০২০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর লাহোর হাইকোর্ট মানি লন্ডারিং মামলায় জামিন নাকচ করার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রায় ৭ মাস কারাভোগের লাহোরের কোট লখপাট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
শহীদ খাকান আব্বাসি
পাকিস্তান মুসলিম লীগের শহীদ খাকান আব্বাসি ২০১৭ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রী থাকাকালীন এলএনজি রপ্তানিতে বহু বিলিয়ন রুপির একটি চুক্তিতে দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আদিয়ালা কারাগার থেকে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
এবার তোশাখানা মামলায় ইমরান-বুশরার ১৪ বছর কারাদণ্ড
'সাইফার' মামলায় ইমরান খানের ১০ বছরের কারাদণ্ড