প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া বলেছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পরবর্তী সময়ের জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তুতকরণের লক্ষ্যে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সময়মাফিক সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে তিনি তৈরি পোশাক পণ্যের নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধানের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন।
গতকাল বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত বাজার সুবিধা, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ এবং আরএমজি সেক্টরকে উন্নত করার বিষয়ে চূড়ান্ত খসড়া গবেষণা প্রতিবেদনের বৈধতা শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য এসব কথা বলেন তিনি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাপোর্ট টু সাস্টেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রকল্প (এসএসজিপি) এই কর্মশালার আয়োজন করে।
মুখ্য সচিব বলেন, তৈরি পোশাক পণ্যের মধ্যেই বহুমুখীকরণের অনেক সুযোগ রয়েছে। পোশাক শিল্পের মালিকদের এক্ষেত্রে আরও অধিকতর মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। রপ্তানির ৮৫ শতাংশের অংশীদারত্ব থাকা তৈরি পোশাক খাতের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে বিদ্যমান মানবসম্পদের ঘাটতি পূরণ করতে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ইআরডি সচিব মো. শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকন। কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ও এসএসজিপি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ফরিদ আজিজ।
তপন কান্তি ঘোষ বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পরবর্তী সময়ের জন্য রপ্তানিকারকদের প্রস্তুত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে নগদ ভর্তুকি সুবিধার বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। ইআরডি সচিব মো. শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেসরকারি খাতকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে।
বিটিএমইএর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, ফাইবার বা তন্তু আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকরা মাল্টি ফাইবারসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকের বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন।
কর্মশালায় উল্লিখিত গবেষণাকর্ম দুটির প্রধান প্রধান দিকগুলো আলোকপাত করে দুটি পৃথক উপস্থাপনা করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। ‘আরএমজি সেক্টরকে উন্নত করার বিষয়ে অধ্যয়ন’ এবং বাজার সুবিধা এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও বিশ্ববাজারে তুলাজাত পোশাকের তুলনায় ম্যান মেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে কৃত্রিম তন্তুর তুলনায় তুলাজাত পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির হার অপেক্ষাকৃত বেশি।
বাজার সুবিধা এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি ২০২৩-এর দ্রুত এবং কার্যকর বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তন্তু নিরাপত্তা নীতিমালা প্রণয়ন, সব ধরনের ফাইবার বা তন্তু আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান, এবং ম্যান মেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুর ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য একটি পৃথক বিনিয়োগ তহবিল গঠন ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে ড. রাজ্জাক বলেন, আসন্ন সময়ে বাংলাদেশকে একদিকে যেমন তুলাজাত পোশাকের বাজারে তার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে হবে, সেই সঙ্গে কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্মশালায় প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইআরডির সাাবেক সচিব ও এসএসজিপি প্রকল্পের প্রকল্প উপদেষ্টা শরিফা খান। তিনি তার বক্তব্যে স্থানীয় উৎপাদকদের বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ এবং স্থানীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান এ.এইচ.এম. আহসান বলেন, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করতে হলে স্থানীয় রপ্তানিকারকদের গবেষণা, মানোন্নয়ন, বাজারজাতকরণ ও প্রচারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ বা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়াকে মসৃণ ও টেকসই করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তারই অংশ হিসেবে উত্তরণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির দিকনির্দেশনায় এবং ইআরডি-এর এসএসজিপি প্রকল্পের সহযোগিতায় উত্তরণের সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা এবং তদনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন খাতভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সেই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে এসএসজিপি প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে গবেষণা প্রতিবেদন দুটি তৈরি করা হয়েছে। উক্ত গবেষণা প্রতিবেদনগুলোর প্রধান প্রধান দিকসমূহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের কাছে তুলে ধরা এবং তা প্রয়োজনীয় পর্যালোচনাপূর্বক প্রতিবেদনটি চূড়ান্তকরণের উদ্দেশ্যে কর্মশালাটি আয়োজন করা হয়।
