রাখাইনে গোলাগুলি চলছেই, সীমান্তে অপেক্ষায় রোহিঙ্গা

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৪:০২ এএম

মিয়ানমারে সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থান তৃতীয় বছরে পড়েছে গতকাল। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডিকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে মিন অং হ্লাইং নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনী। গ্রেপ্তার করা হয় সু চি ও তার দলের সিনিয়র নেতাদের। তবে শুরু থেকেই জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে থাকে গণতন্ত্রপন্থিরা। জান্তাবাহিনীও তাদের বিরুদ্ধে শুরু করে দমন-পীড়ন। অবশ্য তাতে দমে যায়নি বিদ্রোহী গ্রুপগুলো। উল্টো বিভিন্ন রাজ্য ও এলাকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো হয় জোটবদ্ধ। ধীরে ধীরে তাদের হামলার চাপে পড়তে শুরু করে জান্তা সরকার।

বিশেষ করে গত কয়েক মাসের মধ্যে একাধিক রাজ্য ও এলাকা হাতছাড়া হয়। বাড়তে থাকে বিদ্রোহীদের তৎপরতা। এর মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে দেশটির বাংলাদেশ লাগোয়া রাখাইন রাজ্যের আরাকান আর্মি। সেখানে কয়েক দিন ধরেই দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। নতুন করে নিহত হয়েছে রোহিঙ্গারা। জ¦ালিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ঘরবাড়ি। জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারা আবারও দেশ ছাড়তে শুরু করেছে। সাগর পার হয়ে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার দিকে। অবশ্য সীমান্তে কড়া পাহারা থাকায় এ দফায় তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে বড় আকারের ঢল শুরু হলে তাদের সামলানো যাবে কি না সেটা নিয়ে রয়েছে সংশয়।

গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সংঘাতের ভয়ে কাঠের ট্রলারে করে সাগর পাড়ি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া পৌঁছান ১৩০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী। আগতদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। গতকাল তারা দেশটির আচেহ প্রদেশের উপকূলে পৌঁছায়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, গত বছরের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে প্রায় দুই হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থী ইন্দোনেশিয়ায় গিয়েছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, প্রতিবছর নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে যখন সাগর শান্ত থাকে, তখন মিয়ানমারের নির্যাতিত সংখ্যালঘু মুসলিমরা কাঠের নৌকায় করে প্রতিবেশী থাইল্যান্ড এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

রয়টার্স বলছে, মিয়ানমারের নির্যাতিত ধর্মীয় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা উপকূলে অবতরণ করার সময় আচেহ উপকূলের স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রবল বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এমনকি গত বছরের শেষ দিকে রোহিঙ্গাবাহী একটি ট্রলার তীরে ভিড়তে না পারায় খাবার-পানির অভাবে বেশ কয়েকজন প্রাণ হারায়।

কয়েক বছর ধরেই রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছেড়ে যাচ্ছে। নিজেদের দেশেই তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং তাদের সাধারণত মিয়ানমারে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নাগরিকত্ব হারানোর পাশাপাশি মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা জাতিগত নিধনের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর অভিযানের পর দেশটি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। নতুন সংঘাতে সে সংখ্যা আবার বাড়ার আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ।

ইতিমধ্যে ঘুমধুম, তমব্রু, উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তে কয়েকশ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার ঘুমধুম বাইশফাঁড়ি বিওপির বিশেষ টহল দল অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে মিয়ানমারের উপজাতি নাগরিক এক নারীসহ ২ সন্তানকে আটকের ২ ঘণ্টা পর পুশব্যাক করা হয়েছে। ৩৪ বিজিবির অধীনে সীমান্ত ৩৭ নম্বর পিলার এলাকা থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মগপাড়া সেতুসংলগ্ন এলাকা থেকে তাকে আটক করে বিজিবি।

তমব্রু খোনারপাড়া এলাকার বাসিন্দারা জানান, মিয়ানমারের মংডু ও বলিবাজার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের সীমানার কাছাকাছি অবস্থান করছে রোহিঙ্গারা। আবার কিছু রোহিঙ্গা ডিঙি নৌকা করে নাফ নদীতে অবস্থান করছে। মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) রোহিঙ্গাদের কোনো বাধা দিচ্ছে না। এতে বাংলাদেশ সীমান্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে মিয়ানমারে আবারও উত্তেজনা শুরু হয়েছে। প্রতিদিন গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে সীমান্তের কাছাকাছি বসবাস করা মানুষরা। মিয়ানমারে উত্তেজনা শুরু হলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিয়ে শঙ্কা থাকে। শুনেছি কিছু রোহিঙ্গা সীমান্তের কাছাকাছি আছে। বিষয়টি আমরা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে অবগত করেছি।’

৩৪ বিজিবির অধিনায়ক জোন কমান্ডার লে. কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে বিজিবি। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একজন রোহিঙ্গাকেও প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আমরা সব সময় সজাগ আছি।’

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, সীমান্তের কাছাকাছি মিয়ানমারের ওপারে গোলাগুলি হচ্ছে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরের ঘটনা। রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ নিয়ে বিজিবি সতর্ক করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত