টঙ্গীর তুরাগ তীরে চলছে বিশ্ব ইজতেমা। আমাগীকাল আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে শুরায়ি নেজামের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত ইজতেমা। ইজতেমার ময়দান ছাপিয়ে লাখ লাখ মুসল্লির ঢল নেমেছে টঙ্গী, গাজীপুর ও উত্তরায়। লোকারণ্য বিশ্ব ইজতেমার ময়দান। রাস্তা-ঘাটেও ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি। এ যেন জান্নাতের পুষ্প বাগিচা। ঝাঁকে ঝাঁকে ফুলকলি ফুটেছে। এক আনন্দমুখর বৈচিত্র্যময় দৃশ্য।
বাংলাদেশ আমাদের অহংকার। এ দেশের মাটি আমাদের ঘাঁটি। এ দেশের ভাষা আমাদের প্রাণ। এ দেশের প্রকৃতি আমাদের প্রেম। ঠিক তেমনি এ দেশের বিশ্ব ইজতেমা আমাদের গৌরব। যাকে ঘিরে আমাদের অন্যন্য আয়োজন। লাখও লাখ মানুষের আগমন। বিশ্বব্যাপী মহাসম্মেলন। যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সর্বত্র। যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ মুসলিম মহাসমাবেশ হিসেবে পরিচিত। যেখানে উপস্থিত হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার বিদেশি মেহমান। যাদের পদধূলিতে ধন্য বাংলার ভূমি। যাদের অতিথি পরায়ণতায় পুলকিত তাবলিগ জামাত। এত গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য যেই স্বাধীন ভূমির, নিশ্চয়ই এ সৌন্দর্য আমাদের গৌরবের কারণ।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে ২২ কিলোমিটার উত্তরে শিল্পনগরী টঙ্গীর কিংবদন্তি ও ইতিহাস খ্যাত ‘কহর দরিয়া’ বর্তমান তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ইজতেমা। যা আমাদের গৌরব ও অহংকার। এ ইতিহাস ও গৌরব আজকের নয়। ১৯৪৬ সালে সর্বপ্রথম বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের বার্ষিক মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিভিন্ন জায়গায় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে তাবলিগের প্রচার-প্রচারণা দিন দিন প্রসারিত হতে থাকে। বাড়তে থাকে তাবলিগের সাথি ও শুভাকাক্সক্ষীদের সংখ্যা। বর্তমানে তার পরিধি আকাশচুম্বী। এ কারণে বৃহৎ জায়গা নিয়ে ১৯৬৬ সালে টঙ্গী খোলা মাঠে ইজতেমা আয়োজন করা হয়। ওই বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাবলিগের এ ইজতেমায় ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও তাবলিগের সাথিরা অংশগ্রহণ করে। আর ওই বছর থেকেই এ ইজতেমাকে বিশ্ব ইজতেমা হিসেবে আখ্যায়িত হয়।
তাবলিগ। দাওয়াতের কাজ। চিল্লা, সাল কিংবা তিন দিন। এগুলো কোনো একক গোষ্ঠীর কাজ নয়। এ তো সব নবীদের কাজ। দাওয়াতের বাণী নিয়ে উম্মাহর সংশোধনের আশায় নবীদের দাওয়াতের প্রতিধ্বনি। আমাদের মধ্যে নবী নেই। তাই নবীর ওয়ারিসরাই এ কাজ আঞ্জাম দেবে। ওটাই স্বাভাবিক। এটাই রবের আদেশ। এমনকি ইতিহাস তাই বলে।
এ ইজতেমা ঘিরে যিনি মধ্যমণি, দারুল উলুম দেওবন্দের এক আলোকিত রুহানি পুরুষ, প্রিয় নবীর সার্থক উত্তরসূরি মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)। যার সুচিন্তিত ও প্রবর্তিত এই মেহনতের আলো জ্বলছে পৃথিবীর সর্বত্র। এতে জাতির ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ নিহিত। এ দ্বীনি আন্দোল চলছে, চলবেই। যতদিন মানুষ কল্যাণ ও মুক্তি কামনা করবে।
ধারাবাহিকতার ৫৭ বছরে বিশ্ব ইজতেমায় বসেছে দেশি-বিদেশি মেহমান ও সাধারণ মানুষের মিলনমেলা। হয়েছে ধনী, গরিব, আশরাফ, আতরাফ, আমির, ফকির, ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আলেম-উলামাসহ সর্ব স্তরের মানুষের উপস্থিতি। এ যেন বর্তমান অশান্ত বিশ্বের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও প্রতিহিংসার অনলে সৌহার্দ্য। ভ্রাতৃত্ব, প্রেম-প্রীতি ও মায়া মমতার এক অতুলনীয় তীর্থস্থান। নজিরবিহীন ভালোবাসা ও নিজেকে মিটিয়ে দেওয়ার মানসিকতা অর্জনের কেন্দ্রস্থল। এ যেন এক জীবন বদলে দেওয়ার বিপ্লবী পথ। নীরব বিপ্লব, মানুষ গড়ার বিপ্লব, জীবন গঠন করার বিপ্লব, দেশে-বিদেশে সর্বত্র চলছে এই বিপ্লব। কোথাও কোনো বাধা নেই। নেই কোনো প্রতিপক্ষ এই বিপ্লবের।
