শিক্ষকরা কেন সুদের ফাঁদে?

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:৫৪ পিএম

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ ও এমবিএ সম্পন্ন করেন বগুড়ার মেহেদী হাসান (ছদ্মনাম)। ৩ বছর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরীর পরীক্ষা দেওয়ার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে তার চাকরী হয়। শিক্ষকতা করলেও তার জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসেনি। নানা সমস্যায় মাস কাটাতে হয় তাকে। বিভিন্ন প্রয়োজনে ধার দেনা করতে হয়, এমনকি মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণও করতে হয় মেহেদীকে।

আজ বুধবার সন্ধ্যায় ফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতি মাসে সর্বসাকূল্যে ১৭,৫০০ টাকা বেতন পাই। এই টাকা থেকে আব্বা-আম্মার ওষুধে মাসে খরচ হয় ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা, রান্নার কাজে ব্যবহৃত সিলিন্ডার গ্যাস ১৮০০-২২০০ টাকা, বিদুৎ বিল ১ হাজার টাকা, একমাত্র মেয়ের দুধ ও খাবার কিনতে ১২-১৫শ টাকা, চাল ৩০০০ হাজার টাকা, সবজি ও মুদি দোকানে (রান্নার মশলা, তেল, সাবান ও প্রসাধনী) ৪০০০ হাজার টাকা খরচ হয়, বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার ফলে মোটরসাইকেলের জ্বালানি খরচ ২৫০০-২৯০০ টাকা। এতেই তার মাসে খরচ হয়ে যায় ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা। মাছ মাংসের খরচ এই তালিকায় ধরা হয়নি।

তিনি বলেন, এরমধ্যে গত জুলাইয়ে আমার মেয়ের জন্মের সময় স্ত্রীর জটিলতা দেখা দেয়। এতে চিকিৎসার পেছনে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। হাতে নগদ কোনো টাকা না থাকায় মহাজনের কাছ থেকে সুদ নিতে বাধ্য হই। সুদের পেছনে আমার মাসে খরচ হত ১৫ হাজার টাকা। এক পর্যায়ে সেই ঋণের জাল থেকে বাঁচতে জমি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হই।

এদিকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় বিভিন্ন মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সুদের টাকার চাপ সামলাতে না পেরে নিখোঁজ হয়েছেন সমর কান্তি রায় ও তৃপ্তি রানী নামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক দম্পতি। এই ঘটনার আগে গত বছরের জুনে কোটালীপাড়া উপজেলার কান্দি ইউপির ১২৭ নম্বর গজালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক দম্পতি। ধারণা করা হচ্ছে এই দুই যুগল দম্পতি সুদের দেনা পরিশোধ করতে না পেরে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের এই ঘটনার সূত্র ধরে দেশ রূপান্তর থেকে যোগাযোগ করা হয় প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এমপিওভুক্ত বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে। এই শিক্ষকদের একটা সাধারণ চিত্র হচ্ছে, যে বেতন পান তা দিয়ে সংসার চলে না। মাস শেষে ধার দেনা করতে হয়।

বাজার দর বেড়ে যাওয়া ও জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে তারা বাধ্য হয়ে টিউশনি পড়াচ্ছেন কিংবা পার্ট টাইম জবের চেষ্টা করছেন। শিক্ষকরা আকস্মিক বিপদ সামাল দিতে বিভিন্ন এনজিও কিংবা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্যাংক থেকে তারা সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছেন না। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেলায় তা নেই।

ফলে এই শিক্ষকরা জড়িয়ে পড়ছেন স্থানীয় কারবারিদের সুদের জালে। ফাঁদে ও বিপদে পড়ে সুদের জালে আটকা পড়ে অনেকেই চড়া মাশুল গুনতে হচ্ছেন।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার স্কুল শিক্ষক নাজমা বেগম। গত বছর জমি বিক্রি করে তার ছেলেকে ইতালি পাঠান। ইতালি যাওয়ার পথে তার ছেলে লিবিয়ায় দালালদের হাতে ধরা পড়ে। এতে তাকে আরও ৪ লাখ টাকা দিতে হয়। উপায়ন্তর না পেয়ে তিনি সেই টাকা স্থানীয় সুদের কারবারি রেণুর কাছ থেকে সুদ নেন। এই সুদের টাকা দিতে গিয়ে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার একটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারুক মিয়া। প্রতিমাসে তিনি বেতন পান ১৪ হাজার ৬০০টাকা। তার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তিনি বলেন, প্রতি মাসে যে বেতন পাই তা দিয়ে সংসার খরচ চালানো কোনোভাবেই সম্ভব হয় না। আগে সকাল-বিকেল ২টা ব্যাচ পড়াতাম। এখন সন্ধ্যায় বাসায় গিয়ে আরও ২টা স্টুডেন্টকে পড়াই। প্রতি মাসেই সংসার খরচ কমানো নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয়। যে মাসে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান থাকে তা হয়ে উঠে যন্ত্রণার। সবকিছু থেকে দূরে রাখতে হয়। অসুখ বিসুখ কিংবা যেকোনো বিপদে বাজারের এক কারবারির কাছ থেকে সুদ নিতে হয়।

দেশে সাড়ে ৩ লাখের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রয়েছেন। পাশাপাশি এমপিওভুক্ত স্কুল ও মাদরাসার শিক্ষক রয়েছেন আরও কয়েক লাখ। এসব শিক্ষকদের সংসার খরচ সামলাতেই হীমশিম খেতে হয়। আকস্মিক যেকোনো বিপদ সামলাতে তাদের আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে ধার দেনা করতে হয়। যাদের সেই সুযোগ নেই তারা সুদ নেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত