আধুনিক সময়ে যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই হচ্ছে এমন নয়, যুদ্ধগুলো হচ্ছে নানামুখী, নানা পর্যায়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে একে অপরের বিরুদ্ধে ছোড়া হচ্ছে বুলেট-ড্রোন-মিসাইল। আর বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোতে একে অন্যের বিরুদ্ধে ছড়ানো হচ্ছে বানোয়াট তথ্য কিংবা চলছে তথ্যের বিকৃত উপস্থাপন। বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে জনমত-বিশ্বমতকে প্রভাবিত করতে চালানো হচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা বা প্রপাগান্ডা। আদর্শিক-স্বার্থের যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারণে বিশ্ববাসীর মনকে প্রভাবিত করতে গণমাধ্যমে শুরু হয় প্রপাগান্ডার পদচারণা।
প্রাতিষ্ঠানিভাবে গণমাধ্যম আশ্রিত প্রপাগান্ডার পথচলা শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে, মার্কিনিদের হাত ধরে। এই যুদ্ধে জড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের দরকার ছিল জনমতকে প্রভাবিত করা। এজন্য সুপরিকল্পতভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালায় মার্কিন সরকার। অলাভজনক অনলাইন লাইব্রেরি জেসটিওআর-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন সবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়াচ্ছে, তৎকালীন মার্কিন সরকার যুদ্ধের পক্ষে জনমত প্রভাবিত করতে আধুনিক সময়ে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের প্রপাগান্ডা দপ্তর চালু করে, যার নাম কমিটি অন পাবলিক ইনফরমেশন (সিপিআই)।
১৯১৬ সালে পুনর্মেয়াদে নির্বাচনে লড়তে চাওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন শুরুতে ইউরোপে চলা যুদ্ধে জড়াতে চাননি। কিন্তু নির্বাচনে জিতেই বদলে যায় তার অবস্থা। নির্বাচিত হওয়ার পর পরই জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধ মার্কিন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে সিপিআইকে ব্যাপক অর্থায়ন করে উইলসন প্রশাসন। শুরুতে গণমাধ্যম, গণযোগাযোগ এবং বক্তব্য-বিবৃতিতে সেন্সরের ছুরিকাঁচি ধার দেওয়া শুরু করে সিপিআই। তবে এরপর সিপিআই শুরু করে যুদ্ধের পক্ষে মার্কিন যুক্তির প্রচারণা। জার্মান সেনাদের ব্যঙ্গ করতে বানানো হয় কার্টুন ‘দ্য হান’। এসব প্রপাগান্ডা চালাতে শিল্পী, চলচ্চিত্রকার, সাংবাদিক, গল্পকার এবং সৃজনশীল ঘরানার লোকদের নিয়োগ দেয় সিপিআই। আধুনিক সময়েও মার্কিনিদের সিপিআই ধারা চলমান রয়েছে। কেবল সময়বেঁধে প্রপাগান্ডার ধরন বদলেছে, আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে চলছে বিশ্বজনতার মগজ ধোলাই। এরই ধারাবাহিকতায় এই সময়ে সংঘটিত ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ থেকে শুরু করে ফিলিস্তিনের গাজায় মানবতাকে সংকটে ফেলা আগ্রাসনে রমরমা প্রপাগা-া দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের ক্ষমতামেরুর মতো বিশ্বসংবাদমাধ্যমগুলোও দুই মেরুতে বিভক্ত। বিবিসি, সিএনএন, ফক্স নিউজের মতো পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম তাদের মতো করে যুদ্ধপরিস্থিতি তুলে ধরছে। আবার আরটি, স্পুটনিক, আলজাজিরা, আনাদোলু এজেন্সি একই খবর অন্যভাবে প্রকাশ করছে। এই দুই মেরুর সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন পড়ে এখন সত্যাসত্য নির্ণয়ের গুরুদায়িত্ব নিতে হচ্ছে পাঠক-দর্শকদেরই। বিবিসি, সিএনএন ইরাক-আফগানিস্তান যুদ্ধে তাদের ভূমিকার জন্য নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা আগেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। সেসব পুরনো কথা, ২০২২ সালে শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু গাজা যুদ্ধেও এই সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে স্পষ্ট একপাক্ষিক প্রবণতা সচেতন বিশ্ববাসীর নজর এড়ানোর কথা নয়।
গাজা যুদ্ধে সত্যের মৃত্যু : বিশ্বে সর্বশেষ বড় যুদ্ধ এখন চলছে গাজায়, এই যুদ্ধে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিবিসি, গার্ডিয়ানের মতো ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম পশ্চিমাঘেঁষা হলেও গাজা যুদ্ধ নিয়ে তাদের প্রতিবেদনে সুস্পষ্ট পশ্চিমা পক্ষপাত ধরা যায়নি।
কিন্তু মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন যেভাবে গাজা যুদ্ধের সংবাদ প্রচার করছে তাতে বিশ্বজুড়ে এই সংবাদমাধ্যমটির বস্তুনিষ্ঠতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলে হামাসের রকেট হামলায় সিএনএন সাংবাদিকের আতঙ্ক ছড়ানো ভিডিও, গাজার আল-শিফা হাসপাতালে কথিত হামাসের সুড়ঙ্গ দেখিয়ে করা প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে সমালোচিত, নিন্দিত হয়েছে। সিএনএন যে বিশ্বের সচেতন অডিয়েন্সের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে তা দেখা যাবে সংবাদমাধ্যমটির সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আসা অসংখ্য কমেন্টসে। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের খবর অপেক্ষাকৃত বেশি প্রকাশ করছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা। সিএনএন ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে গিয়ে বিশ্ববাসীকে আল-শিফার কথিত সুড়ঙ্গ দেখিয়েছিল। কিন্তু আলজাজিরার কাছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মুনির এল-বুরশ একে ‘ডাহা মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। হামাস এক বিবৃতিতে জানায়, ‘আল-শিফাকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার পেন্টাগন ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি নির্লজ্জ মিথ্যার পুনরাবৃত্তি, যা দখলদার সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের দুর্বল ও হাস্যকর প্রচার দ্বারা প্রদর্শিত হয়েছে।’ আলজাজিরার আরেকটি প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪-এর একটি বানোয়াট খবরকে সামনে আনা হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমটি এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিল হামাসের হামলায় ইসরায়েলি শিশুদের শিরেদ করা লাশ তারা দেখেছে। বিশ্ববাসীর কাছে হামাসের নৃশংসতা তুলে ধরতে গিয়ে এই শিশুহত্যার রোমহর্ষক প্রতিবেদনটিকে সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে পরদিনই হোয়াইট হাউজ জানায়, ওই প্রতিবেদনের সত্যতা পাওয়া যায়নি। বাইডেনের বক্তব্য থেকে এভাবেই পিছু হটে তারা। গাজা যুদ্ধ নিয়ে বানোয়াট সংবাদ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার মাত্রা তুলে ধরেছে তুর্কি বার্তাসংস্থা আনাদোলু। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আনাদোলু জানায়, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালানোর সঙ্গে মিথ্যা তথ্যের ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে।
তুরস্কের কমিউনিকেশন ডিরেক্টোরেটের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল ১০০টিরও বেশি ভুয়া খবর প্রকাশ করেছে। তুর্কির কমিউনিকেশন ডিরেক্টর ফাহরেতিন আলতুন বলেন, ‘৭ অক্টোবর থেকে আমরা গাজা যুদ্ধ নিয়ে শতাধিক বানোয়াট সংবাদ প্রতিবেদন চিহ্নিত করেছি। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিশ্ববাসীর কাছে প্রকৃত সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি, আসলে মিথ্যা খবর প্রকাশের পর দ্রুততম সময়ে সত্য খবরটি প্রকাশ করতে হয়, নাহলে ওই মিথ্যা তথ্য সত্যকে চাপা দিয়ে দেয়।’
সত্যের সংকট সবচেয়ে বেশি সামাজিক মাধ্যমে : সামাজিক মাধ্যমের এই সময়ে মূলধারার মিডিয়ার খবর গোগ্রাসে গেলার মতো দিন আর নেই। কিন্তু মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোই যখন পক্ষপাতদুষ্ট তখন সামাজিক মাধ্যমের মতো উন্মুক্ত মাধ্যম কীভাবে প্রপাগান্ডামুক্ত থাকবে! ইউক্রেন, গাজা যুদ্ধে অপপ্রচার, মিথ্যা-বানোয়াট খবরের আশ্রয় হয়ে উঠেছে সামাজিক মাধ্যমগুলো। গাজা আগ্রাসন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বানোয়াট খবর, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার কথা ওয়াশিংটন পোস্টের মতো পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমেও উঠে এসেছে। তবে এবার ভুক্তভোগী ইসরায়েল স্বয়ং! ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইসরায়েলিদের হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা ছড়ানো হয়, তাতে হিব্রু ভাষায় এক নারী বলেন, ‘ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে যাচ্ছে, আপনারা (ইসরায়েলিরা) অন্তত এক সপ্তাহ খাবার, পানি, ইন্টারনেট পাবেন না।’ ব্যস এই বার্তায় ইসরায়েলিরা ভিড় জমায় বাজারে, শুরু করে খাবার মজুদ করা। আরেকটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় নিজেকে সেনাসদস্য দাবি করা এক ইসরায়েলি বলেন, ‘খবর পেয়েছি আরবরা এক হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত আক্রমণের পরিকল্পনা করেছে।’ ফিলিস্তিনি থিংকট্যাংক আল-শাবাকার বিশ্লেষক মারওয়া ফাতাফতা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘যাচাই ছাড়াই বহু তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, আরও সহিংসতা ও অমানবিক কাজের উসকানি দেওয়া হচ্ছে, এসবের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান নিধনযজ্ঞের আগুনে ঘি ঢালা হচ্ছে।’
ইউক্রেন যুদ্ধে সত্যের ‘ইউটার্ন’ : ইউক্রেনের বাখমুত রাশিয়ার দখলে যখন যাচ্ছিল তখন দেখা গেছে বিবিসি, সিএনএন প্রচার চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী দখল ধরে রেখেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্য পাচ্ছে। কিন্তু শেষ অবধি এসব খবর যে অতিরঞ্জিত তা বাখমুত রুশ দখলে যাওয়াতেই প্রমাণিত হয়েছে। সম্প্রতি ইউক্রেন সীমান্তে রাশিয়ার বেলগোরোদ অঞ্চলে একটি রুশ সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। এতে উড়োজাহাজে থাকা ৭৪ যাত্রীর সবাই নিহত হন। রাশিয়া জানায়, উড়োজাহাজটি ৬৫ ইউক্রেনীয় যুদ্ধবন্দিকে নিয়ে বেলগোরোদে যাচ্ছিল, এতে ৬ রুশ ক্রু ও ৩ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিলেন। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা দপ্তরের ধারণা উড়োজাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট অথবা জার্মানির আইরিস ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ভূপাতিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রুশ উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম ইউক্রেনস্কা প্রাভদার ওয়েবসাইটে এক সেনা দাবি করেন, ‘উড়োজাহাজ ভূপাতিত করাটা আমাদের কাজ ছিল’। যদিও এর কিছুক্ষণ পরেই এই প্রতিবেদন গায়েব হয়ে যায়। ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যমগুলোতে দাবি করা হতে থাকে, ওই রুশ উড়োজাহাজে এস-৩০০ মিসাইল বহন করা হচ্ছিল। এরপর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন ‘রাশিয়া ইউক্রেনীয় বন্দিদের জীবন নিয়ে খেলছে।’ তথ্যের এমন গরমিল দেখা যাচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই। পশ্চিমা মিডিয়ায় কেবল রুশ সেনাদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির খবর আসছে, অন্যদিকে ইউক্রেনের কত সংখ্যক সেনা নিহত তা স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়নি। আবার প্রপাগান্ডা প্রচারের অভিযোগ রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক, আরটি’র সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেছে অনেক পশ্চিমা দেশে।
শুধু যুদ্ধ নয়, ভূ-রাজনীতিতে চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব, ভারত-চীন দ্বন্দ্ব, উত্তর বনাম দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বন্দ্বে ব্যাপক মাত্রার প্রপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলোতে। চীনের মালিকানাধীন টিকটক ব্যাপক তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে এই খবর এখন নিয়মিত প্রকাশ পাচ্ছে। অন্যদিকে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার প্রতিদিনকার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা-হুমকি ইত্যাদি নিয়মিত প্রচার করে ‘অসতর্কভাবে’ কিম জং উনের প্রপাগান্ডাতেই হয়তো হাওয়া দিচ্ছে পশ্চিমা মিডিয়া!
লেখক: সাংবাদিক
