বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টির কারণ

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:৫৬ এএম

তিক্ত হলেও এটা সত্য যে, মুসলমানদের পরস্পরে বিভেদ ও বিদ্বেষ গোপনীয় কিছু নয়। আল্লাহ না করুন, এ বিভেদ যুদ্ধের রূপ নিলে এবং মুসলমানরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়লে কোরআন মাজিদ আমাদের বলে, রং ও বর্ণ, দেশ ও জাতীয়তা এবং গোত্র ও আত্মীয়তার সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা করা, এদের মধ্যে হক ও সত্যের পথে কে আছে; আর কে সীমালঙ্ঘন করছে। যে পক্ষ সীমালঙ্ঘন করবে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা আবশ্যক। এবং সীমালঙ্ঘন ছেড়ে আল্লাহর হুকুম মেনে না নেওয়া পর্যন্ত তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সন্ধি করতে কোরআন মাজিদে স্পষ্ট নিষেধ করা হয়েছে।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মুসলিমদের দুটি দল আত্মকলহে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিয়ো। অতঃপর তাদের একটি দল যদি অন্য দলের ওপর বাড়াবাড়ি করে তবে যে দল বাড়াবাড়ি করছে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না সে আল্লাহর হুকুমের দিকে ফিরে আসে। সুতরাং যদি ফিরে আসে তবে তাদের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে মীমাংসা করে দিয়ো। এবং (প্রতিটি বিষয়ে) ইনসাফ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালোবাসেন।’ -সুরা হুজুরাত : ৯

অভিশপ্ত শয়তান যে সব কূটকৌশল ব্যবহার করে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে পবিত্র কোরআনে সেগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো-

প্রথম : মুসলমানদের মনে পরোপকারিতা, অন্যের কল্যাণকামিতা ও মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের চেতনা দুর্বল হয়ে পড়া এবং আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদের অন্যতম কারণ। ইসলামের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা হৃদয়ে না থাকলে মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ ও ইসলামি ঐক্যের গুরুত্ব মনে না থাকাই স্বাভাবিক। তখন বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়াকে আর দোষের কিছু মনে হয় না।

দ্বিতীয় : মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে দুর্বল ও নিস্তেজ করে দেওয়ার দ্বিতীয় মৌলিক মাধ্যম হলো এক মুসলমান অপর মুসলমানের প্রতি কুধারণা পোষণ করা। পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে কুধারণা থেকে বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে এবং অমূলক ধারণাকে গোনাহ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা কুধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কুধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা।’ -সহিহ বোখারি : ৫১৪৩

তৃতীয় : কুধারণা থেকে গিবত ও অপবাদের মতো বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি জন্ম নেয়। কারও প্রতি কুধারণা সৃষ্টি হলে মনের ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দোষগুলো মনের আনন্দে বর্ণনা করার একটা পঙ্কিল ধারা তখন শুরু হয়ে যায়। কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষত্রুটি আলোচনা করাকে গিবত বলা হয়। কোরআন মাজিদের দৃষ্টিতে গিবত মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার নামান্তর। গিবত এত সূক্ষ্ম গোনাহ যে, কোনো কোনো পরহেজগার ব্যক্তিও এ গোনাহে জড়িয়ে পড়ে। তখন এটা গোনাহ হওয়ার বিষয় তাদের মনে জাগ্রত থাকে না। কারণ অন্যের দোষ বর্ণনা করার মধ্যে মন এক ধরনের মিথ্যা আনন্দ খুঁজে পায়। তাই মধু মনে করে এ বিষপান করতে থাকে।

চতুর্থ : চতুর্থ বিষয় ভুল ও মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা। কারও প্রতি ঘৃণা জন্মালে অনেক সময় তা শুধু গিবতের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তখন অলীক সব কল্পকাহিনি বানিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সত্য-মিথ্যা কথা প্রচার করা হয়। কখনো তো মূল ব্যাপারটি একরকম থাকে তবে এর সঙ্গে নিজ থেকে বিভিন্ন কথা জড়িয়ে রঙ লাগিয়ে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ দেওয়া হয়। বাস্তবতা তখন পুরোপুরি বদলে যায়। অনেক কবিরা গোনাহের সমন্বয়ে এ পরিবর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, মুসলমানকে লাঞ্ছিত করা, মনে কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি কবিরা গোনাহের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তাই কারও ব্যাপারে কোনো কিছু শুনলে যাচাই-বাছাই ছাড়া তা বিশ্বাস করা এবং সত্য মনে করে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য কোরআনে আদেশ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে এমন অবাস্তব সংবাদদাতাদের ফাসেক আখ্যায়িত করে তাদের অবিশ্বাসযোগ্য ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

একে অন্যের বিরুদ্ধে যখন এমন ভুল ও মিথ্যা সংবাদ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে থাকে তখন পরস্পরের মধ্যে শত্রুতার আগুন জ্বলে ওঠে। ফলে মুসলমানদের যে সময় ও শক্তি কাফেরদের মোকাবিলায় ব্যয় হওয়া উচিত ছিল তা নিজেদের কোন্দল ও রেষারেষির মধ্যেই ব্যয় হয়ে যায়। প্রত্যেকেই অন্যকে দোষী প্রমাণিত করে খাটো করে দেখানোর জন্য নিজের সমস্ত মেধা ও প্রতিভা খরচ করে। এভাবে মুসলমানদের সময় ও শক্তি, যোগ্যতা ও প্রতিভা এবং ধন-সম্পদ নিজেদের মাথা ফাটাফাটিতে শেষ হয়ে যায়। আর ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে থাকে। কারণ, এ অবস্থায় মুসলমানরা নিজ শত্রুদের প্রতি দৃষ্টি দিতে পারবে না। আফসোস! বর্তমানে পুরো মুসলিম সমাজ এ ভয়াবহ শাস্তির আগুনেই জ্বলছে।

মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি এবং লড়াই ও ঝগড়া বাধানোর জন্য শয়তানের আবিষ্কৃত কিছু কিছু উপায় এমন, যা কেউ খারাপ চোখে দেখে না। এ বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টির জন্য শয়তান কখনো ধর্মের পথ বেছে নেয় এবং কিছু চিন্তা-বিভ্রান্তি লোকের মাথায় নিত্যনতুন ধারণা প্রসব করতে থাকে। কখনো রাজনীতির অঙ্গন বেছে নেয় এবং মুসলমানদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে রাজনৈতিক দাঙ্গা-হাঙ্গামার আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কখনো আঞ্চলিক ভালোবাসা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের মূর্তি নির্মাণ করে কিছু ‘সামেরিকে’ তার পূজায় লাগিয়ে দেয়, যারা মুসলিম ভ্রাতৃত্বের সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে মুসলিম উম্মাহকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কখনো শ্রেণিগত বৈষম্য উসকে দিয়ে  রক্তপাত ঘটাতে এবং সমাজ ও পরিবেশকে রণক্ষেত্রে পরিণত করতে উদ্বুদ্ধ করে। এসব কিছু আজ মুসলিম সমাজকে জাহান্নামের নমুনা বানিয়ে দিয়েছে। আর শয়তানের তৈরি এ জ্বলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গে মুসলমানরাই ইন্ধনে পরিণত হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত