পাকিস্তানের ৮ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ঘিরে নির্বাচনী প্রচারণার চেয়ে প্রাক-নির্বাচন প্রকৌশল বা প্রি-ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজটিই চলেছে বেশি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড, রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রির অভিযোগে ১৪ বছরের কারাদ- ও তার বিয়েতে আইন অমান্য করার অভিযোগে ৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে এস্টাবলিশমেন্ট ভোটারদের কাছে বার্তা দিতে চেষ্টা করেছে, ইমরানের আর ভবিষ্যৎ নেই। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, দ্রুততম এসব শুনানিতে ঝটপট শুনিয়ে দেওয়া আদালতের রায় ইমরানের জনপ্রিয়তা এতটুকুও কমাতে পারেনি। সাম্প্রতিকতম জন-অভিমত জরিপ তা-ই প্রমাণ করে।
ইমরানকে নির্বাচনী রেস থেকে দূরে রাখতে সম্ভাব্য সবকিছুই করেছে এস্টাবলিশমেন্ট। তাকে কারাগারে পাঠিয়ে নির্বাচনে অনুপযুক্ত ঘোষণা করেছে; তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর শীর্ষ নেতাদের জেলে পাঠিয়েছে, জুলুম করেছে; কর্মীদের ওপর চলেছে নির্যাতনের স্টিম রোলার, তাদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে; পিটিআইয়ের নির্বাচনী প্রতীক ক্রিকেট ব্যাট কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং অসংখ্য প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এসব কিছুই হচ্ছে প্রি-ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিটি আসনে তবু লড়ছে পিটিআই প্রার্থীরা। নির্বাচনে অংশগ্রহণের এই প্ল্যান ‘বি’কেই ধরা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন কৌশল হিসেবে। এস্টাবলিশমেন্ট পিটিআইয়ের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিরাপত্তার অজুহাতে জনসভা করতে দেয়নি। কিন্তু ইন্টারনেট প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে জোর প্রচারণা তারা চালিয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ রেখে ও নানান অপকৌশলে ঠেকানো যায়নি এ অনলাইন ক্যাম্পেইন। পিটিআইয়ের নারী কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে জানিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে স্বতন্ত্রের আড়ালে কে পিটিআইয়ের প্রার্থী।
মুসলিম লীগ (নওয়াজ) যেহেতু এস্টাবলিশমেন্টের মনোনীত প্রার্থী কাজেই তাদের প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে বেশ দেরিতে; নির্বাচনী ইশতেহার তারা দিয়েছে দেরিতে। পরীক্ষায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথম হওয়ার নিশ্চয়তা পেলে ছাত্রের যেরকম মনোভঙ্গি হয় ঠিক তেমনই যেন নওয়াজ-সমর্থকদের চালচলন। যেভাবে এস্টাবলিশমেন্ট নওয়াজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সব অভিযোগ মুছে দিয়ে তাকে বিলেতের নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে এনেছে, তাতে সাধারণ মানুষের বুঝতে বাকি নেই যে, নওয়াজ শরিফই চতুর্থবারের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। এস্টাবলিশমেন্ট এরকম একটা অভিমত প্রচারের চেষ্টা করছে যে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটাতে নওয়াজই যোগ্য ব্যক্তি। তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম; মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে তিনিই পারেন, তিনিই পারবেন। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিতে তিনি অবদান রাখতে পারবেন।
এ নির্বাচনের ডার্কহর্স খুব সম্ভবত পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। এ দলের তরুণ নেতা বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি অনেক আগেই নির্বাচনী ইশতেহার দিয়ে তার প্রচারণা শুরু করেছেন। এস্টাবলিশমেন্টের কাছে ধরনা না দিয়ে জনগণের কাছেই বেশি গিয়েছেন তিনি। অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে পিপিপিকে গত দেড় দশকে কখনই ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আপস করতে দেখা যায়নি। শুধু বিলাওয়ালের বাবা আসিফ আলি জারদারির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগই এই দলের জনপ্রিয়তার পথে প্রধান বাধা। দেখার বিষয়, বিলাওয়াল তার মা বেনজির ভুট্টোর ইমেজকে কাজে লাগিয়ে কেমন ফল করেন এ নির্বাচনে।
জামায়াতে ইসলামী, তেহরিক লাব্বায়েক পাকিস্তানের (টিএলপি) মতো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো জোরেশোরে চালিয়েছে তাদের নির্বাচনী প্রচারণা। জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রচারণা কৌশলে ধর্মকে ব্যবহার না করে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেছে। তবে তাদের প্রতি জনভীতি ও ইসলামি কট্টরপন্থার রেখে যাওয়া চিহ্ন, উত্তরাঞ্চলে চলমান সন্ত্রাসবাদ নির্বাচনী ফলে নেতিবাচক ছায়া ফেলবে জনমত জরিপে এমন মনোভাব লক্ষ করা যায়। সব মিলিয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ইমেজ-সংকট কাটিয়ে ওঠা দুরূহ বলে মনে হয়। তারা কটি আসন পায় তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে জনমনে।
যেহেতু পাকিস্তানের ৪৪ শতাংশ ভোটার তরুণ ফলে স্বতন্ত্রের আড়ালে থাকা পিটিআই প্রার্থীদের ভোট দেওয়াকে তারা সেনাবাহিনীর পেশিশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বলে মনে করে; এরকম একটি নির্বাচনী আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে যেন। অতীতের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সেনাবাহিনী বা এস্টাবলিশমেন্ট ভোটের আগে নানারকম কৃৎকৌশল করলেও ভোটের দিন ভোটগ্রহণে ও ভোটের ফল ঘোষণায় তারা তেমন প্রভাব রাখতে পারে না। ভোটের ফল ঘোষণার পর আবার তারা হর্স ট্রেডিংয়ের (সাংসদ বেচাকেনা) মাধ্যমে কিং মেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে পিটিআইয়ের বিরুদ্ধে প্রি-ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সব কৌশল গ্রহণ করার পরেও যেহেতু পিটিআইয়ের প্ল্যান-বি সক্রিয়, সে কারণে এস্টাবলিশমেন্টের পছন্দের দল মুসলিম লীগের নওয়াজকে ক্ষমতায় বসানোর অঙ্ক বেশ জটিল হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অপেক্ষাকৃত ক্রেডিবল নির্বাচনী পদ্ধতি ‘রিগিং’-এর নেশাজনিত কারণে ক্রেডিবিলিটি হারাতে পারে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এ নির্বাচন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জনরোষ বৃদ্ধির একটি উপলক্ষ হিসেবেই হয়তো চিহ্নিত হবে। এই যে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সেনাবাহিনীর জিতে যাওয়ার প্রবণতা, তা এখন এ জনপদে প্রধান সমালোচনার বিষয়। পেশিশক্তি দিয়ে জনমতকে দমিয়ে রাখার যে ট্র্যাডিশন তা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। সে কারণেই এ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে কোনো আগ্রহ নেই; বরং ভোট দিয়ে প্রতিবাদ জানানোর নীরব প্রস্তুতি রয়েছে। এস্টাবলিশমেন্টের কোলে চড়ে ক্ষমতায় এলেও নওয়াজ শরিফ একজন অজনপ্রিয় নেতাই থেকে যাবেন বলে মনে হয়।
এ নির্বাচনে তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষিত তৈরি করেছে। পরিবারতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচারণা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পরিবারতন্ত্রের প্রতিনিধি বিলাওয়াল ভুট্টোকেও তার প্রচারণায় অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করতে হয়েছে। অতীতে সেনাবাহিনীর সমালোচনায় যেরকম ঢাক-ঢাক গুড়-গুড় ব্যাপার ছিল, তরুণ প্রজন্ম তা সরিয়ে যেন প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে। এরকম উপহাস, বিদ্রুপ, প্রত্যাখ্যানের মধ্যে আদিম পেশিশক্তির কৌশলে টিকে থাকা খুব কঠিন। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের এস্টাবলিশমেন্ট যে জন-অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মনপছন্দ সমাধান খুঁজছে, তা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। এ নির্বাচন বরং তরুণদের দ্রোহের শুরুর ইঙ্গিত।
এ নির্বাচনে ভোটারের অংশগ্রহণ বেশি হলে নওয়াজকে জোর করে ক্ষমতায় বসানোর মিশন দুরূহ হয়ে পড়বে। আর ভোটারের অংশগ্রহণ কম হলে নওয়াজ হবেন দুর্বল ম্যান্ডেটের প্রধানমন্ত্রী। শাঁখের করাত ঝুলছে এস্টাবলিশমেন্টের ঘাড়ে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক
