পর্দার অভিনেত্রী না মাঠের নেত্রী

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:২০ এএম

তারকা খ্যাতি লাভ করেছেন এমন ব্যক্তিরাও আওয়ামী লীগে জায়গা পেতে শুরু করেছেন এক যুগ ধরে। দলে ও সংসদে সব জায়গায়ই গুরুত্ব পাচ্ছেন সমাজকর্মী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্রীড়াব্যক্তিত্ব, শিল্প ও সাহিত্যাঙ্গনের তারকারা। এবারের সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এ তারকাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে। তাছাড়া এবার তারকাদের অনেককেই ছুটোছুটি করতে দেখা যাচ্ছে। ফলে বিপাকে আছেন মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা নেত্রীরা। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলেও নীরব দলীয় নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাসহ অন্তত দেড় ডজন নেতা এই নিয়ে খেদোক্তি প্রকাশ করেছেন। দলের এসব নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন পেশার লোকজন যেভাবে আওয়ামী লীগে সুযোগ পাচ্ছেন, তা চব্বিশ ঘণ্টার রাজনীতিকদের জন্য অবশ্যই কষ্টের। তারা বলেন, এ কষ্ট এমন এক কষ্ট, যা প্রকাশ করা যায় না, সহ্যও করা যায় না।

তারা মনে করছেন, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনে তারকা খ্যাতি পাওয়া ব্যক্তিত্বদের আওয়ামী লীগ যেভাবে দলে টেনে নিতে শুরু করেছে, তাতে মাঠের রাজনীতিকদের একরকম বঞ্চিত করা হয়। এক যুগ ধরে রাজনীতিকরা যেসব জায়গায় আসীন হওয়ার কথা, সেখানে অনেক জায়গায় অভিনেতা-অভিনেত্রীসহ তারকা খ্যাতি পাওয়া ব্যক্তিরা সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। রাজনীতিকদের জন্য এটা হতাশার বড় কারণ হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরকে দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তারকাদের টেনে আনার সংস্কৃতি শুরু হয়। এখন ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সুবর্ণা মুস্তাফা, শমী কায়সার, ফেরদৌস আওয়ামী লীগে যুক্ত হয়েছেন। ক্রিকেটার মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, সাকিব আল হাসান সংসদ সদস্য হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংরক্ষিত সংসদ সদস্য হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন অন্তত ৫০ জন অভিনেত্রী। সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে তারকা খ্যাতি পাওয়া আরও অন্তত এক ডজন নারীও সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হতে দেন-দরবার চালিয়ে যাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যারা মাঠে থেকে দিনরাত রাজনীতিটাই করেছি, তারা এখন অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছি। তারকা খ্যাতি পাওয়া ব্যক্তিদের কিছু দেওয়ার হলে অন্য অনেক জায়গা রয়েছে, সেখানে তাদের যুক্ত করতে পারে। দলীয় পদ ও সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একজনকেও যদি দেওয়া হয়, তাতে রাজনীতিকদের বঞ্চিত করা হয়। কারণ, আপদে-বিপদে পাশে থাকব আমরা, অত্যাচার-নির্যাতনও আমরাই সহ্য করব।’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের এক নারী সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি জানি না রাজনীতিতে এ সংস্কৃতি সৃষ্টি করার কারণ কী? এটা মাঠের ঘাম-শ্রম জড়ানো নেতাকর্মীদের রাজনীতিবিমুখ করে তুলবে। রাজনীতি না করেও রাজনীতিকদের যেসব পদ-পদবি পাওয়ার কথা, সেগুলো অন্য পেশার ব্যক্তিদের উপহার দেওয়া রাজনীতির আকাক্সক্ষার মৃত্যু ঘটানোর মতো।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, সংরক্ষিত মহিলা আসনে তিন ক্রাইটারিয়ায় সদস্য নির্বাচন করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনটির মধ্যে, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের কয়েকজন, তৃণমূলের নারী নেত্রীদের, যাদের পরিবারের অবদান রয়েছে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে, কিন্তু তাদের কোনো মূল্যায়ন করতে পারেননি শেখ হাসিনা। এ ছাড়া বিভিন্ন পেশায় কাজ করে তারকা খ্যাতি পেয়েছেন যারা, এখানে আইনজীবী, ব্যবসায়ী সমাজসেবীসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা থাকবেন।

দলের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নে নতুন মুখ আসবে বেশি। ৪০-৪২ জন নারী নতুন করে সংরক্ষিত আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে পারেন। তাদের মধ্যে দুয়েকজনের মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ ছাড়া সংসদের হুইপ পদে মহিলা এমপিদের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। মনোনয়ন পেতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে তদবির করছেন সহযোগী সংগঠনের পদধারীদের পাশাপাশি অভিনেত্রীসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেত্রীরাও। তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, বরাবরের মতো হাতেগোনা কয়েকটি পরিচিত মুখ ছাড়া অধিকাংশ আসবেন তৃণমূল থেকে। সংরক্ষিত মহিলা আসনের ৫০টির মধ্যে আওয়ামী লীগের পাওয়ার কথা ছিল ৩৮টি। তবে ৬২ স্বতন্ত্র এমপি তাদের সমর্থন দেওয়ায় এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮। আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানিয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ। জাতীয় পার্টির ভাগে দুটি আসন। দলটিকে সমর্থন জানিয়েছে কল্যাণ পার্টিও।

সংরক্ষিত মহিলা আসনে একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্যের মধ্যে হাতেগোনা দুই-তিনজন ছাড়া সবাই বাদ পড়বেন বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের এক সদস্য। তিনি বলেন, তাদের জায়গায় আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার পাশাপাশি সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের ৭-১০ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে। সুশীল সমাজ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নাট্য ও তারকা ছাড়াও সরাসরি নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়েও জোটগত সমঝোতার কারণে যারা সরে দাঁড়িয়েছেন কিংবা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নানা হিসাব-নিকাশে যারা মনোনয়ন পাননি, তাদের এবার বিবেচনা করা হতে পারে।

গত ২৮ জানুয়ারি স্বতন্ত্র এমপিদের সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগী পরিবার রয়েছে। অনেক নেতা অকালে মারা গেছেন। তাদের স্ত্রী-সন্তানরা আছেন। পেশাজীবীদের মধ্য থেকেও কাউকে কাউকে সংসদ সদস্য করা দরকার। এর মাধ্যমে ত্যাগীদের একটা স্বীকৃতি দেওয়া যাবে। তিনি বেছে বেছে ত্যাগীদের খুঁজে বের করে সংসদ সদস্য বানাবেন বলে জানান।

এদিকে সংরক্ষিত আসনে নিজ নিজ অবস্থানের কথা জানিয়ে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং স্বতন্ত্র এমপিরা নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছে। ইতিমধ্যে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। গত মঙ্গলবার থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩২টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সংরক্ষিত মহিলা আসনে দলের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন চট্টগ্রাম বিভাগে অভিনেত্রী নিপুণ আক্তার, বগুড়া থেকে অপু বিশ্বাস, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, রোকেয়া প্রাচী, সোহানা সাবা, ঊর্মিলা শ্রাবন্তী কর, তানভিন সুইটি, জাকিয়া মুন, সৈয়দা কামরুন নাহার শাহনূর, শামীমা তুষ্টি, তারিনসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তারকা।

আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সভায় মনোনয়ন করা হবে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্যদের। তবে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের প্রার্থী সাধারণত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাই ঠিক করে থাকেন।

আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক জাহানারা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংরক্ষিত মহিলা এমপি নির্বাচনে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি। উনি সবাইকে চেনেন, সবার ত্যাগের মূল্যায়ন করা হবে।’

নবম, দশম ও একাদশ সংসদের সংরক্ষিত আসনের সদস্য ছিলেন ফজিলাতুন নেছা ইন্দিরা। দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদে ছিলেন ওয়াসিকা আয়শা খান। তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন টানা দুই মেয়াদে। এবারও তার থাকার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে আলোচনায় আছেন স্বাস্থ্য সম্পাদক রোকেয়া সুলতানা, পারভীন জামান কল্পনা, মারুফা আক্তার পপি, গ্লোরিয়া সরকার ঝর্ণা। সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে যুব মহিলা লীগের সভাপতি আলেয়া সারোয়ার ডেইজি, সাধারণ সম্পাদক শারমিন সুলতানা লিলি আলোচনায় আছেন। তারকাদের মধ্যে আলোচনায় আছেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, নাট্যব্যক্তিত্ব লাকী ইনাম, শমী কায়সার, রোকেয়া প্রাচী, তারিন জাহান প্রমুখ। একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা এমপিদের মধ্যে আরমা দত্ত আলোচনা আছেন। দলটির কৃষি ও সমবায় সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলীকে সংরক্ষিত আসনের এমপি করা হতে পারে। অন্যদিকে সাবেক শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের বিষয়ে আওয়ামী লীগ ইতিবাচক বলে জানা গেছে। নির্বাচনের আগে জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারকে সংরক্ষিত আসনে এমপি করার বিষয়ে কথা হয়েছিল। জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপসহ ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের দুটি আসনে ছাড় দিতে পারে বলে জানা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত