মেরাজ কখন সংঘটিত হয়

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৫:২২ পিএম

আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক যুগেই নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন। কোনো যুগ নবী-রাসুলের নিদের্শনা থেকে বঞ্চিত ছিল না। তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হলেন, আমাদের প্রিয় নবী (সা.)। তিনি সাইয়্যেদুল আম্বিয়া তথা নবী-রাসুলদের সর্দার। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে রাসুল! আমি আপনাকে গোটা মানবজাতির জন্য রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছি।’ (সুরা সাবা, আয়াত: ২২)

মহানবী (সা.)-এর নবুয়তকে শক্তিশালী করার জন্য অন্য নবী-রাসুলদের মতো তাকেও দেওয়া হয়েছে অগণিত মুজিজা ও অলৌকিকতা। এর মধ্যে মেরাজ অন্যতম।

ইসরা ও মেরাজের মধ্যে পার্থক্য : ইসরা অর্থ নৈশভ্রমণ, রাত্রিকালীন ভ্রমণ। আর মেরাজ অর্থ সিঁড়ি, ঊর্ধ্বলোকে গমন, সোপান, মই। মেরাজ তথা ঊর্ধ্বলোকে গমনের কথা হাদিস দ্বারা আর ইসরা তথা নৈশভ্রমণের কথা কোরআন মজিদ দ্বারা প্রমাণিত। ইসরাকে অস্বীকারকারী কাফির হবে, কিন্তু মেরাজকে অস্বীকারকারী কাফির হবে না, তবে মহাপাপী হবে।

মেরাজ কখন সংঘটিত হয় : মেরাজ কখন সংঘটিত হয় এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। মুসা ইবনে ওকবা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, মিরাজের ঘটনা হিজরতের ছয় মাস আগে সংঘটিত হয়। ইমাম নববী ও কুরতুবির মতে, মিরাজের ঘটনা মহানবী (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির পাঁচ বছর পর ঘটেছে। ইবনে ইসহাক বলেন, মিরাজের ঘটনা তখন ঘটেছিল, যখন ইসলাম আরবের সব গোত্রে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ইমাম হরবি বলেন, ইসরা ও মিরাজের ঘটনা রবিউস সানি মাসের ২৭ তারিখ রাতে হিজরতের এক বছর আগে ঘটেছিল। ইবনে কাসেম সাহাবি বলেন, নবুয়তপ্রাপ্তির ১৮ মাস পর এ ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ মতে, নবুয়তের দশম বর্ষে রজব মাসের ২৭ তারিখে মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়। তিবরানি (রহ.) বলেছেন, যে বছর মহানবী (সা.)-কে নবুয়ত দেওয়া হয়, সে বছরই মেরাজ সংঘটিত হয়। কারো মতে হিজরতের ১৬ মাস আগে রমজান মাসে মেরাজ সংঘটিত হয়। (আর রাহিকুল মাখতুম)

ভ্রমণের সূচনা : হাদিসের ভাষ্য মতে, মিরাজের সূচনা হয় মসজিদে হারাম থেকে। রাসুল (সা.) রজব মাসের ২৭-এর রজনীতে আল্লাতায়ালার ঘরের হিজরের মধ্যে শায়িত ছিলেন। এমন সময় হজরত জিবরাইল (আ.) এসে জাগ্রত করে তার বক্ষ মুবারক বিদীর্ণ করে দূষিত রক্ত বের করে আবার জোড়া লাগিয়ে দেন। অতঃপর বোরাকে করে সশরীরে বায়তুল মুকাদ্দাস নিয়ে যান। বোরাক হলো এমন একটি প্রাণী, যা গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি আকৃতির একটি জন্তু। তার দুই উরুতে রয়েছে দুটি পাখা। তা দিয়ে এটি পেছনের পায়ে ঝাপটা দেয়, আর সামনের দৃষ্টির শেষ সীমায় পা ফেলে। প্রিয়নবী (সা.) বায়তুল মুকাদ্দাসের দরজায় খুঁটির সঙ্গে বোরাকটি বেঁধে যাত্রাবিরতি করেন এবং সব নবীর ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করেন। (আর রাহিকুল মাখতুম)।

ঊর্ধ্ব গমন : বায়তুল মাকদাসে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ আদায় করার পর সিঁড়ি আনা হয়, যাতে নিচ থেকে ওপরে যাওয়ার জন্য ধাপ বানানো ছিল। তিনি সিঁড়ির সাহায্যে প্রথমে প্রথম আকাশে, অতঃপর অবশিষ্ট আকাশগুলোয় গমন করেন। এ সিঁড়িটি কী এবং কেমন ছিল, তার প্রকৃত স্বরূপ আল্লাতায়ালাই জানেন। প্রতিটি আকাশে সেখানকার ফেরেশতারা তাকে অভ্যর্থনা জানান এবং প্রত্যেক আকাশে অবস্থানরত পয়গম্বরদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। প্রথম আকাশে হজরত আদম (আ.)-কে, দ্বিতীয় আকাশে হজরত ইয়াহিয়া ও ঈসা (আ.)-কে, তৃতীয় আকাশে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে, চতুর্থ আকাশে হজরত ইদরিস (আ.)-কে, পঞ্চম আকাশে হজরত হারুন (আ.)-কে, ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.)-কে এবং সপ্তম আকাশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে দেখতে পান। তিনি সাহাবায়ে কেরামের কাছে হজরত ঈসা ও মুসা (আ.)-এর আকৃতিও বর্ণনা করেছেন। নবীদের স্থানগুলো অতিক্রম করে এক ময়দানে পৌঁছান। যেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তারপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহা গমন করেন, যেখানে আল্লাহতায়ালার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি ইতস্তত ছোটাছুটি করছে। ফেরেশতারা স্থানটি ঘিরে রাখছেন। রাসুল (সা.) সেখানে হজরত জিবরাইল (আ.)-কে তার স্বরূপে দেখেন। তার ছয় শ পাখা সেখানে তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের ‘রফরফ’ দেখতে পান। রফরফ হলো সবুজ রঙের গদিবিশিষ্ট পালকি। রফরফের মাধ্যমে তিনি আল্লাহর কাছে গমন করেন। এ সফরে তাকে কয়েকটি জিনিস দেখানো হয়। তাকে দুধ ও মদ দেওয়া হয়েছিল। তিনি দুধ গ্রহণ করেন। এটা দেখে হজরত জিবরাইল (আ.) বলেন, আপনি স্বভাবগত বস্তুগ্রহণ করেছেন। আপনি মদগ্রহণ করলে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত। তাকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো হয়। জাহান্নামিদের শাস্তিও তিনি অবলোকন করেন। জাহান্নামের দারোগা মালেককে দেখেছেন, তিনি হাসেন না। তার চেহারায় হাসির কোনো ছাপও নেই।

মেরাজের শিক্ষা : মেরাজের ঘটনা থেকে মুমিন সঠিক পথের দিশা খুঁজে পায়। আল্লাহর অপার অনুগ্রহ ও দ্বিনের অবিচলতা লাভ করে। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) যে আল্লাহতায়ালার কাছে কত দামি ও মর্যাদার অধিকারী, তা এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। তাকে এমন মর্যাদা দান করা হয়েছে, যা অন্য কোনো নবীকে দান করা হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত