৫ দিনে পালিয়ে এলো ৩৩১ বিজিপি

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৩:৫৪ এএম

মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) আরও ২ জন সদস্য গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ নিয়ে গত ৫ দিনে বিজিপির ৩৩১ জন সদস্য পালিয়ে এসে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) কাছে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে ১০১ জন সদস্যকে গতকাল কক্সবাজারের টেকনাফে স্থানান্তর করা হয়েছে। বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয় নেওয়াদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রশাসনিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে বান্দরবানের তমব্রু সীমান্ত থেকে তাদের টেকনাফের হ্নীলাতে স্থানান্তর করা হয়।

এদিকে সময় নষ্ট না করে যত দ্রুত সম্ভব মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের তাদের দেশে ফেরত পাঠাতে চায় বাংলাদেশ। গতকাল বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও জনকূটনীতি অনুবিভাগের মহাপরিচালক সেহেলি সাবরিন।

টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আশ্রয় নেওয়া বিজিপি সদস্যদের মিয়ানমার ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাদের টেকনাফ আনা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সেহেলি সাবরিন বলেন, আশা করা যাচ্ছে অতি দ্রুত তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে। সেটা আকাশপথেই হোক বা সমুদ্রপথেই হোক, তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ কেন তাদের আশ্রয় দিয়েছে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার সরকারের নিয়মিত বাহিনী বিজিপির সদস্যদের আশ্রয়দান এবং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি এক করে দেখা ঠিক হবে না। বিমানে করে প্রত্যাবাসন দ্রুত করা সম্ভব, এটা বিবেচনা করে বাংলাদেশ এ প্রস্তাব দিয়েছিল। মিয়ানমার কিছুদিন আগে ভারত থেকেও বিমানে করে সৈন্য নিয়ে এসেছিল। তাই বিমানে বিজিপি সদস্যদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গত বুধবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

মিয়ানমারের চলমান সংঘাত তার অভ্যন্তরীণ বিষয় জানিয়ে সেহেলি সাবরিন বলেন, এর ফলে বাংলাদেশের জনসাধারণ, সম্পদ বা সার্বভৌমত্ব কোনোভাবে যেন হুমকির সম্মুখীন না হয় সেদিকে দৃষ্টি রেখে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সুবিধাজনক সময়ে স্বেচ্ছায়, টেকসই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ নিয়ে বাংলাদেশ সতর্ক রয়েছে এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সঙ্গে নিউ ইয়র্কের স্থায়ী মিশন সারাক্ষণ যোগাযোগ রেখে চলেছে।

সেহেলি সাবরিন বলেন, গতকাল বিডাতে মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্র সচিবও সেখানে অংশ নেন। সভায় শুধু চীনা নয়, অন্যান্য দেশেরও অবৈধ নাগরিকদের ভিসা এক্সপায়ার, এক ভিসায় এসে অন্য ক্যাটাগরিতে অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

টানা এক সপ্তাহের অধিক সময় ধরে চলা মিয়ানমারের অভ্যন্তরের ত্রিমুখী সংঘর্ষ কমে ওপারে কিছুটা নীরবতা বিরাজ করছে। তবে বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে গোলাগুলি না ঘটলেও এখনো নিরাপদ স্থানে সরে রয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তের বাসিন্দারা। অনির্দিষ্টকালের জন্য টেকনাফ-সেন্টমার্টিন জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। গতকাল উদ্ধার হয়েছে অবিস্ফোরিত মর্টার শেল।  পাশাপাশি বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।

কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা প্রশাসন, বিজিবি ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, গতকাল সারা দিন সীমান্ত ঘেঁষে কোনো গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি। মিয়ানমারের অনেকটা ভেতর থেকে মাঝে মধ্যে আওয়াজ ভেসে আসছিল।

ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, মর্টার শেলে দুজন নিহত হওয়ার পর থেকে এখানকার লোকজন আতঙ্কে রয়েছে। তাই সীমান্ত ঘেঁষে বসবাসকারী লোকজন এখনো বাড়ি ফেরেনি। তারা আরও কয়েকদিন এলাকার বাইরে নিরাপদ স্থানে থাকবে।

হোয়াইক্যং ইউপি চেয়ারম্যান নূর আহমদ আনোয়ারী বলেন, গতকাল ভোরে দুজন বিজিপি সদস্য সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ছাড়া আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মাঝে মধ্যে মিয়ানমারের অনেক ভেতর থেকে গুলির আওয়াজ শোনা যায়।

বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মুজাহিদ উদ্দিন বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গত দুদিন গোলাগুলির কোনো খবর শুনিনি। তবুও আমরা সতর্ক রয়েছি। সীমান্তবাসীদের আরও কয়েকদিন নিরাপদ স্থানে থাকার আহ্বান জানিয়েছি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক শাহীন মুহাম্মদ ইমরান বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সীমান্ত নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশ রোধে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘুমধুমে অবিস্ফোরিত মর্টার শেল উদ্ধার : গতকাল দুপুরের দিকে ঘুমধুম ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড নয়াপাড়ায় অবিস্ফোরিত মর্টার শেলটি পাওয়া যায়। পরে বিজিবি সদস্যরা তা উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

ঘুমধুম ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, সোমবার রাতে কোনো এক সময় শেলটি এখানে পড়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর পর থেকে এদিকে লোকজনের যাতায়াত ছিল না। গতকাল পরিস্থিতি শান্ত থাকায় লোকজন এদিকে এলে শেলটি দেখতে পায়।

এ বিষয়ে ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ি তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মাহাফুজ ইমতিয়াজ ভূঁইয়া বলেন, অবিস্ফোরিত মর্টার শেলটি বিজিবি উদ্ধার করেছে বলে শুনেছি।

সেই ২৩ উগ্রপন্থির বিরুদ্ধে এখনো মামলা হয়নি : সীমান্ত পেরিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়া মিয়ানমারের সেই ২৩ উগ্রপন্থির বিরুদ্ধে এখনো মামলা রুজু হয়নি। তবে মামলা করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন বিজিবি। 

পুলিশ, বিজিবি, ইউপি পরিষদ ও গ্রামবাসীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত মঙ্গলবার ৪টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ ২৩ জনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করে গ্রামবাসী।

এদিকে গত বুধবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিদর্শন শেষে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী জানিয়েছিলেন, সেই উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করবে বিজিবি।

কিন্তু উখিয়া থানার ওসি শামীম হোসেন বলেন, এখনো বিজিবির পক্ষ থেকে এজাহার দেয়নি। এজাহার পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্তরাও এখনো তাদের হেফাজতে রয়েছে।

তবে কক্সবাজারের ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক আবদুল্লাহ আল মাশরুকি বলেন, খুব দ্রুত এজাহার দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। কতটি অস্ত্র, কতজনের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে এ বিষয়ে সদর দপ্তর থেকে জানানো হবে।

টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা : মিয়ানমারে পরিস্থিতির কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যটকবাহী সব জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। তবে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে সেন্টমার্টিন নৌরুটে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইয়ামিন হোসেন বলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনগামী সব পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এক্ষেত্রে সব জাহাজ শুক্রবার পর্যন্ত চলাচল করবে। পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সবাইকে অবগত করা হবে।

ছয়টি শহর দখলে নিয়েছে বিদ্রোহীরা : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নৃতাত্ত্বিক সশস্ত্র সংগঠন (ইএও) আরাকান আর্মি (এএ) ছয়টি শহরের ওপর পরিপূর্ণভাবে দখল নিয়েছে। গত বছরের ১৩ নভেম্বর থেকে ধারাবাহিকভাবে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে তারা। এখন পর্যন্ত রাখাইনের সামি, পাউকতাউ, মিনবিয়া, কিয়াকতাউ ও তাউং পি লেত ওয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বিদ্রোহীরা। এ ছাড়া পালেতওয়া শহরটিও এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। আরও দুটি শহর দখলের কাজ প্রায় শেষপ্রান্তে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা এবং এর কাছাকাছি শহর ও এলাকায় ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে জান্তার বাহিনী।

আরও দুটি জাতিগত সংগঠনের সঙ্গে আরাকান আর্মি মৈত্রী গড়ে তুলে জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। মৈত্রী জোট ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ নিয়মিতভাবে তাদের লড়াইয়ের খবরাখবর জানাচ্ছে। আরাকান আর্মি জানিয়েছে, তারা ম্রাউক-ইউ এবং রামরি দখলের দ্বারপ্রান্তে। গত ১৪ জানুয়ারি পালেতওয়া, ১৬ জানুয়ারি সামি, পাউকতাউ ১৯ জানুয়ারি, মিনবিয়া ও তাউং পোয়ে লেত ওয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি এবং কিয়াকতাউ দখল করেছে ৭ ফেব্রুয়ারি। রাখাইন রাজ্যের সাবেক রাজধানী ম্রাউক-ইউ। এখানে একটি সামরিক ঘাঁটি ছাড়া সবই দখল করেছে আরাকান আর্মি। ধারণা করা হচ্ছে, শিগগিরই এর দখল হারাবে জান্তার অনুগত সেনারা।

আরাকান আর্মি বলছে, গত ১৩ নভেম্বরের পর থেকে ধারাবাহিক আক্রমণে জান্তার প্রায় ২০০টি ঘাঁটি দখল করেছে তারা। এর মধ্যে কয়েকটি ছিল বড় বড় সামরিক কমান্ড সেন্টার ও ব্যাটালিয়ন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত