প্রচারবিমুখ একনিষ্ঠ ভাষা আন্দোলন গবেষক

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০৭ এএম

পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত নিভৃত পল্লী গৌরীগ্রামের সবুজ প্রকৃতির মধ্যে গিয়ে ‘সম্প্রীতি কুটির’ নামে একটি নান্দনিক ভবন চোখে পড়ল। এটি ইতিহাস-ঐতিহ্য সন্ধানী গবেষক ড. এম আবদুল আলীম প্রতিষ্ঠিত ‘ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও পাঠাগার’। ভেতরে প্রবেশ করেই দেয়ালজুড়ে দেখা গেল, ভাষা আন্দোলনের নানা আলোকচিত্র; ঐ সময়কার পত্র-পত্রিকার কাটিং, ভাষাসংগ্রামীদের মিছিল, ভাষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক-খলনায়কদের আলোকচিত্র। সুসজ্জিত সেলফগুলোতে থরে থরে সাজানো বই, দুষ্প্রাপ্য পত্র-পত্রিকা এবং দলিলপত্র। সেখান থেকে পাবনা শহরের দিলালপুরের শিল্পগলির তিনতলা ভবনের একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে গিয়েও একই চিত্র দেখা গেল। এই বইবেষ্টিত কক্ষের এক কোণে জানালার পাশে গভীর মনোযোগে লিখছেন এক গবেষক। এম আবদুল আলীম বই পড়েন, পড়ান এবং লেখেন। এই পঠন-পাঠন, লেখালেখি ও অনুসন্ধানের মূল বিষয় ভাষা আন্দোলন। এ পর্যন্ত ভাষা-সাহিত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ে ৩৫টি বই প্রকাশিত হয়েছে, যার ১৮টিই ভাষা আন্দোলন-বিষয়ক। এম আবদুল আলীমের লেখালেখি ও গবেষণাকর্ম বাংলার বিদ্বৎসমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিক, পণ্ডিত হায়াৎ মামুদ তার গ্রন্থের মুখবন্ধ লিখেছেন। তার বইয়ের মলাট উল্টালে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার পাতায় চোখ মেললে এসব বিজ্ঞজনের মূল্যায়ন থেকে এই গবেষক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

২০১৩ সালে যখন তার পাবনায় ভাষা আন্দোলন বইটি প্রকাশিত হয়, সেটির ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন ভাষাসংগ্রামী ও গবেষক আহমদ রফিক। একইভাবে ২০২০ সালে ভাষা আন্দোলন-কোষ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, সেটির মলাট-পরিচিতিও লেখেন। তার বই পাবনায় ভাষা আন্দোলন এবং বিশেষ করে বড়সড় কাজ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন : জেলাভিত্তিক ইতিহাস নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এম আবদুল আলীমের ভাষা আন্দোলন-কোষ গ্রন্থের মুখবন্ধ লিখেছিলেন। পণ্ডিত-গবেষকদের মূল্যায়নের পাশাপাশি গবেষণা ও মেধার স্বীকৃতি-স্বরূপ তিনি নানা পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ফেলো হিসেবে গবেষণা করছেন ভাষা আন্দোলনে রাজনৈতিক দল, ছাত্র-যুব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে। প্রধান গবেষক হিসেবে কাজ করছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক গবেষণা-প্রকল্পে। সম্প্রতি প্রকাশিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ‘এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ’ গ্রন্থেরও সম্পাদনা-সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা করেছেন আধুনিক বাংলা কবিতা নিয়ে। কর্মজীবনে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারের সদস্য হিসেবে সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ এবং ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অধ্যাপনা তার পেশা হলেও মগ্ন থাকেন পড়ালেখা ও গবেষণায়।

এম আবদুল আলীমের ভাষা আন্দোলন-গবেষণা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমাদের ইতিহাসের পাতায় চোখ মেলতে হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শিরোনামের পুস্তিকা। এতে আবুল কাশেম, আবুল মনসুর আহমদ ও কাজী মোতাহার হোসেনের লেখা প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন : কী ও কেন? এবং আমাদের ভাষার লড়াই শিরোনামে দুটি পুস্তিকা রচনা করেন যথাক্রমে আনিসুজ্জামান ও বদরুদ্দীন উমর। ১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার বালিগঞ্জের বেনু প্রকাশনী থেকে মানিকগঞ্জের বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী প্রমথ নন্দীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ওরা প্রাণ দিল শীর্ষক একুশের সংকলন। ১৯৫৩ সালের হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদনা করেন একুশে ফেব্রুয়ারি নামে একুশের ঐতিহাসিক সংকলন। পরবর্তী সময়ে প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম, হানিফ পাঠান, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, গাজীউল হক, এম আর আখতার মুকুল, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, আহমদ রফিক, রফিকুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, মযহারুল ইসলাম, ডা. সাঈদ হায়দার, শরফুদ্দীন আহমেদ, আমির আলী, বদরুদ্দীন উমর, সফর আলী আকন্দ, আনোয়ার দিল, আফিয়া দিল, হারুন-অর-রশীদ, মাহ্বুব উল্লাহ্, শামসুজ্জামান খান, বশীর আল্-হেলাল, এম এ বার্ণিক, রতন লাল চক্রবর্তী, আবুল কাসেম ফজলুল হক, হুমায়ুন আজাদ, আতিউর রহমান, আবু মো. দেলোয়ার হোসেন, মোস্তফা কামাল, বিশ্বজিৎ ঘোষ, সুকুমার বিশ্বাস, গোলাম কুদ্দুছ, তসিকুল ইসলাম, তাজুল মোহাম্মদ, মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, সাহিদা বেগম, রীতা ভৌমিক, এম আর মাহবুব, মামুন সিদ্দিকী প্রমুখ ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত ইতিহাস, স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। ভাষা আন্দোলন নিয়ে রচিত হয়েছে অনেক গান, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ। মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটক, জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন উপন্যাস, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি এবং মাহবুবুল আলম চৌধুরীর কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি কবিতা একুশের অমর সৃষ্টির মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছে ভাষা আন্দোলন জাদুঘর, সংগ্রহশালা ও গবেষণা কেন্দ্র।

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বইগুলোতে ঢাকার ভাষা আন্দোলন যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার ভাষা আন্দোলন ততটাই উপেক্ষিত হয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতা লক্ষ করে পূর্বসূরি গবেষকদের গবেষণার ধারা আরও পরিপুষ্ট ও পূর্ণতা দিতে এম আবদুল আলীম ‘ভাষা আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র ও পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করে এ সংক্রান্ত বই ও দলিলপত্র সংগ্রহ করে ইতিহাস-গবেষণার রীতি-পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করে সামগ্রিক দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসচর্চায় আত্মনিয়োজিত হয়েছেন। ইতিমধ্যে তিন খণ্ডে পরিকল্পিত ভাষা-আন্দোলন কোষ-এর দু’খণ্ড ইতিমধ্যে লেখা সম্পন্ন করেছেন, প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের পথে। প্রায় সব জেলার ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন বৃহৎ-কলেবর গ্রন্থ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন : জেলাভিত্তিক ইতিহাস।

এ বিষয়ে তার বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন বইটি ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে, বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ায় মাত্র দু বছরে তিনবার পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। বর্তমানে তমদ্দুন মজলিস, কমিউনিস্ট পার্টি তথা বামপন্থিদের ভাষা আন্দোলনে অবদান নিয়ে গবেষণা করছেন। পরিকল্পনা করেছেন, দশ খণ্ডে ভাষা আন্দোলনের দলিলপত্র সংগ্রহ-সংকলন ও সম্পাদনার। হাজার পৃষ্ঠার ভাষা আন্দোলনের দিনপঞ্জি (১৯৪৭-১৯৫৬) প্রণয়ন, ভাষাসংগ্রামী জীবনকোষ, এমনকি ভাষা আন্দোলনের বিরোধী শক্তি : কার কী ভূমিকা নিয়েও গবেষণা করছেন। তিনি জানান, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে গবেষণাকর্মে তার নিষ্ঠা ও একাগ্রতা আরও প্রবল ও গভীর হবে।

লেখক : সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত