বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন, যার মধ্য দিয়ে এসেছে মায়ের ভাষার স্বীকৃতি। মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই নির্দেশনা দিয়েছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও। এরপরও শহীদ মিনার নেই চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ফলে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা, জানছে না ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাস। ১৯৫২ সালে মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য জীবন বিলিয়ে দেওয়ার ৭১ বছর পরও শহীদ মিনার নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অর্থ বরাদ্দ না থাকাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিনেও এসব স্থাপনা নির্মাণ করা যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার না থাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। অনেক স্কুল-মাদ্রাসায় কলাগাছ, বাঁশ, কাঠ দিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনার গড়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন তারা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে,আনোয়ারায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১০টি। এর মধ্যে শহীদ মিনার আছে মাত্র ৭টি বিদ্যালয়ে। অর্থাৎ প্রায় ৯৪ শতাংশ (৯৩ দশমিক ৬৩) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই ভাষা আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনার। আর ৪৫টি কিন্ডারগার্টেন ও ১৮টি ইবতেদায়ী মাদ্রাসার মধ্যে শহীদ মিনার নেই কোনোটিতে।
এ ব্যাপারে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণের কোনো বরাদ্দ নেই। তবে নির্দেশনা আছে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই আকার ও আয়তনের শহীদ মিনার নির্মাণ করতে হবে। যারা নিজস্ব উদ্যোগে শহীদ মিনার নির্মাণ করবে, তাদের জন্যই এই নির্দেশনা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ২৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১১টি মাদ্রাসা আছে। এর মধ্যে শহীদ মিনার নেই ১৪টিতে, অর্থাৎ প্রায় ৩৮ শতাংশ (৩৭ দশমিক ৮৩) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই। শহীদ মিনারের গুরুত্ব তুলে ধরে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফেরদৌস হোসেন বলেন, ‘বাঙালি চেতনা ও আমাদের জাতিসত্তার প্রথম উন্মেষ ঘটে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ভাষা শহীদদের প্রতি যথার্থ মর্যাদা দিতে হলে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ জরুরি। এ দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারি বরাদ্দ না থাকলেও প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্ব-উদ্যোগে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ সম্পর্কে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক প্রদীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫২ বছরেও বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই, এটি আমাদের জন্য লজ্জাজনক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদনের শর্তের মধ্যে শহীদ মিনার নির্মাণ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। ভাবতে অবাক লাগে, যে জাতি ভাষার জন্য রক্ত দেয়, সেই জাতির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই।’
