হেলায় থেকেও আলোকিত তারা

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:০০ এএম

ইরান থেকে পদক এনে দেওয়ায় দেশের ক্রীড়াঙ্গণে বর্তমানে আলোচিত দুটি নাম। একজন জহির রায়হান, ২০১৭ সালে নাইরোবিতে ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে নাম লিখিয়ে রীতিমতো হইচই বাধিয়ে ফেলেছিলেন। আরেকজন মাহফুজুর রহমান শুভ, এর দুবছর পর কাঠমান্ডুতে এসএ গেমসে একেবারে হিসাবের বাইরে থেকে হাইজাম্পে দেশকে এনে দেন রৌপ্যপদক। এই দুটি পারফরম্যান্সে দুই তরুণ বুঝিয়েছিলেন যদি সঠিক পরিচর্যা পান, এগিয়ে নেওয়ার পর্যাপ্ত রসদ যদি মেলে, তবে আরও বড় মঞ্চ আলোকিত করার সামর্থ্য তাদের আছে। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন অবশ্য এদের কথা পরে আর সেভাবে মনে রাখেনি। সঠিক পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়নি তাদের। বরং অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার দশা হয়েছিল। তবে তারা হারাননি। অনেক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে তারা দুজন আলোকিত হয়েছেন ইরানে সদ্যসমাপ্ত এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে। জহির ৪০০ মিটারে জিতেছেন রৌপ্য পদক। আর মাহফুজ হাই জাম্পে এনে দেন ব্রোঞ্জ।

অথচ যাকে ঘিরে গেল কয়েক বছর আবর্তিত ছিল ফেডারেশনের কর্মকা-, সেই ইমরানুর রহমান রীতিমতো হতাশ করেছেন। ৬০ মিটার স্প্রিন্টে আগেরবারের স্বর্ণপদক তো হারিয়েছেন, অন্য রঙের কোনো পদক নিজের করে নিতে পারেননি ২৯ বছরের স্প্রিন্টার। অথচ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের ‘ভ্রমণপিপাসু’ কর্তারা অন্যদের ভুলে সারাক্ষণ ব্যস্ত থেকেছেন ইমরানুরকে নিয়ে। আসলে ইমরানে সাওয়ার হয়ে নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণের একটা পথ তৈরি০ হয়েছে। সেই সুযোগটা নিয়ম করেই নিচ্ছেন কর্তারা। এই যেমন এশিয়ান ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপে পাঁচ ক্রীড়াবিদের সঙ্গে কোনো কোচ না পাঠিয়ে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ গেছেন দলের অফিশিয়াল হিসেবে।

ফেডারেশন কর্তাদের সব ভুলে অতিমাত্রায় ইমরানুর প্রীতি মোটেই ভালো চোখে দেখেন না অন্য ইভেন্টের অ্যাথলেটরা। তাদের সঙ্গে কথা বললেই চাপা ক্ষোভটা প্রকাশ পায়। তবে কর্তাদের ভয়ে সরাসরি কেউ মুখ খুলতে চান না। প্রতিবাদে যে ক্যারিয়ার পড়তে পারে শঙ্কায়। বিভিন্ন সংস্থায় কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া স্বাদের চাকরি নিয়েও যে টানাটানি পড়ে যেতে পারে। তাই মুখ বুজে অন্যায়-অবহেলা সয়ে অন্যরা চেষ্টা করেন কোনোভাবে টিকে থাকতে। তবে এই কোনোভাবে টিকে থাকার মিছিলে আছে বেশ কিছু ব্যতিক্রম। যাদের অন্যতম জহির ও মাহফুজুর। দুজনই এখন আছেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ছায়াতলে। সারা বছর এই বাহিনীর কোচদের অধীনে নিজেদের প্রস্তুত করেন তারা। খুব প্রয়োজন হলে জহির ছুটে যান শৈশবের কোচ, বিকেএসপির সাবেক কোচ আব্দুল্লাহ হেল কাফির কাছে। আর মাহফুজ নিজের ফাইন-টিউনিংয়ের প্রয়োজনে দ্বারস্থ হন অভিজ্ঞ কোচ নজরুল ইসলাম রুমি অথবা বিকেএসপির মেহেদী স্যারের। আর বাকিটা নিজেদের অধ্যবসায়, পরিশ্রম, প্রচেষ্টা আর নৌবাহিনীর সহায়তা।

দেশে ফিরে এই দুই পদকজয়ীও ফেডারেশন কর্তাদের ভাবনার পরিধি বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন নিজেদের ভাষায়। আন্তর্জাতিক মিট এলেই কেবল ১০০ মিটারে সব গুরুত্ব দিয়ে অন্যদের অবহেলার গহ্বরে নিক্ষেপের আদি সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এলেই মিলবে মুক্তি, ফিরবে হারানো জৌলুশ। পাশের দেশ ভারতের উদাহরণ দিয়ে এটাই বোঝাতে চাইলেন জহির, ‘প্রতিবেশী দেশ ভারত কিন্তু ১০০ মিটার ইভেন্টে সীমাবদ্ধ থাকেনি। যে ইভেন্টে ভালো করার সুযোগ থাকছে সেখানেই তারা নজর দিচ্ছে। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনও এখন পুরাতন ভাবনা থেকে বের হয়ে আসবে আশা করছি। কিছু কিছু পরিবর্তন এসেছে। থ্রো-ইভেন্টেও দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে।’ ইমরানুর এবার ব্যর্থ হয়েছেন। তবে তার গতবারের অর্জন দিশা দেখিয়েছে জহিরদের। তাই ইমরানুরের প্রতি কৃতজ্ঞতা ঝরল জহিরের কণ্ঠে, ‘ইমরান ভাইকে অনেক ধন্যবাদ, তিনি প্রথম দেশকে স্বর্ণ এনে দিয়েছেন। তিনি আমাদের উৎসাহিত করেছেন। তাকে দেখে আমরাও নিজেদের প্রস্তুত করেছি। সঠিক অনুশীলন ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে আমরা আরও বড় মঞ্চে ভালো করতে পারব।’

২.১৬ মিটার লাফিয়ে ২০১৯ এসএ গেমসে রুপা জিতেছিলেন মাহফুজ। গেল পাঁচ বছরে ঘরোয়া পর্যায়ে এই ইভেন্টে তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর আর কেউ নেই। ফলে সেরাটা না দিয়েই তিনি ধরে রাখছেন সেরার আসন। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্সে। সুযোগ হয়নি বলে নিজের সেরাটাকে টপকানো হয়নি। তবে এশিয়ান ইনডোরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় ঠিকই লাফিয়েছেন নিজের সেরার কাছাকাছি। দেশে ফিরে তাই আরেকবার সুনজরের দাবি জানালেন তিনি, ‘হাইজাম্পে আমাদের ভালো সম্ভাবনা আছে। সেটা পুরুষ ইভেন্টে যেমন নারী ইভেন্টেও। প্রয়োজন শুধু ভালোমানের প্রশিক্ষণ আর কিছু উন্নত সুযোগ-সুবিধা। এসএ গেমসে যেই রেকর্ড গড়েছিলাম সেটা ভাঙতে পারিনি, কারণ উঁচুমানের কোনো ট্রেইনারের অধীনে দেশে কিংবা বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের সুযোগ পাইনি। সেটা পেলে এতদিনে এশিয়া মানে পৌঁছে যেতাম। হয়তো আরও বড় মঞ্চ থেকে পদক এনে দিতে পারতাম।’

ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রকিব মন্টুর বড় বৈশিষ্ট্য তিনি সবসময় স্রোতে গা ভাসান। এবারও তাই হয়েছে। এখন তিনি ১০০ মিটারের বাইরের ইভেন্টে নজর দেওয়ার কথা ফলাও করে বলছেন। তবে সেটা তিনি ভুলে যাবেন অচিরেই। সামনেই তার ফের বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ। এবার গ্লাসগোতে বিশ্ব ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপে। যেখানে আর কেউ নন, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন কেবল এশিয়ায় ব্যর্থ ইমরানুর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত