ডাক্তারি খতনায় রাজধানীতে দুই শিশুর মৃত্যুতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। তারা তাদের সন্তানদের খতনা করাতে ভয় পাচ্ছেন। অভিভাবকদের অভিযোগ, শিশুর মৃত্যুর পরেও চিকিৎসকরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন না। ভুল চিকিৎসায় শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে।
অন্যদিকে চিকিৎসকরা ঘটনা দুটিকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে দাবি করছেন। তারা বলছেন, এতে ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই’।
নিরাপত্তার কথা ভেবেই অভিভাবকরা এখন হাজামের পরিবর্তে চিকিৎসক দিয়ে খতনা করান। এক সময় গ্রামাঞ্চলে হাজাম দিয়ে খতনা করার প্রচলন থাকলেও এখন তার সংখ্যা কমেছে। আর শহরের অভিভাবকরা পুরোপুুরি ডাক্তারদের ওপর নির্ভরশীল।
রাজধানীতে খতনার সময় দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় অভিভাবকদের দাবি, ডাক্তার ও নার্সদের অবহেলার কারণে এমনটি ঘটছে। মূলত অভিভাবকদের উদ্বেগের কারণ অবশ করার ওষুধ বা অ্যানেস্থেসিয়া নিয়ে। যে দুটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর ক্ষেত্রে পূর্ণ মাত্রার অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনাগুলোতে জড়িতদের বিচার হলে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে বলে অভিভাবকরা মনে করছেন।
এর মধ্যে এন্ডোসকোপি করার সময় রাজধানীর আরেকটি হাসপাতালে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায়ও অ্যানেস্থেসিয়ার বিষয়টি এসেছে।
গত মঙ্গলবার রাতে মালিবাগের জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল সেন্টারে আহনাফ তাহমিন আয়হামকে (১০) খতনা করার ঘণ্টাখানেক পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
অর্থোপেডিক ও ট্রমা সার্জন ডা. এস এম মুক্তাদিরের তত্ত্বাবধানে শিশুটির খতনা করা হয়।
আহনাফের বাবা ফখরুল আলম বলেন, ‘আমরা চিকিৎসককে বলেছিলাম যেন ফুল অ্যানেস্থেসিয়া না দেওয়া হয়। তারপরও আমার ছেলের শরীরে সেটি পুশ করেন ডাক্তার মুক্তাদির। আমার সন্তানকে অ্যানেস্থেসিয়া দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাজী শহীদ-উল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন রোগীকে পুরো অজ্ঞান করা সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। শতকরা হিসাবে সেটা ভগ্নাংশে হলেও, যার জন্য ঘটে তার জন্য এটা শতভাগ। তাই কোনো রোগীকে অজ্ঞান করে অপারেশন করার আগে তার ফিটনেস যাচাই, ঝুঁকি পরিমাপ করা এবং রোগী কিংবা তার পরিবারের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ করা প্রয়োজন। খতনা করানোর সময়ও জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়াই বেশি ব্যবহার করা হয়।’
এর আগে গত ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খতনা করাতে গেলে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আয়ান আহমেদকে অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হয়। জ্ঞান না ফেরায় পরবর্তী সময়ে আয়ানকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে টানা সাতদিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গত ৮ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পরেই ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুই চিকিৎসক ও পরিচালককে আসামি করে রাজধানীর বাড্ডা থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা। এ ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ বি এম শাহজাহান আকন্দ মাসুম জনস্বার্থে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় একটি রিট দায়ের করেন। একই সঙ্গে খতনার জন্য অজ্ঞান করা শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকদের গাফিলতির অভিযোগ তদন্তে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
সর্বশেষ গত ১৫ জানুয়ারি শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে সাতদিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সব অনুমোদিত ও অননুমোদিত হাসপাতাল-ক্লিনিকের তালিকা এক মাসের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
সহকারী অধ্যাপক ডা. কাজী শহীদ-উল আলম আরও বলেন, খতনার জন্য জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার আগে অবশ্যই ঝুঁকিগুলো জেনে নিতে হবে। অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়ার জন্য রোগীর প্রি-অ্যানেস্থেটিক চেকআপ হলো কি না দেখতে হবে। রোগীকে অজ্ঞান করার ৬ ঘণ্টা আগে থেকে শক্ত খাবার এবং ৪ ঘণ্টা আগে থেকে তরল খাবারসহ সব ধরনের খাওয়া বন্ধ করা জরুরি। এ ছাড়া রোগীর জন্মগত হার্ট, ফুসফুস, লিভারের সমস্যা থাকলেও পুরো অজ্ঞান করাটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই যার অপারেশন লাগবে তার জন্য জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়া একমাত্র উপায় নাকি কোনো বিকল্প আছে তা ভেবে দেখা জরুরি।
সাম্প্রতিক ঘটনায় অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘ডাক্তাররা ইচ্ছাকৃতভাবে কখনো রোগীদের মৃত্যু চান না। তবে অনেক সময় হয়তো ভুলবশত কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। সুন্নতে খতনায় ভয় নেই।’
তবে সন্তানকে সুন্নতে খতনা করানোর আগে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আছে কি না তা জেনে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ডা. শহীদ-উল আলম। তিনি বলেন, একইসঙ্গে সন্তানের শারীরিক অবস্থার দিকে খেয়াল রাখতে হবে অভিভাবকদের।
