‘নিয়ন্ত্রণমূলক’ পরিকল্পনা ইসরায়েলের

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৩৯ এএম

গত ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস অতর্কিতভাবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর পর দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হওয়া সংঘাত এখনো থামেনি। ইসরায়েলের চলতি আগ্রাসনে গাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যুসংখ্যা ৩০ হাজার ছুঁই ছুঁই। এখনো যুদ্ধবিরতির কোনো আলামত নেই। এ অবস্থায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন যুদ্ধকালীন জরুরি মন্ত্রিসভায় প্রথমবারের মতো ‘যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা’ নিয়ে পরিকল্পনা উঠে এসেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েল আরও সংহত ভঙ্গিমায় ফিলিস্তিনি ভূখন্ডের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের নীলনকশা প্রস্তুত করেছে।

গতকাল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা নিয়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের পরিকল্পনাটি উপস্থাপন করা হয় ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রীপর্ষদে। এতে বলা হয়, ইসরায়েল জর্ডানের পশ্চিমে সব ভূমি, পশ্চিম তীর ও গাজায় নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র এসব অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠার কথা। ২০০৫ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে গাজা উপত্যকা থেকে সেনা উপস্থিতি সরিয়ে নেয় ইসরায়েল। এরপর ২০০৭ সালে গাজায় হামাসের পরিপূর্ণভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পিএর শাসক ফাতাহকে হটিয়ে দেয় উপত্যকা থেকে। ইসরায়েলের নথির ভাষা অনুযায়ী শঙ্কা তৈরি হচ্ছে, গাজায় আবারও ইসরায়েলি বাহিনীকে দেখা যাবে কি না। নথিতে আবারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়, ইসরায়েল একতরফাভাবে ঘোষিত ‘স্বাধীন ফিলিস্তিন’ মানবে না। তার ভাষ্য, ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, কেবল দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে। উপত্যকাকে নিরস্ত্র করা এবং মৌলবাদী প্রবণতাকে উপড়ে ফেলার মধ্যবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ইসরায়েল। এই ধরনের কর্মতৎপরতা কতদিন ধরে ইসরায়েল চালাবে এবং কীভাবে তা কার্যকর করবে তা নিয়ে ওই নথিতে বিস্তারিত কোনো কথা নেই। নেতানিয়াহু প্রস্তাব দিয়েছেন, গাজা এবং মিসর সীমান্তে ইসরায়েল উপস্থিতি বজায় রাখবে এবং এক্ষেত্রে কায়রো ও ওয়াশিংটনের সহযোগিতা নেবে তেলআবিব। রাফাহ ক্রসিং হয়ে চোরাচালানসহ নানা ধরনের অপৎপরতা রুখতে নজর রাখা হবে।

গাজায় হামাসের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে কারা আসতে পারে, তা নিয়ে নেতানিয়াহুর ভাবনা এ রকম-সেখানে একটি প্রতিনিধিত্বকারী গোষ্ঠী তৈরি করা যেতে পারে যারা সন্ত্রাসী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেযুক্ত নয় এবং ওইসব দেশের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতাও পায় না। আবার ফিলিস্তিনিদের সহায়তার জাতিসংঘ-পরিচালিত শরণার্থী সহযোগিতা সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ বন্ধ করে দিয়ে নতুন একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার প্রস্তাব করেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসা একটি বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রীর নথিটি যুদ্ধকে কেন্দ্র বিদ্যমান লক্ষ্য এবং গাজায় হামাসের শাসন সরিয়ে সেখানে একটি বেসামরিক বিকল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনমতের প্রতিফলন।’ ওই প্রস্তাবটি ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিপর্ষদের সদস্যদের কাছে পরিবেশন করা হয়েছে। এখন এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এদিকে নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা সামনে আসার পর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের মুখপাত্র নাবিল আবু রুদেইনেহ বলেন, ‘নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ব্যর্থতা পর্যবসিত হবে; গাজার ভৌগোলিক ও জনমিতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের ইসরায়েলি পরিকল্পনা আগেও যেভাবে হয়েছে।’ আবু রুদেইনেহ বলেন, ‘বিশ্ব যদি সত্যিকার অর্থে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তিত হয়, তাহলে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল বন্ধ করতে উদ্যোগী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জেরুজালেমকে রাজধানী করে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ ইসরায়েলি যুদ্ধযন্ত্রের ধারাবাহিক নৃশংসতা সব মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় ৩০ হাজার মৃত্যুর মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এ অবস্থায় সাড়া বিশ্বে ফিলিস্তিনপন্থি জনমত এখন তুঙ্গে। কিন্তু ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের প্রতি ধারাবাহিকভাবে নমনীয় মনোভাব পোষণকারী পশ্চিমা বিশ্ব দুই রাষ্ট্র-ভিত্তিক সমাধানের কথা বলছে যা এতদিন কার্যত চাপা পড়ে ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েলের ডানপন্থি রক্ষণশীল সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ফিলিস্তিনিদের সার্বভৌমত্বের অধিকারকে ক্রমাগত এড়িয়ে যাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত