সামরিক পরিচিতিসম্পন্ন ব্যক্তির রাজনীতি করতে কী সমস্যা? কোনো সমস্যা নেই। সামরিক-বেসামরিক সব ব্যক্তিই, নারী বা পুরুষ যে-ই হোন, তিনি তৃতীয় লিঙ্গের হলেও, সাংবিধানিকভাবে তার রাজনীতি করায় সমস্যা নেই বয়স তার আঠারো হলেই হয়।
সামরিক ব্যক্তিদের রাজনীতি করার ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়। সাইমন বলিভারের কথা বলা যেতে পারে। তিনি ছিলেন সামরিক এবং রাজনৈতিক নেতা। বর্তমান ভেনেজুয়েলার নেতা। তার প্রকৃত নাম সাইমন হোসে আন্তনিও দে লা সানতিসিমা ত্রিনিদাদ বলিভার পালাসিওস পিন্ত ই ব্লাঙ্কো। তিনি ছিলেন স্প্যানিশ ক্রিওল; আমেরিকায় (উত্তর, মধ্য, দক্ষিণ) স্পেনীয় বংশোদ্ভূতদের বলা হয় ক্রিওল। বলিভারের সময় আমেরিকা মহাদেশের প্রায় পুরোটা স্পেনীয় সাম্রাজ্যভুক্ত ছিলো। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ ছিলো ব্রিটিশ, ফরাসি ও গর্তুগিজ সাম্রাজ্যের অধীনে। ক্রিওল এক স্পেনীয়র হাতেই আমেরিকায় স্পেনীয় সাম্রাজ্যের অবসান ঘটেছিল। স্প্যানিশ-আমেরিকান স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনাকারী তিনি। বর্তমান কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, পেরু, পানামা এবং বলিভিয়াকে স্পেনীয় সাম্রাজ্য থেকে মুক্ত করেন তিনি। তাকে বলা হয় ‘এল লিবার্তাদর’ বা দ্য লিবারেটর অব আমেরিকা। তার রাজনৈতিক প্রোফাইলও খুব বিচিত্র এবং উঁচু দরের কলম্বিয়া ও বলিভিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট এবং পেরুর চতুর্থ প্রেসিডেন্ট। এ রকম আরও অনেক সামরিক নেতা আছেন যারা রাজনীতিক হিসেবেও নন্দিত এবং বন্দিত। আবার অনেকে নিন্দিতও, কারণ তারা কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। বলিভারের মতোই মার্কিন ইতিহাসে নন্দিত এক চরিত্র জর্জ ওয়াশিংটন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী তার নামে। একটি অঙ্গরাজ্যের নামও তার নামে। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, মিসরের নাসের, সিরিয়ার হাফেজ আল আসাদ, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি, বারকিনা ফাসোর সানকারা সবাই সামরিক নেতা। আরও আছেন ফ্রান্সের দ্য গল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার। তাদের কারও কারও রাজনীতির সঙ্গে দ্বিমতের অবকাশ আছে। আরও কিছু বিশ্বনন্দিত নেতা ছিলেন যারা মূলত রাজনৈতিক নেতা ও রাষ্ট্রীয় বিধিবলে সমর নেতা; প্রায়শ তারা সামরিক পোশাকে থাকতেন।
সামরিক নেতারা যখন অগাস্তো পিনোশের মতো, ফালানজিস্তা বাতিস্তার মতো, আহমেদ সুহার্তোর মতো, আইয়ুব খানের মতো বা মার্কিন দাওয়াইপুষ্ট অথবা স্যান্ডহার্স্ট প্রশিক্ষিত সমরপুঙ্গব হয়ে ওঠেন তখন তাদের নন্দিত জননায়ক হিসেবে গ্রহণ না করে নিন্দিত জনজট মনে করা হয়; সেটাই তাদের নিয়তি, প্রথম পর্যায়ে কিছুকাল জননন্দিত থাকলেও। কারণ তারা রাষ্ট্রের, জনগণের কল্যাণের জন্য আসেন না বরং জনঅকল্যাণই তাদের রাজনীতি। তারা অটোক্র্যাট, তারা স্বৈরাচার; ‘নন্দনকাননে’ তাদের মনোরঞ্জনে নিবেদিত থাকে কিছু পুসিক্যাট। যতক্ষণ জীবিত তাকে ওয়েস্ট পয়েন্ট ও স্যান্ডহার্স্টের দৌলতানায় এবং মৌলবিয়ানায় তারা দিন কাটায়। কারও রাজনীতিই তখন আর তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার গণ্ডিতে থাকে না। এদের কারণে সামন্ত সমাজে বা বিকারগ্রস্ত পুঁজিবাদে ‘বিবাহ’ আর বিবাহ থাকে না, তা হয়ে ওঠে প্রতিপত্তির, আধিপত্যের, দাপটের প্রতিযোগিতার বিষয় বা এক পরিবারকে আরেক পরিবারের ছাপিয়ে যাওয়ার বিষয় এবং কখনো তা একেবারে গিলে ফেলার বিষয়। তৃতীয় বিশে^র আলুপোড়া খাওয়ার মানসিকতাসম্পন্ন ক্ষমতার কারিগরদের এ স্বভাব থাকেই। তাদের কাছে ‘(এনি টাইপ অব) এনগেজমেন্ট’ হচ্ছে আধিপত্য বিস্তারের, ছাপিয়ে যাওয়ার এক নিখুঁত শিল্পচর্চা অথবা শিল্পচর্যা। কাউকে নিকেশ করার চেয়ে উত্তম কোনো প্রক্রিয়ার কথা এর উদ্ভাবক-প্রবর্তক ব্রাহ্মণকুল ভাবতে পারে না। এ সমর নেতারা সেই ব্রাহ্মণকুলের তথা উচ্চবংশীয় প্রতিনিধি। নিকেশন একটি নিরেট নিপাট ভূমিজাত ভারতীয় প্রক্রিয়া ইনডিজেনাস টুল বা মেথড। পাকিস্তান যতই ভারতবিরোধী জিকির করুক, ভারতীয় উপমহাদেশে তার অস্তিত্বের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। নিকেশনে নিবেশন তারও আছে। অর্থাৎ পাকিস্তানের কনস্ট্রিকটর (পেষণকারী) জেনারেলরা ভূমিজ ‘প্রযুক্তি’তে নিকেশনও করেন।
ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখে সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল পাকিস্তানে। পাকিস্তান এ উপমহাদেশের অনন্য এক মিথ, জন্মের কাল থেকেই। আরব্য মরুস্বর্গের উপমায় বিদ্যমান থেকেও ভারতীয় নিকেশনমার্গীয় স্বপনে তার নিত্য বসবাস। দেশটির আছে বিলাতি মডেলের এক ক্যাপ্টেনসি জেনারেল। পাকিস্তানের জেনারেলরা একেকজন ক্যাপ্টেন জেনারেল, যেমন এখনো ব্রিটেনের রাজা কিংবা রানী কোনো কোনো কোরের বা রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন জেনারেল; ইদানীং যদিও তা আলংকারিক পদ, তবে একসময় তা সত্যি পদই ছিল। আর চিলিতে সামরিক শাসক অগাস্তো পিনোশে ছিলেন ক্যাপ্টেন জেনারেল। চিলির সামরিক বাহিনীতে এ পদটি এখনো আছে। অনেক দেশের সামরিক বাহিনীতে ক্যাপ্টেন জেনারেল মার্শাল বা ফিল্ড মার্শালের সমতুল্য। স্যান্ডহার্স্টের এ অলংকার-আলুর ব্যাপক চাষ হয় এবং ভারতীয় উপমহাদেশের সমরপুঙ্গবরা সেখানে পুনরোপিত হয়ে সালংকৃত আলু হয়ে জন্মান। তারপর সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশটিতে মার্কিন মুল্লুকের আশীর্বাদধন্য হয়ে ‘ফিল্ড মার্শাল জেনারেল’ হয়ে ওঠেন। তারপর তারা আরব্য খোয়াবনামায় জারিত হয়ে ‘এডমিরাল জেনারেল আলাদিন’ হয়ে ওঠেন দ্য সুপ্রিমো অব দ্য রিপাবলিক অব ওয়াদিয়া। সামরিক বাহিনীর মনঃপূত না হওয়ার কারণেই ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রিত্ব হারাতে হয়েছিল। বরাবরের মতো বাহ্য একটা কারণও ছিল, আর সেটা হচ্ছে এক জুনিয়র কোয়ালিশন পার্টনার তাকে ছেড়ে গিয়েছিল আর ইমরান গদি হারিয়েছিলেন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কখনো অযৌক্তিক কাজ করে না; তাদের যুক্তি অকাট্য, হিসাব খুব পাকা। অন্দরের কথা হলো, জুনিয়র পার্টনারটি সামরিক বেরাদরের ইশারাতেই সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তারও অন্দরের অন্দরকথা হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন প্রভুদের কথামতো রাশিয়ার নিন্দা জানাননি ইমরান। তার চেয়েও বড় অপরাধ এসসিও-ব্রিকসের সঙ্গে দহরম-মহরম, যা মার্কিনিদের একেবারেই মনঃপূত নয়। ফলে সামরিক বাহিনী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুগপৎ সমীকরণের কল্পফল এক জায়গায় এসে দাঁড়াল। জন্মের পর থেকেই সেন্টো-সিয়াটোর সূত্রে পাকিস্তান কার্যত মার্কিনিদের ক্রীতদাস। ইমরান খানকে ঠোঙার মতো ছুড়ে ফেলতে পাকসেনাদের তথা পাকিস্তানের ক্যাপ্টেনসি জেনারেলের এতটুকুও বেগ পেতে হয়নি। ইমরান খানের আরও একটি অপরাধ ছিল, তিনি বলে ফেলেছিলেন একাত্তর সালে সেনাদের ভুলের মাশুল হচ্ছে বাংলাদেশ; বাংলাদেশের কাছে সেনাদের কৃতকর্মের জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিত। ক্ষমতায় টিকে থাকলে ভুল শোধরানোর কাজটি তিনি করে ফেলেন কি না সে ভয়ও সামরিক বাহিনীর ছিল। অতএব তার বিদায় তার ভাগ্যেরই লিখন!
এবার নির্বাচনে এত যে ঘটনা ঘটল এবং ঘটছে তার মূল কারণ ইমরান খানকে ঠেকাতে হবে। তার প্রার্থিতা বাতিল করা থেকে শুরু করে তার দল পিটিআইকে নিজস্ব নির্বাচনী প্রতীকে নির্বাচন করতে না দেওয়া সবই করা হয়েছে ইমরানকে অপাঙ্ক্তেয় করে তোলার জন্য। কিন্তু তা করা গেল না। অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন ইমরান খান এবং তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিয়া নওয়াজ শরিফকে লন্ডনের নির্বাসন থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল সামরিক বাহিনীর উদ্যোগেই। তাদের খায়েশ ছিল আবার তাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানানো। তার ছোট ভাই শেহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েও ক্যাপ্টেনসি জেনারেলের সন্তুষ্টি অর্জিত হচ্ছিল না। রাজনীতির খেলায় তারা বরাবরই শকুনিমামার ভূমিকায় ছিলেন এবং ধারণা করা যায় তারা যত দিন সম্ভব তা-ই থাকবেন। পাকিস্তানের জন্মের ঋণ শোধ করার জন্যই তারা আছেন এবং হয়তো থাকবেন, যত দিন না গণেশ উল্টে যাচ্ছে। আর গণেশকে ওল্টাতে পারে একমাত্র গণেশ তথা গণপতি তথা জনগণ। গণেশের আরেক নাম জননায়ক অথবা বিনায়ক। নির্বাচনটা হয়ে গেল ঠিকই তবে প্রায় দুই সপ্তাহেও নির্বাচন-নাটিকা সামরিক দেবদূতদের পরিকল্পনামাফিক হলো না। মঞ্চায়নটি পাক-পানিতে তথা পবিত্র জলে স্নাত হচ্ছে না। ফলে এখনো পাকিস্তানের রাজনীতির বাপ্তিস্মকরণ ঠিকঠাক মতো হচ্ছে না। পবিত্র জলে নর্দমার পানি ঢুকে গেছে। কারণ নির্বাচনে ইমরান খানের ‘এতিম’ প্রার্থীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বাজিমাত করে দিয়েছেন; তারা ভূতশাসকদের জন্য নানা বিব্রতকর (এবং হাস্যকর) প্রতীক নিয়ে ৯৩টি আসনে জিতেছেন। তারা তাদের দাবি অনুযায়ী ১৫১টি আসনে জিতেছেন। তারা যাতে দাবিকৃত আসনে জয়ী হতে না পারেন সেজন্য নির্বাচনের ফলাফল দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা হয়েছে। নির্বাচন চলাকালে ফোন, ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে। এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছিল বাংলাদেশে, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে স্বৈরশাসক লে. জে. অব. এরশাদ সে কাজটি করেছিলেন। অর্ধেক আসনের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গেল বিরোধী দল (তাও আবার খণ্ডিত) জিতে যাচ্ছে। তখন ফল ঘোষণা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘক্ষণ ফল ঘোষণার নাম নেই। যখন ঘোষণা দেওয়া হলো তখন দেখা গেল স্বৈরতন্ত্র জয়ী হয়েছে।
তেমনই একটি ভৌতিক হিসাব এবার পাকিস্তানের নির্বাচনে ঘোষণার আঞ্জাম করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিংহভাগ আসনে বেয়াড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরই জয়ী দেখাতে হলো। আর পেয়ারের মিয়াজির দল পেল ৭৪টি অনুকম্পাযুক্ত আসন। আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দল পেল ৫৪টি আসন, সেগুলোতেও অনুকম্পার প্রলেপ মাখানো ছিল। ফল ঘোষণার পর প্রথমে বলা হলো, মিয়াজি প্রধানমন্ত্রী হবেন। দোসরা বিরোধী দল বলল, তাদের ‘কচি গঙ্গাধর’ প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং ভাগের মায়ের আগার অংশটুকু তাদের চাই। জটে পড়ে সব গুবলেট হওয়ার দশা। জটে একটা চাল চেলে দিল ৭৪-ধারীর দল। তারা পাকিস্তানের ‘মি. টেন পার্সেন্ট’-কে প্রেসিডেন্ট করার ব্যবস্থা করে ফেলল, মানে সেনাবাহিনী মি. টেন পার্সেন্ট-এর জিম্মাদার হলো। আর তাদের ‘কচি গঙ্গাধর’ প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবি থেকে পিছু হটল। মিয়াজির প্রধানমন্ত্রিত্ব যখন পাকা তখন তার দল ও জোট বলল, না না মিয়াজির ছোট ভাই প্রধানমন্ত্রী হবেন। নাটিকা শতরূপা’র শত দল পাখা মেলতে শুরু করল। তখন স্বতন্ত্র ‘কুসন্তানরা’ প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়ব না বলে মি. ডেভেলপমেন্টের নাতিকে সামনে হাজির করল।
বাংলাদেশে নির্বাচনের ফল দীর্ঘায়িত করার জন্য ১৯৮৬ সালে যে সিনেমাটি সম্প্রচার করা হয়েছিল তার নাম ছিল ‘হীরক রাজার দেশে’। এবার হীরকের রাজা, যিনি কিনা ভগবান, পাকিস্তানে যন্তরমন্তর মারফত হাজির হয়ে বললেন দেখো, সব একাকার জমিন ও আসমান। এবারের ভোটে পাকিস্তানের জমিন ও আসমান একাকার হয়ে গেল। নির্বাচনের প্রায় দেড় সপ্তাহ পরেও একাকার জমিন ও আসমানে কাউকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে না। উল্টো আরও বিকট এবং অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। রচিত হচ্ছে ভূতের ভবিষ্যৎ। আবার না ক্যাপ্টেনসি জেনারেল বলে বসেন, ‘আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না, আমরা এসে গেছি।’
লেখকঃ সাংবাদিক
