ব্যাংকঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সুদের হার সাড়ে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। এতে চাপে আছেন উদ্যোক্তারা। তবে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করতে (চেইন কোল্ড ) হিমাগার খাতে বিনিয়োগ এলে তাতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে বিনিয়োগকারীকে সহযোগিতা দেবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।
গতকাল বুধবার ‘কোল্ড চেইন ইনভেস্টমেন্ট কনফারেন্স ২০২৪’ শীর্ষক বিনিয়োগ সম্মেলনের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার-এর বাংলাদেশে ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন প্রজেক্ট (বিটিএফ) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে সংস্থাটির মাল্টিপারপাস হলে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা বলেন, ‘দেশে এখন বিনিয়োগের জন্য একটি সমস্যা হচ্ছে সুদহার বৃদ্ধি। আমরা বিনিয়োগকারীদের বলেছিলাম ব্যাংকঋণের সুদের হার কমে আসবে। কিন্তু এখন সেই সুদহার কমেনি, উল্টো বেড়েছে।
তিনি বলেন, এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস থেকে (আমাদের) জানানো হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের একটা বিশেষ সুযোগ তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের সুযোগ নিতে আমরা সংশ্লিষ্ট বন্ধুদের সঙ্গে বসে ঠিক করব তাদের আমরা বিশেষ করে চেইন কোল্ড স্টোরেজ খাতে বিনিয়োগে সুদহারে কীভাবে ভর্তুকি দিয়ে সহযোগিতা করতে পারি।’
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে বিনিয়োগের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সুদহার। কিন্তু আমার মনে হয় এই সমস্যা এভাবেই সমাধান করতে হবে।
কয়েক বছর আগে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদহার নয়ছয় করা হয়। সম্প্রতি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের পরামর্শে সেই সুদহার গত জুন মাসে তুলে দেওয়া হয়। এখন ব্যাংক সুদহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য নির্ধারিত ব্যাংকঋণের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
সালমান এফ রহমান বলেন, প্রতি বছর দেশে যে বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য নষ্ট হচ্ছে তা যদি আমরা চেইন হিমাগার তৈরি করে রক্ষা করতে পারি তাহলে আমি শতভাগ নিশ্চিত যে আমাদের রপ্তানি বৈচিত্র্য অবশ্যই বাড়বে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, প্রতি বছর আমাদের বিপুল কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।’
অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কৃষি বিনিয়োগ পরামর্শক সংস্থা লিক্সক্যাপ অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড ক্যাপিটাল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক উইলিয়াম ফেলোস মূল প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২০ থেকে ৪৪ শতাংশ ফল ও শাকসবজি নষ্ট হচ্ছে। ফলে আনুমানিক বার্ষিক ২৪০ কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়। কোল্ড চেইন লজিস্টিকসে বিনিয়োগ ফসল-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে এবং বাংলাদেশকে আমদানি করা খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে পারে।
তিনি বলেন, কৃষি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লজিস্টিক ব্যবসা হিসেবে পরিবহন, গ্রেডিং, লেবেল এবং প্যাকেজিংয়ের মতো পরিষেবার শিল্প গড়ে উঠবে। ২০৩১ সালের মধ্যে এই পরিষেবায় ৪৪ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
ফেলোস বলেন, বাংলাদেশে পেঁয়াজ ও আলু আমদানি করতে হয়। অথচ দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ ও আলু সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় বিপুল পণ্য নষ্ট হয়। যদি হিমাগার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা যেত তাহলে বাংলাদেশের পেঁয়াজ এবং আলু আর আমদানির প্রয়োজন হতো না।
অনুষ্ঠানে মার্কিন দূতাবাসের কৃষি সার্ভিস অ্যাটাশে সারাহ গিলেস্কি বলেন, বাংলাদেশে একটা মিডল ক্লাস তৈরি হয়েছে। এর ফলে এখানে বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। এই বাজার ধরার জন্য এ খাতে বিনিয়োগের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ও পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশ-এর প্রধান নির্বাহী মাশরুর রিয়াজ বলেন, দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য আমদানি শুল্ক কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘ভিয়েতনামের তুলনায় আমাদের দেশে ৩ গুণ আমদানি শুল্ক নেওয়া হয়। এতে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবেন।’
এছাড়াও মসৃণ প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার ও প্রধান প্রধান রপ্তানিপণ্য উৎপাদনের পাশেই কন্টেইনার প্রক্রিয়াকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
