মনের ভাব প্রকাশের জন্য, কিংবা প্রকাশ্যে ব্যক্ত করার সুযোগ কম এমন অনেক বক্তব্য প্রকাশের জন্য ক্যানভাসের বাইরে, বিশেষ করে দেয়ালে যে উন্মুক্ত শিল্পকলা কারা যেন করে যায়। কারা যেন করে এই কারণে বলছি, কারণ সে সমস্ত শিল্পীদের নামও আমাদের জানা হয় না। ক্যানভাসের শিল্পীর নাম ক্যানভাসের কোনায় ছোট করে লেখা থাকে। ক্যানভাসের কোনায় শিল্পীর একটি স্বাক্ষর থাকে। ভাস্কর্যশিল্পেও শিল্পীর নাম ভাস্কর্যের পাদদেশে বা কোথাও না কোথাও একটি স্বাক্ষর থাকে। যারা গান গায় তাদের নাম আমরা জানি। যারা অভিনয় করেন তাদের তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। নৃত্যশিল্পীদেরও আমরা দেখতে পাই। কে নৃত্য পরিবেশন করলেন তাকে চিনতেই পারলাম না এমন কিন্তু হয় না। কে কবিতা লিখল চিনতেই পারলাম এমন হয় না। পত্রিকায় প্রকাশিত হোক আর বইয়েই প্রকাশিত হোক কবির নাম সেখানে থাকে। কিন্তু শহরের বিভিন্ন দেয়ালে, গঞ্জের দেয়ালে, গ্রামের দেয়ালে শিল্পকলার আঁচড় দেখতে পাওয়া যায়। এসবকে হয়তো শিল্পকলার পদমর্যাদা দিয়ে দেখা হয়নি এতকাল। শিল্পকলায় শিল্পীর স্বাক্ষর থেকে যায় সবভাষায়, সবদেশে, সবসময়। কিন্তু গ্রাফিতি আর্টের ক্ষেত্রে এটা (শিল্পীর নাম, স্বাক্ষর) দেখা যায় না। আমি এই আলোচনায় বিদেশের গ্রাফিতি আর্টের প্রসঙ্গ আনছি না। বাংলাদেশের গ্রাফিতি আর্ট, উন্মুক্ত শিল্পকলা এগুলোতেই আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখছি। গ্রাফিতি আর্ট বেশ রহস্যময়, কারা যেন এঁকে গেল। একটু ছবি, একটু লেখা। সবার উদ্দেশ্যে কিছু বলা। কিন্তু কারা এটা লিখেছেন, এঁকেছেন তা সাধারণত আমরা চিনি না। জানতে পারি না। বাংলাদেশেও গ্রাফিতি আর্টের রেওয়াজ চালু আছে। কিন্তু এই গ্রাফিতি আর্টকে গ্রাফিতি আর্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি এতকাল। আর্টের এই উন্মুক্ত প্রদর্শনীকে এই শব্দবন্ধের (গ্রাফিতি আর্ট) আওতায় আমরা দেখিনি। আমরা গত শতাব্দীর ষাটের দশকে, পঞ্চাশের দশকে ঢাকার দেয়ালে আর্টের যে ব্যবহার দেখেছি তা হলো, মুষ্টিবদ্ধ হাত। ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদের আন্দোলনে সেই গ্রাফিতি আর্টের একটা বড় ভূমিকা আছে। বায়ান্ন সালের একুশের ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে একটি সামষ্টিক চেতনার জন্ম নিল সেখানেও গ্রাফিতি আর্টের ভূমিকা আছে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। কখনো দেখা গেছে একটু কাব্যময়তার মধ্য দিয়েও তার প্রকাশ ঘটেছে। পলাশ শিমুল ফুটেছে আর তার মধ্য দিয়ে বাংলাভাষা উঁকি দিচ্ছে এই মর্মে পদ্য বা শহীদ মিনারের ছবি বা গণমানুষের মুখাকৃতি ইত্যাদি দেখেছি। এগুলো গ্রাফিতি আর্টের রাজনৈতিক ব্যবহার হিসেবে আমরা ধরতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, মুক্তিযুদ্ধের পরে রাজনৈতিক চর্চার দেয়ালে এগুলো আমরা খুব বেশি দেখলাম। বিশেষ করে ঢাকা শহরে ও ঢাকা শহরের বাইরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের দেয়ালে রাজনৈতিক দল যেমন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট ইতাদির পক্ষ থেকে তাদের মতাদর্শের বক্তব্যগুলো এসব দেয়ালে শোভা পেতে থাকল। এগুলো গ্রাফিতি আর্ট না হলেও উন্মুক্ত শিল্পকলার প্রদর্শন হিসেবে কিছুটা হলেও ভাবা যায়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলি। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি, নব্বইয়ের দশকে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের দেয়ালে লেখা দেখেছি ‘অপেক্ষায় আছি-নাজির’। নাজির নামের ব্যক্তি কে, আমরা জানি না। সে কারও অপেক্ষায় আছে। সে কথা ঢাকার লালবাগ, রমনা, শাহবাগ, ধানম-ির যে কোনো জায়গার ফাঁকা দেওয়ালে শোভা পেতে থাকল। আবার কিছুদিন পরে দেখা গেল ‘কষ্টে আছি-আইজুদ্দিন’। কে সেই নাজির আর কে সেই আইজুদ্দিন জানা হলো না। সেগুলো স্মৃতিতেই রয়ে গেছে। এই ‘কষ্টে আছি-আইজুদ্দিন’ ও ‘অপেক্ষায়-নাজির’ এখানে তবু নাম পাওয়া গেল কিন্তু নাম নেই ছবি আছে বক্তব্য আছে, তীব্রতার সঙ্গে আছে তীব্র অবদমন থেকে এমন গ্রাফিতি চিত্র দেখি আমরা বাংলাদেশের গণ টয়লেটে। সেখানে বক্তব্য আছে, যৌনাঙ্গের ছবি আঁকা আছে। এগুলোকে শিল্পকলার পদমর্যাদা দিয়ে দেখলে বাংলার গ্রাফিতি চিত্র বলে পরিগণিত হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণশৌচাগার বিশেষ করে ছাত্রাবাসের গণশৌচাগারের দরজায়, দেয়ালে এই উন্মুক্ত প্রদর্শনী বেশি দেখা যায়। আমি চারুকলার শিক্ষার্থী ছিলাম। আমি চারুকলার টয়লেটে দেখেছি। আমার ধারণা এই টয়লেটের উন্মুক্ত প্রদর্শনীর শিল্পীরা চারুকলার শিক্ষার্থী হওয়ায় তাদের হাতে পেন্সিল ছিল, তারা তাদের প্রাকৃতিক কর্ম সম্পন্ন করার সময় এই শিল্প রচনা করেছেন। কে কার উদ্দেশ্যে করেছে তা আমরা জানি না এক ধরনের অবদমন থেকে তারা এই কাজটি করেছে তা আমরা বুঝতে পারি। এই গণশৌচাগারের উন্মুক্ত শিল্পকলাকে গ্রাফিতি পদবাচ্য না করা, গ্রাফিতির আওতায় না দেখাটা ভুল হবে। কারণ ভবিষ্যতে কেউ না কেউ এটাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করবেই। এ প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করি, বুননচিত্র আমাদের শিল্পের একটি বড় শাখা। রশীদ চৌধুরী এই শাখায় আমাদের একজন বড় শিল্পী। বুননচিত্র বহুদেশেই হয়। তাদের সম্মান করা হয়। অর্থ উপার্জিত হয়। তাহলে বাংলাদেশের মায়েরা যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাঁথা সেলাই করল, বুননচিত্র তৈরি করল সেগুলো কেন স্বীকৃতি পেল না? জসীমউদ্্দীন নকশী কাঁথার মাঠে লিখেছেন। কিন্তু এই নকশী কাঁথার মাঠের শিল্পীরা তাদের স্বীকৃতি পেলেন না। না তাদের পরিবারের সদস্যরা এ স্বীকৃতি দিল, না দিল পরিবারের বাইরের আমাদের বিশিষ্টজনরা। এখনো গ্রামাঞ্চল থেকে আমাদের রাজধানীতে সুন্দর সুন্দর নকশী কাঁথা আসছে, কিন্তু সেখানে কোনো শিল্পীর নাম নেই। দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে শিল্পকলা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এভাবে। এখন আমরা শহুরে ট্যাপিস্ট্রি দেখে অনুভব করছি, অনুতাপ করছি, আহা! এতদিন কেন আমাদের মায়েদের, নানিদের শিল্পকলাকে স্বীকৃতি দিলাম না। তারা তো আরও কষ্ট করে এটি করেছেন। শহুরে ট্যাপিস্ট্রি শিল্পীর হাতে টুলস বেশি। আর তারা (নকশী কাঁথা সেলাইকারী নারী) শুধু সুই সুতো দিয়ে কাজটি করেছেন। কত জীবনগল্পই না তারা সুই সুতো দিয়ে বুনেছেন কাঁথায়। তারা বঞ্চিত হয়েছেন আমাদের অজ্ঞতার কারণে। আমি মনে করি, এই টয়লেটের দরজায় ও দেয়ালে যে শিল্পকলা রচিত হয়েছে ও হচ্ছে এগুলোও গ্রাফিতি আর্টের স্বীকৃতি না দিলে অন্যায় হবে। তাহলে সত্য গোপন করা হবে। আমাদের অবশ্য সত্য গোপন করার চর্চা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই করা হয় শিক্ষালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু এই চর্চা থেকে তো বেরিয়েও আসতে হবে। সত্য গোপনের চর্চা থেকে বেরিয়ে আসার আমার ব্যক্তিগত পদক্ষেপ হিসেবে আমি এই বক্তব্য পেশ করছি।
আরেকটি গ্রাফিতি আর্টের কথা বলে আমার বক্তব্য শেষ করব, আরও তীব্রভাবে একটি গ্রাফিতি আর্টের মুহুর্মুহু ব্যবহার আমরা ঢাকায়, ঢাকায় বাইরে দেখলাম। এমনকি সেটি কলকাতায়ও ছড়িয়ে গেল। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না’। সুবোধ নামের একটি চরিত্র দেয়ালে হাজির হলো। সে উদ্ভান্ত, দিশেহারা, ভীত। ক্ষুধার্তও দেখা যাচ্ছে কিছুটা। শরীরটা যেন ভেঙেচুরে যাওয়া। দেয়ালে আঁকানো মানুষটি যেন পালিয়ে যায় কারণ সময় তার পক্ষে না। এমন একটি বক্তব্য সংবলিত গ্রাফিতি শিল্প ২০১৬ সালের দিকে ব্যাপকহারে ঢাকা শহরে চোখে পড়তে শুরু করল। রেডিও, টেলিভিশনে টকশো শুরু হলো, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলো। কে এই সুবোধ, কেন তাকে পালিয়ে যেতে বলা হচ্ছে এই প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল টকশোতে। কারা এই গ্রাফিতি করে গেল ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে। সুবোধ গ্রাফিতির শিল্পী কে বা কারা তার অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল ২০১৬ সাল থেকে। আজও আমরা তা জানতে পারিনি। কিন্তু একটা কিছু বলার চেষ্টা ছিল তা আমরা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি। আরেকটি গ্রাফিতি চোখে পড়েছিল, কায়দা করে বেঁচে থাকো’। আরেকটি গ্রাফিতি যার বক্তব্য আমার খুবই ভালো লেগেছিল। ঢাকা শহরের বেশ কয়েক জায়গায় আমার চোখে পড়েছিল, ৯৫ বনাম ৫, লড়াই করে বাঁচ’। কী ঝাঁঝালো বক্তব্য! পঁচানব্বই জনের বিরুদ্ধে পাঁচজনের দাঁড়ানোর জন্য সাহস জোগাচ্ছে এই গ্রাফিতি শিল্প।
এখন আমরা যদি আবার সুবোধ গ্রাফিতির দিকে ফিরি তাহলে কী দেখব? ১৯৯৫ সালে একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পটির লেখক শহীদুল জহির। গল্পের নাম, মনোজগতের কাঁটা। সেই গল্পে সুবোধচন্দ্র দাস নামে একটি চরিত্র আছে। সেই চরিত্রকে গল্পের শুরুতে দেখা যায় ১৯৮৯-’৯০ সালে। আবার দেখা যায় ১৯৭১ সালে। তারপর আবার দেখা যায় যে ১৯৬৪ সালে আরেকটি সুবোধচন্দ্র ছিল। তিন সুবোধের স্ত্রীর নামই স্বপ্না রানী দাস। প্রত্যেক সুবোধেরই একজন করে ভাই আছে, নাম পরান, সে গ্রামে থাকে। তিন সুবোধের জীবনেই এমন একটি সময় আসে যখন তাকে বউসহ মরতে হয়। তিনটি ঘটনার পেছনেই উপমহাদেশীয় বড় রাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান ছিল। যদিও সুবোধ-স্বপ্না (রা) ছিল নিতান্তই ছা-পোষা মানুষ। গ্রাম থেকে শহরে এসে ছা-পোষা জীবনযাপন করছিল। কিন্তু তারপরও তাদের মরতে হলো। কেন মরতে হলো? তো সুবোধকে নিয়ে ২০১৬-১৭ সালে গ্রাফিতি চিত্র দেখলাম ঢাকার দেয়ালে। এই সুবোধকে একটি সিনেমায় দেখা যাবে শিগগিরই, সিনেমার নাম কাঁটা। গ্রাফিতি চিত্রের একটি চরিত্র সুবোধচন্দ্র দাস।
কিন্তু কে নাজির, কে সেই আইজুদ্দিন, বা টয়লেটের শিল্পকলার শিল্লী তাদের আমরা জানি না। এই শিল্পীদের গ্রাফিতির যে বক্তব্য তা বইয়ে প্রকাশ করা যাচ্ছে না বা ক্যানভাসে আঁকা যাচ্ছে না। তাই সেগুলো দেয়ালে উঠে আসছে, দেখতে পাচ্ছি।
আরেকটি কথা বলে আমি আমার আলোচনা শেষ করব। আমরা দেখলাম দেয়ালে তো গ্রাফিতি চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আলো বাতাসে এ দেশের সাধারণ মানুষের যে হাহাকার ছড়িয়ে রয়েছে সেগুলো তো দেয়ালেও নেই, বইয়েও নেই। কিন্তু এ দেশের আলো বাতাস যদি স্ক্যান করা হয়, তাহলে পাওয়া যাবে অধিকাংশ মানুষকে বঞ্চিত করে কিছু মানুষের ভালো থাকার ইতিহাস এবং এর ফলে বঞ্চিত সেই সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত আর্তিময় শ্বাস-প্রশ্বাস। সেই আর্তনাদই কখনো কখনো পুঞ্জীভূত হয়ে দেয়ালিকা, গ্রাফিতি চিত্র হয়ে মানুষকে মানুষের মুখোমুখি করে দেয়। আমি চাই এই চর্চা আরও বাড়ুক। মানুষ মানুষের মুখোমুখি হোক!
লেখক : কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
অনুলিখন : এনাম-উজ-জামান বিপুল