নীল নদের বার্ষিক বন্যায় মিসরের বাদশাহ হাকিম (৯৯৬-১০২১) খুবই অস্থির ও বিপর্যস্ত ছিলেন। তিনি একজন বিজ্ঞানীকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি বের করার নির্দেশ দেন। তখন ওই বিজ্ঞানী বসরায় ছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, নীল নদের বন্যার পানি পুকুর ও খাল দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে এবং সেই পানি গ্রীষ্মে ব্যবহারও করা যেতে পারে। এই পরামর্শের ভিত্তিতে সেই বিজ্ঞানী কায়রোতে আসেন এবং তিনি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা তৈরি করে কাজ শুরুর পর বুঝতে পারেন, তখনকার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দিয়ে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ, বাঁধ প্রকৌশল বিষয়ে তার অধ্যয়ন ও অনুমান কার্যত সম্ভব নয়। তাই সেই পরিকল্পনা থেকে তাকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। কিন্তু মিসরের আততায়ী শাসকের কাছে তার ভুল স্বীকার করা নিজের গলায় ফাঁস দেওয়ার মতো ছিল। অগত্যা শাসকের ক্রোধ এড়াতে তিনি পাগলের ভান ধরেন।
এমতাবস্থায় বাদশাহ হাকিম তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে কারারুদ্ধ করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি এটিই আশা করেছিলেন। যাতে আততায়ী শাসকের হাত থেকে মুক্ত হতে পারেন। তিনি কারারুদ্ধ থাকাবস্থায় একাকিত্ব এবং অধ্যয়নের জন্য প্রচুর সুযোগ লাভ করেন। দীর্ঘ দশ বছর পর মিসরের বাদশাহ হাকিম মারা গেলে সেই বিজ্ঞানী বন্দিশালা থেকে মুক্তি পান। অতঃপর তিনি মিসর থেকে বাগদাদে ফিরে আসেন। এই কারারুদ্ধ সময়ের মধ্যে তিনি বেশ কয়েকটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। যা তাকে বিশ্বের প্রথম বিখ্যাত ভিজ্যুয়াল (আলোকবিদ্যা) বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। সেই থেকে তাকে আলোকবিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
সেই বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর কেউ নন, তিনি হলেন ইবনে আল-হাইসাম। কিন্তু ল্যাটিন ভাষায় তাকে বিকৃত করে লেখা হয় ‘আল হ্যাজেন’ নামে। তিনি কারারুদ্ধকালে দশ বছরে পদার্থবিদ্যা ও গণিতের শতাধিক নীতি, সূত্র ও তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। এছাড়াও জগদ্বিখ্যাত বই ‘বুক অব অপটিক্স’ তিনি কারাবন্দি অবস্থাতেই রচনা করেছিলেন।
আমরা সবাই জানি, আইজ্যাক নিউটন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ছিলেন। বিশেষ করে পদার্থ বিজ্ঞানের জগতে তার আবিষ্কার অতুলনীয়। আইজ্যাক নিউটন আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের আবিষ্কারক হিসেবেও পরিচিত। মহাকর্ষ ও গতির সূত্র ছাড়াও লেন্স ও প্রিজম নিয়েও তিনি বিস্ময়কর সব তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। আমরা সবাই স্কুল, কলেজ ও ভার্সিটির দিনগুলোতে তার আবিষ্কৃত ভিজ্যুয়ালের সূত্রগুলো অধ্যয়ন করেছি।
আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে তার আবিষ্কৃত এসব সূত্র পড়েছি যে, আলো যখন প্রিজমের মধ্য দিয়ে যায়, তখন এটি সাত রঙের রঙধনুতে বিভক্ত হয়। কিন্তু চিরসত্য ও বাস্তবতা হলো, নিউটন তার এসব তত্ত্ব অধ্যয়নের জন্য একজন মুসলিম বিজ্ঞানীর আবিষ্কারের সহায়তা নিয়েছিলেন। যিনি নিউটনের ৭০০ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বিশেষ করে যখন বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হয়, তখন এ বিষয়টিকে সত্য বলে আখ্যায়িত করা হয় যে, রোমান সাম্রাজ্যের পতন এবং আধুনিক ইউরোপের নবজাগরণের মধ্যবর্তী সময়ে কোনো বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ঘটেনি। তবে এটি একটি সম্পূর্ণ মিথ্যাচার, এক তরফা এবং ভুল ইতিহাস।
উল্লেখ্য, উক্ত সময়কালে ইউরোপে অন্ধকার যুগ ছিল বলেই কি সমগ্র বিশ্বও জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশের ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় ছিল? চিরসত্য হলো, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ইউরোপ ছাড়া বিশ্বের অন্যত্রও হয়েছে। আমরা যদি আরব ভূখণ্ডের কথা বলি, নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের স্বর্ণযুগ বলা হয়। উক্ত শতাব্দীতে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসা, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন ও দর্শনবিদ্যাসহ বিজ্ঞানের সব শাখা-প্রশাখায় ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। উক্ত শতাব্দীতে অনেক স্কলার ও বিজ্ঞানীর মধ্যে ইবনে আল-হাইসাম হলেন বিশ্বের অন্যতম প্রথম ও শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। যার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ছিল জগদ্বিখ্যাত ও সর্বশ্রেষ্ঠ। তার পুরো নাম আবু আলি আল-হাসান ইবনে আল-হাইসাম। তিনি ৯৬৫ সালে ইরাকে জন্মগ্রহণ করেন। তাকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাধারণত বিবেচনা করা হয় যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্যে ঘটনাসমূহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, নতুন তথ্য-উপাত্ত অর্জন করা, বিদ্যমান তথ্য সংশোধন বা পর্যবেক্ষণ করা, পরিমাপের সংখ্যা ও গণনার ওপর ভিত্তি করে এটিকে পুনঃনিশ্চিত করাসহ অনুমানসমূহ খণ্ডন বা নিশ্চিত করা এবং ডেটা সংগ্রহ করা ইত্যাদি। বৈজ্ঞানিক গবেষণার এই পদ্ধতিটি ১৭ শতকে ফ্রান্সিস বেকন এবং রেনে ডেকার্ট বিন্যস্ত করেছিলেন। কিন্তু ইবনে আল-হাইসাম ছিলেন তাদের চেয়েও অনেক এগিয়ে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ইবনে আল-হাইসামই ছিলেন বিশ্বের প্রথম সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী।
ইবনে আল-হাইসামই প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে আমরা দেখি। তিনি তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, প্লেটো, ইউক্লিড ও টলেমি দ্বারা প্রণীত নির্গমন তত্ত্ব ভুল ছিল।
ইবনে আল-হাইসাম প্রমাণ করেছেন, আমরা এজন্য দেখি যে, আলো আমাদের চোখে প্রবেশ করে। একথা প্রমাণ করার জন্য তিনি গাণিতিক সূত্রের আশ্রয় নিয়েছেন। এজন্য তাকে প্রথম তাত্ত্বিক পদার্থবিদও বলা হয়। তিনি পিনহোল ক্যামেরা আবিষ্কারের জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত। তার আলোর প্রতিসরণ সূত্র আবিষ্কারের কৃতিত্বও সর্বজনীন স্বীকার্য।
ইবনে আল-হাইসাম আলোর বিচ্ছুরণও আবিষ্কার করেছিলেন, কীভাবে আলো বিভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়। তিনি ছায়া, রঙধনু ও চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কেও অধ্যয়ন করেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে বাউন্স করে। তিনি বায়ুমণ্ডলের উচ্চতা প্রায় নির্ভুলভাবে পরিমাপ করেছিলেন এবং তার মতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উচ্চতা প্রায় ১০০ কিলোমিটার। বহু স্কলারের অভিমত এই যে, ইবনে হাইসাম-ই গ্রহের কক্ষপথ ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং এরই ভিত্তিতে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, কেপলার এবং নিউটন অনেক পরে গ্রহের গতির তত্ত্ব দিয়েছিলেন।
পরিশেষে বলতে হয়, আধুনিক বিজ্ঞান মুসলমানদের কাছে কতটুকু ঋণী এবং মুসলমানরা বিজ্ঞান চর্চায় কতটুকু অগ্রসর ছিলেন, এ ঘটনা থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে পরিতাপের বিষয় হলো, সব মুসলিম বিজ্ঞানীর নাম ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করে বিকৃত করা হয়েছে। শুধু নাম বিকৃত করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, বিকৃত করেছে পুরো ইতিহাসকে। এছাড়া আরও কতভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান অস্বীকার অথবা তাদের অবদানকে খাটো করার হীন চক্রান্ত চালানো হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
