দেশি তেলে ভরসা বিদেশি তেলে না

আপডেট : ১০ মার্চ ২০২৪, ১১:৩১ এএম

আগামী বছরের মধ্যে সয়াবিন তেল ও পাম অয়েলের আমদানি ব্যয় ৪০ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার; যা টাকার অঙ্কে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়িয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা হবে। এ জন্য ইতিমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় স্বল্পমেয়াদি আধুনিক জাত অন্তর্ভুক্ত করে সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, সয়াবিনসহ তেল ফসলের আবাদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

সূত্র জানায়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৪ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্য তেল প্রয়োজন হয়। যার বেশিরভাগই সয়াবিন ও পাম অয়েল। ভোজ্য তেলের বিপুল চাহিদার বিপরীতে দুই-তিন বছর আগেও দেশে মাত্র ৩ লাখ মেট্রিক টন বা ১০ শতাংশের মতো অভ্যন্তরীণভাবে মেটানো হতো। যার ৯৮ ভাগই সরিষার তেল। যেহেতু দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ ভোজ্য তেলই আমদানিনির্ভর, তাই বরাবরই দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকে। ভোজ্য তেলের দাম হুটহাট বেড়ে যায়, বাজারে থাকে অস্থিরতা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ হেক্টর জমিতে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন হচ্ছে। যার বেশিরভাগই সরিষা। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে চাহিদার ৪০ শতাংশ পূরণ করতে হলে তিন গুণ, অর্থাৎ প্রায় ২৪ লাখ হেক্টর জমির প্রয়োজন। তেলজাতীয় ফসল আবাদের উপযোগী এ পরিমাণ জমি নেই। তবে বোরো ও আমন ধানের মৌসুমের মাঝখানে পতিত থাকে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি, এর বাইরে দেশের নদী এলাকা তথা চর এবং উপকূলীয় এলাকার জমিতে তেলজাতীয় ফসল আবাদের পরিধি বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া কোন এলাকার জমি কখন খালি পড়ে থাকে, এর তালিকা করে তেলজাতীয় ফসল চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। ২২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২০-২৫ মেয়াদে ২৫০টি উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম চলমান। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রচলিত শস্য বিন্যাসে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষিত স্বল্পমেয়াদি আধুনিক জাত অন্তর্ভুক্ত করে সরিষা, তিল, সূর্যমুখী, চীনাবাদাম, সয়াবিনসহ তেল ফসলের উৎপাদন ও আবাদ ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হবে। প্রকল্পের অধীনে এ বছর ১২ লাখ কৃষককে প্রণোদনাও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) ও বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) উদ্ভাবিত তেল ফসলের আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ এবং মৌ-চাষ অন্তর্ভুক্ত করে তেলজাতীয় ফসলের হেক্টরপ্রতি ফলনও ১৫- ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপারে একটি প্রকল্প চলছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে আরও বেশি কাজ হচ্ছে। ফলে গতি অনেক বেশি বেড়েছে।’

তিনি জানান, প্রকল্পটি ২০২০ সালে শুরু হলেও মূল কাজ শুরু হয়েছে ২০২১-২২ অর্থবছরে। ওই বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ৫ লাখ হেক্টর বেশি জমিতে তেলজাতীয় ফসলের চাষ হয়েছে। তাদের লক্ষ্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভোজ্য তেলের আমদানি ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো। এই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন সম্ভব না হলেও কাছাকাছি যেতে পারবেন বলে মনে করছেন তারা।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে তেলজাতীয় ফসলের চাষ হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮ লাখ ১২ হাজার হেক্টর ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০ লাখ ৯৬ হাজার হেক্টর জমিতে তেলজাতীয় ফসলের চাষ হয়েছে। ফলে এ বছর প্রায় ৫ লাখ টন তেল উৎপাদন হবে। তেলজাতীয় ফসলের মধ্যে সরিষাই মুখ্য। এর বাইরে চীনাবাদাম, তিসি, তিল, সয়াবিন ও সূর্যমুখী অন্যতম।

জানা যায়, সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে ইতিমধ্যে বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। দুই-তিন বছর আগে যেখানে খোলাবাজারে প্রতি লিটার সরিষার তেল ২০০ থেকে ২২০ টাকায় কিনতে হতো, এখন সেই তেলের দাম ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। আর স্বাস্থ্যগুণ বিবেচনায় মানুষের মধ্যে সরিষার তেলের ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এখন শহরাঞ্চলের অনেক মানুষও সয়াবিন তেল বাদ দিয়ে সরিষার তেল ব্যবহার শুরু করেছেন।

কৃষিবিদরা বলছেন, দেশে তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনের মূল সমস্যা হলো জমির স্বল্পতা। ধানসহ অন্যান্য ফসলের তুলনায় কৃষকরা এ ফসল চাষে কম আগ্রহী। বর্তমানে দেশে ফসল আবাদের ৭৫ শতাংশ জমিতে দানাজাতীয় ফসলের চাষ হয়। অন্যদিকে ক্রমেই তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে ব্রিধান ৭১, ব্রিধান ৮১, ব্রিধান ৮৯, ব্রিধান ৯২সহ উন্নত জাতের ধান চাষ করে হেক্টরপ্রতি এক টন উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এটি করতে পারলে ১০ শতাংশ জমি উদ্বৃত্ত থাকবে। যাতে ধান চাষ না করে অন্যান্য ফসল চাষ করা যাবে। এ ছাড়া উন্নত জাতের ধান ও সরিষার চাষ করে শস্যের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব; বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুরে আমন ধান বেশি হয়। এসব জায়গায় সরিষার আবাদ বাড়ানো হচ্ছে। আর বরিশাল, সাতক্ষীরা অঞ্চলে শুধু রোপা আমন করে, স্যালাইনিটির জন্য এখানে বোরো ধান করতে পারে না। সেখানে সূর্যমুখী, সয়াবিন চাষের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। চরাঞ্চল, বিশেষ করে যমুনা, পদ্মাবিধৌত অঞ্চল, নোয়াখালী, ভোলা, হাতিয়া এসব জায়গায় বাদাম চাষ সম্ভব। ওই সব এলাকায় আবার পতিত জমিও আছে, সেটাও অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় সরিষাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় উপকূলীয় এলাকায় প্রায় এক কোটি নারকেলগাছ রোপণের চিন্তা করা হচ্ছে। যেখান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নারকেল তেল আসবে, উপরন্তু উপকূলে ঝড়ঝাপ্টা থেকেও সুরক্ষা পাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত