বিকাশে টাকা যায় প্রিয়জন ফেরে না

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৩ এএম

সপ্তাহে সপ্তাহে বিকাশে টাকা যায়। আর স্বজনের জন্য পথ চেয়ে থাকে পরিবার। কিন্তু তাদের অপেক্ষা ফুরায় না। দিন যায়, সপ্তাহ কেটে যায়। মাস শেষ হয়ে বছরও ফুরায় তবু তাদের অপেক্ষা ফুরায় না। ফিরে আসে না তাদের প্রিয়জন, সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি। কবে ফিরবে, আদৌ ফিরবে কি না, তাও জানে না। টেকনাফের নাফ নদে মাছ শিকারে গিয়ে ফিরে না আসা জেলে লিটন মিয়ার পরিবারের করুণ আক্ষেপ এটি।

লিটন মিয়ার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায়। তার অপহৃত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে স্ত্রী রোজিনা আক্তার বলেন, গত ২৪ মার্চ মাছ শিকার করতে বের হন তার স্বামী লিটন। ২৭ মার্চ খবর পান তিনি মিয়ানমার কারাগারে বন্দি। গত চার মাস দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, যে যেখানে বলেছেন ছুটে গেছেন, কারাগার থেকে লিটনকে মুক্ত করতে সক্ষম হননি রোজিনা। ঢাকায়ও এসেছেন, মানববন্ধন করেছেন; পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ হয়েছে কিন্তু মুক্ত হয়নি তার স্বামী লিটন। লিটনের সঙ্গে আরও ১৫ জেলে একই দিন আটক হন মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে। তারা সবাই ছয় মাসের কারাদ-ে দ-িত হয়ে জেল খাটছেন এবং সবার পরিবার একই পরিস্থিতির শিকার বলে জানান রোজিনা।

দৈনিক মজুরিতে বিভিন্ন মালিকের ট্রলার নিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নদী-সাগরে মাছ শিকার করতে যান লিটনের মতো আরও অনেক জেলে। একেকটি ট্রলারে ১৫ থেকে ২০ জন জেলে থাকেন। একটু হেরফের হলেই আটকে পড়েন জেলেরা। তাদের কেউ ফেরেন, কেউ জেলের ঘানি টানেন মাসের পর মাস। এর কোনো সমাধান হয় না। অসহায় পরিবারগুলোর অসহায়ত্বের খবর, অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও কষ্টগাথা গল্প আড়ালেই থেকে যায়। পরিবারগুলোর অভিযোগ রাষ্ট্রও খবর রাখে না তাদের।  

লিটনের স্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছেলেমেয়েসহ সুখেই জীবনযাপন করছিলেন তারা। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী খোয়াচনগর এলাকায় ভাড়া বাসা থাকেন তারা। মেয়ে তানিয়া আক্তার ফাতেমা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে আর ছেলে তাহিদুল ইসলাম কেজি স্কুলে লেখাপড়া করে। লিটনের অনুপস্থিতিতে সুখের সংসারে এখন দৈন্যদশা। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। নিরুপায় হয়ে সংসার চালাতে তার স্ত্রীকে ঝিয়ের কাজ করতে হচ্ছে। ছেলেমেয়ের লেখাপড়া বন্ধের উপক্রম হয়েছে। বাসা ভাড়া দিতে না পারায় প্রতিদিন মালিকের মন্দ কথা শুনতে হয়।

এদিকে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। সপ্তাহে সপ্তাহে মিয়ানমারের কারাগারে টাকা পাঠাতে হয় লিটনসহ জেলে পরিবারগুলোকে। টাকা না পাঠালে লিটনের কারাবাস দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কিন্তু সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া রোজিনার জন্য বিকাশে টাকা পাঠানো সব সময় সম্ভব হয় না। আবার কারাগার থেকে বের করার বাড়তি চাপও নিতে হচ্ছে তাকে। এ ছাড়া কারাগারে স্বামীর দুর্বিষহ জীবন রোজিনাকে আরও ব্যথিত করে তোলে।

অন্যদিকে লিটনসহ অন্য জেলেরা মিয়ানমার কারাগারে নাকি জলদস্যুদের কাছে বন্দি তা নিশ্চিত নয় জেলে পরিবারগুলো। তবে ট্রলার মালিকসহ অনদের ভাষ্যমতে তারা মিয়ানমার কারগারের বলে অনুমান লিটনের স্ত্রী রোজিনার। তিনি জানান, লিটন যেখানে বন্দি, সেখানে কোনো আলো নেই। দিনের বেলায়ও অন্ধকার। তাদের সামান্য খাদ্য দেওয়া, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং বিকাশ নম্বরে সপ্তাহ সপ্তাহ টাকা পাঠাতে হয়।   

রোজিনা বলেন, মিয়ানমারের নম্বর থেকে ফোন আসে। সেখান থেকে দেশীয় বিকাশ নম্বর দেওয়া হয়, টাকা পাঠাই সে নম্বরে। টাকা পেয়ে প্রাপ্তি স্বীকার করা হয় মিয়ানমারের কারাগার থেকে। এর বাইরে মিয়ানমার কারাগারে আটক জেলেরা কবে ফিরবে, আদৌ ফিরবে কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলতে পারে না অসহায় পরিবারগুলোর স্বজনরা।

যাদের অধীনে চাকরি করে, সাগরে মাছ ধরতে যায় এসব জেলেরা বিপদে পড়লে, মিয়ানমার সরকার বাহিনীর হাতে আটক হলে সেসব মালিকও আর খবর রাখে না জেলে পরিবারগুলোর। শুধু আশ্বাস দেয়। কয়েক মাস পর ট্রলার মালিকরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অসহায় জেলে পরিবার যোগাযোগ করলে, খবর জানতে চাইলে বিরক্ত প্রকাশ করে, ধমকও দেয় ট্রলার-বোর্ড মালিকরা।

কারাবন্দি জেলে লিটনের স্ত্রী বলেন, এই পর্যন্ত বিকাশে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়েছি। দুই সন্তান নিয়ে আমি অনেক কষ্টে আছি। মানুষের বাসায় কাজ করে দিন পার করছি। আমার ছেলেমেয়ে তাদের বাবার জন্য শুধু কান্নাকাটি করে। আমরা ১৬ জেলে পরিবারের সবাই অনেক বার ঢাকায় গিয়েছি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়েছি, কোনো কূলকিনারা পাইনি। মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফায় আবেদন করা হয়েছে জানিয়ে রোজিনা বলেন, সরকার কোনো গুরুত্ব দেয় না। কোথায় গেলে এ বিষয়টি গুরুত্ব পাবে, আমাদের প্রিয়জন ফিরে আসবে জানি না।

লিটনের কারাবন্দি জীবনের বর্ণনা দিয়ে রোজিনা বলেন, স্বামী কারাগার থেকে ফোন দেয়। জানায়, অনেক কষ্টে আছে তারা। কান্নাকাটি করে। অসুস্থতার কথা জানায়। কারাগারে খাবার দেয় না। কলাগাছের সবজি খেতে দেয়। তিন বেলায় তিন চামচ ভাত দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। এতে সেখানে আটক জেলেদের ক্ষুধা মেটে না। গত ২৩ জুলাই লিটনের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে। বলেছে, আমাকে মুক্ত করে নাও, না হয় আমার আশা বাদ দিয়ে দাও। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। লিটন বেঁচে আছে নাকি মেরে ফেলেছে, সে আশঙ্কায় দিন কাটছে রোজিনার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত