আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক থেকে আবুধাবি আসার ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপথটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জানার পরও জাহাজে কোনো অস্ত্রধারী পাহারা রাখা হয়নি। এমনকি জাহাজে যাতে কেউ উঠতে না পারে সেজন্য বৈদ্যুতিক তার দিয়ে চারদিক প্যাঁচানো থাকার কথা এবং ওপরের দিকে কাঁটাতারের রেলিং থাকার কথা থাকলেও ‘এমভি আবদুল্লাহ’তে অনুপস্থিত ছিল। এ ছাড়া উদ্ধারকারী যুক্তরাজ্য নেভি থেকে সাড়া না পাওয়া। আর এতেই জলদস্যুদের কাছে সহজ হয়েছে জাহাজটি জিম্মি করার। মূলত এই তিন কারণে গত মঙ্গলবার দুপুর দেড়টায় বাংলাদেশি কেএসআরএমের মালিকানাধীন এসআর শিপিংয়ের আওতায় চলাচলকারী ‘এমভি আবদুল্লাহ’কে ২৩ নাবিকসহ জিম্মি করে সোমালিয়ান দস্যুরা।
এর আগে ২০১০ সালে সোমালিয়ান দস্যুদের হাতে একই প্রতিষ্ঠানের অন্য জাহাজ ‘এমভি জাহান মনি’ আটক হয়েছিল। ১০০ দিন জিম্মি থাকার পর মুক্তিপণ দিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। এবারও ইতিমধ্যে ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মুুক্তিপণ দাবি করেছে এবং টাকা না দিলে জাহাজের সব নাবিককে একে একে মেরে ফেলা হবে জিম্মিকৃত নাবিকরা তাদের পরিবারের কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন।
মোজাম্বিক থেকে জাহাজটি আবুধাবি যাওয়ার পথে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম রুট অনুযায়ী সঠিক পথেই যাচ্ছিল উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই রুটটি নৌ-বাণিজ্যের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ।
এই পথ দিয়ে অন্য জাহাজগুলো যেমন পরিচালিত হয়, এই জাহাজটিও পরিচালিত হচ্ছিল। কিন্তু তারা বিপদগ্রস্ত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের নেভিকে বার্তা পাঠিয়েছিল। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া এই এলাকার নৌ-নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের টাস্কফোর্স রয়েছে, সেখান থেকেও রেসপন্স না আসায় জাহাজের ক্যাপ্টেন দস্যুদের সঙ্গে সমঝোতায় গিয়েছে হয়তো। এতে তাদের ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন হবে না।’
কিন্তু একটি জাহাজে সহজে কীভাবে দস্যুরা ওপরে উঠে গেল? কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল না। এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘উচ্চ ঝুঁকির রুটে কোনো জাহাজ চলাচল করতে গেলে অবশ্যই অস্ত্রধারী পাহারাদার নিতে হয়। এ ছাড়া জাহাজের নিচের দিকে বৈদ্যুতিক তার যুক্ত কিছু চাকতি থাকে। যাতে এই জাহাজের সঙ্গে কিছু যুক্ত হলে বৈদ্যুতিক শক খাবে এবং তখন ওঠা যাবে না। এ ছাড়া জাহাজের ওপরে আড়াই থেকে তিন ফুট উচ্চতার কাঁটাতারের বেষ্টনী থাকবে এবং সেখানেও বিদ্যুতের লাইন যুক্ত রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই জাহাজটিতে আমরা এর কিছুই দেখলাম না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মোজাম্বিক একটি গরিব দেশ। সেই দেশে হয়তো অস্ত্রধারী পাহারাদার নিয়োগের সুযোগ ছিল না। আর এই সংবাদ হয়তো সোমালিয়ান দস্যুরা জানত। অন্যথায় এই রুটে অন্য জাহাজ চলাচল করলেও শুধু এই জাহাজকে টার্গেট করা হলো কেন?’
এই উত্তরের সঙ্গে একমত পোষণ করে এমএমসি শিপিংয়ের হেড অব অপারেশন আজমির হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দস্যুরা হয়তো আগেই টার্গেট করেছিল জাহাজটিকে আক্রমণের জন্য। আর সোমালিয়ান দস্যুরা এতটাই মারাত্মক যে তাদের জীবনের কোনো মায়া নেই। তাই যেভাবেই হোক তারা আক্রমণ করে।’
অভিযোগ রয়েছে, দস্যুরা জানত এই জাহাজে নিরাপত্তা প্রটোকল নেই : এই রুটে অনেক জাহাজ চলাচল করলেও অন্য জাহাজে আক্রমণ না হলেও এখানে কেন হলো? আর হুতিদের আক্রমণ তো হচ্ছে লোহিত সাগরে। ইসরায়েলগামী জাহাজে তারা আক্রমণ করে থাকে। সোমালিয়ান দস্যুদের আক্রমণ সহসা হচ্ছিল না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘নিরাপত্তা প্রটোকল (অস্ত্রধারী পাহারাদার) দস্যুরা আগে থেকে জানত কি না তা বলার সুযোগ নেই। এটা জাহাজের মালিক কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে। তবে প্রটোকল না থাকার কারণেই তারা আক্রমণের সাহস পেয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাজের মালিক কেএসআরএম গ্রুপের মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক রুটে জাহাজ চলাচলের নীতিমালা অনুযায়ী সব পদক্ষেপ মেনেই জাহাজ চালাচ্ছিলাম। আর যে এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ, সেই এলাকাটিকে বাইপাস করে গভীর সাগরের আরও ভেতরের দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু সোমালিয়ান দস্যুরা এতই মারাত্মক যে তারা যে জাহাজকে টার্গেট করে সেই জাহাজকে আক্রমণ করবেই।’
‘গোল্ডেন হক’ নামের জাহাজটি কেএসআরএমের বহরে যুক্ত হওয়ার পর এর নাম হয় ‘এমভি আবদুল্লাহ’। গত মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু থেকে প্রায় ৬০০ নটিক্যাল মাইল পূর্বের ভারত মহাসাগর থেকে জাহাজটি জিম্মি করে সোমালিয়ান জলদস্যুরা। বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যে এটি সোমালিয়ান জলদস্যুদের আস্তানায় পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
