সহকারী প্রক্টর ও সহপাঠীর সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৪, ০২:৫৫ এএম

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় তার সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকী ও বিশ্ববিদ্যালয়টির সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল রবিবার সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ. মহিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তার প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ।

এদিকে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে অবন্তিকার আত্মহননের ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে এতে জড়িতদের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে জবি ক্যাম্পাসসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গতকালও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে কুমিল্লা শহরে নিজেদের বাড়িতে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেন জবির আইন বিভাগের ১৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অবন্তিকা (২৪)। তার বাবা প্রয়াত জামাল উদ্দিন সরকারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। মা ছিলেন কুমিল্লা পুলিশ লাইনস উচ্চ বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক। মৃত্যুর আগে ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে অবন্তিকা তার সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন। আর জবির সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের বিরুদ্ধে আম্মানের পক্ষ নিয়ে তার (অবন্তিকা) সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগ করেন।

অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় আম্মান ও দ্বীন ইসলামকে গত শনিবার রাতে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। পরে তাদের কুমিল্লা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে ওই দিনই রাতে এই দুজনকে আসামি করে অবন্তিকাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনম।

গতকাল দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলার ভিত্তিতে কুমিল্লা পুলিশের চাওয়া অনুযায়ী দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তারা আমাদের ঘটনার খণ্ডিত অংশ জানিয়েছে। তদন্তের আগে পূর্ণাঙ্গ অংশ বলা সম্ভব না। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, এ ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা আছে। তবে গভীরতা কতখানি বা তাদের কার দিকে কত দায় সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ঢাকা মহানগর পুলিশ বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকে নজরদারিতে ছিল। কুমিল্লা জেলা পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে আমরা তাদের গ্রেপ্তার করি। তিন দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছে। তারা এ সময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল।’

অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় হওয়া মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকী অফলাইনে ও অনলাইনে অবন্তিকাকে বিভিন্নভাবে মানসিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করে আসছিল। তার বিরুদ্ধে সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের কাছে অভিযোগ করলে তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো অবন্তিকাকেই নানাভাবে অপমান করেন।

এই মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার ওসি ফিরোজ হোসেন বলেন, ‘আমরা ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের দিকনির্দেশনামতো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

বিক্ষোভ অব্যাহত : অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় গতকালও প্রতিবাদী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন জবির শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যার পর থেকে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ সমাবেশ, মশাল মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন তারা। ‘সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’ এবং ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ব্যানারে এসব কর্মসূচি পালন হয়। কর্মসূচি থেকে শিক্ষার্থীরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা অবন্তিকাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। রাত ৮টার দিকে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ’-এর ব্যানারে মশাল মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এরপর হয় সংক্ষিপ্ত সমাবেশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে শিক্ষার্থীদের পক্ষে ফিন্যান্স বিভাগের ছাত্র তৌফিকুল ইসলাম ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো অবিলম্বে তদন্ত করে দোষীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, সংশ্লিষ্ট সবাইকে তদন্ত সাপেক্ষে জবাবদিহির আওতায় আনা, আগে ঘটে যাওয়া নিপীড়নের বিচার নিশ্চিত, প্রতিটি বিভাগে নিপীড়নবিরোধী সেলের অভিযোগ বাক্স স্থাপন, কাউন্সেলিংয়ের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং এসব দাবি আগামী সাত দিনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা।

একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত চত্বরে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ব্যানারে অবন্তিকা ‘হত্যা’র সুষ্ঠু বিচার দাবিতে পারফর্মিং আর্ট প্রদর্শন করেন নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

এর আগে দুপুরে অবন্তিকার আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ।

বিক্ষোভ মিছিল করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরাও। গত শনিবার রাত ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে শিক্ষার্থীরা ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে মিছিল বের করেন। মিছিলটি কয়েকটি সড়ক ঘুরে বটতলায় গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়। সমাবেশে অবন্তিকার আত্মহত্যার ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন আন্দোলনকারীরা।

এ ছাড়া অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিচার চেয়ে গতকাল মানববন্ধন করেন ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের একাংশের নেতাকর্মীরা। দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়কে এই মানববন্ধন করেন তারা। মানববন্ধনে অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে এ ঘটনার নেপথ্যে থাকাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান নেতাকর্মীরা।

অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত শেষে দায়ীদের দৃশ্যমান সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে বরিশালে। গতকাল দুপুরে নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল বরিশাল জেলা শাখার উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা এবং জাবি ও বরিশাল প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত