বড় বাজার মূলধনী কোম্পানিগুলোর দরপতনে গতকাল আবারও পুঁজিবাজারে সূচকগুলো ব্যাপক হারে কমেছে। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হওয়া ৮০ শতাংশ শেয়ারের দরপতনে স্টক এক্সচেঞ্জটির প্রধান মূল্যসূচক ৮৪ পয়েন্ট হারিয়েছে। গত ২১ জানুয়ারি ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরপতন। গতকাল নিয়ে টানা আট কার্যদিবসের দরপতনে ডিএসইর ডিএসইএক্স হারিয়েছে ৩৫২ পয়েন্ট। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর পুঁজিবাজারের এমন পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি তৈরি করছে।
তবে এমন পতনের কয়েকটি বাস্তব কারণও রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। একাধিক ব্রোকারেজ হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফ্লোর প্রাইসের কারণে অনেকেই জরুরি প্রয়োজনে দীর্ঘদিন ধরে টাকা তুলতে পারছিলেন না। তারা এখন ক্রেতা পাওয়ায় শেয়ার বিক্রি করছেন। একই পরিস্থিতি বিদেশিদের ক্ষেত্রেও। তারা শেয়ার কিনলেও বিক্রি করছেন বেশি। এছাড়া প্রতি বছরই রোজার শুরুতে ঈদ খরচের চাহিদা মেটাতে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করেন। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ফলে স্বাভাবিক কারণেই পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়েছে। এছাড়া জেড ক্যাটাগরি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এসইসির নির্দেশনার প্রভাবও রয়েছে। যেসব বিনিয়োগকারী জেড ক্যাটাগরির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করে দাম বাড়িয়েছিলেন পরবর্তী পতনে তারাও এখন আটকে গেছেন। সাধারণত পুঁজিবাজারে টানা পতনের সময়টাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বাড়াতে উদ্যোগ নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। তবে এবার প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাড়া দিচ্ছেন না। বরং এসব বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আরও পতনের অপেক্ষায় রয়েছে, যাতে করে কম দরে শেয়ার কেনা যায়। এসব প্রতিষ্ঠান মার্জিনে কেনা গ্রাহকদের শেয়ার ফোর্সড সেল (বাধ্যতামূলক বিক্রি) দিয়ে পতন ত্বরান্বিত করছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত। তাদের আশঙ্কা আগামীতে অর্থনীতির আরও অবনতি হতে পারে, যার প্রভাবে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে যেতে পারে। এমন আশঙ্কায় অনেকেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সাইড লাইনে ফিরে গেছেন। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিদেশি মুদ্রা বিশেষ করে ডলারের দাম কমেছে। বিপরীতে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বাড়ছে। আমদানির চাপও কমেছে। তাই বিদেশি মুদ্রা নিয়ে গত দুই বছর ধরে অস্থিরতা চলে আসছে, তা এখন কিছুটা কমেছে। তবে ব্যাংকে তারল্য সংকট বর্তমানের দরপতনে ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সংকট মেটাতে অনেক ব্যাংকই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ডলার জমা রেখে টাকা নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগে ব্যাংকগুলোর কোনো অংশগ্রহণ নেই। এদিকে ব্রোকারেজ হাউজের একাধিক কর্মকর্তা পুঁজিবাজারের তারল্য সংকটের জন্য সুদের হার বৃদ্ধিকেও দায়ী করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে টাকার প্রবাহ কমানোর পাশাপাশি সুদের হারও বাড়তে দিচ্ছে। এ কারণে অনেক বিনিয়োগকারী ঝুঁকিপূর্ণ পুঁজিবাজারের চেয়ে ব্যাংকে টাকা রাখাকেই অধিক নিরাপদ মনে করছেন। বর্তমানে ব্যাংকে আমানত রাখলে প্রায় ১৪ শতাংশ সুদ পাওয়া যাচ্ছে, যা ঝুঁকিমুক্ত। এমনকি সরকারি ট্রেজারি বন্ডেও এখন সঞ্চয়পত্রের চেয়ে বেশি সুদ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে ব্যাংকে রাখছেন।
পুঁজিবাজারে টানা আট দিনের দরপতনে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স নেমে এসেছে ৫৮১৪ পয়েন্টে। সূচকের টানা পতনে দেশের পুঁজিবাজারকে তিন বছর আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। এর আগে সূচক সবচেয়ে কম ছিল ২০২১ সালের ২৩ মে, ৫৭৮৭ পয়েন্টে। গতকালের সূচক কমাতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বীকন ফার্মা। এ কোম্পানির শেয়ার দর প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ কমায় ডিএসইএক্স কমেছে ৯ দশমিক ৬ পয়েন্ট। রবির শেয়ার দর ১০ শতাংশ কমায় ডিএসইএক্স হারিয়েছে ৭ দশমিক ৬২ পয়েন্ট। এছাড়া বিএটিবিসি, রেনেটা, বেক্সিমকো ফার্মা, ব্র্যাক ব্যাংক, ওরিয়ন ইনফিউশনস, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, উত্তরা ব্যাংক ও ওরিয়ন ফার্মার দরপতনে সূচকটি কমেছে আরও ২২ পয়েন্ট।
