চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) দুটি জোনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেই। গত ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে চলতি মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত ৪৯ দিনে গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত, দাগি অপরাধী গ্রেপ্তার এবং মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রশ্ন তুলেছেন নগর পুলিশেরই সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা বলেন, ঈদের বাকি আর ১৮-১৯ দিন। রমজানের পাশাপাশি ঈদ সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক অপরাধ চক্র। এর মধ্যে আছে ছিনতাই, ভেজাল বাংলা ও লাচ্ছা সেমাই, প্রতারক ও জাল নোট চক্র। কিন্তু এসব চক্রের কার্যক্রম প্রতিরোধে ডিবির দুটি জোনের দৃশ্যমান তেমন কোনো তৎপরতা নেই।
সিএমপির গণমাধ্যম শাখা থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ঘেঁটে দেখা যায়, উল্লিখিত ৪৯ দিনে নগরের বিভিন্ন থানা পুলিশ অপরাধী বিশেষ করে ছিনতাইকারী ও চোর চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং চোরাই স্বর্ণালংকার উদ্ধার অভিযানে সফলতা দেখিয়েছে। কিন্তু মহানগর ডিবির দুটি ইউনিট এ সময়ে মাত্র দুটি অভিযান চালিয়ে ১০১ বোতল বিদেশি মদ এবং ৫১টি চোরাই মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে পেরেছে।
এর মধ্যে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে মহানগর ডিবির (উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগ) একটি দল খুলশী থানা এলাকার ওয়্যারলেস মোড়ে অভিযান চালিয়ে ১০১ বোতল বিদেশি মদ এবং একটি জিপ গাড়িসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে নগরের পাহাড়তলী থানার মৌসুমি আবাসিক এলাকা থেকে ৫১টি চোরাই মোবাইল ফোনসহ একজনকে গ্রেপ্তার করে মহানগর ডিবির বন্দর ও পশ্চিম বিভাগ।
কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়া প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে মহানগর ডিবির (উত্তর ও দক্ষিণ) উপকমিশনার সাদিরা খাতুনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া মেলেনি।
তবে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মহানগর ডিবির ওই ইউনিটের পদস্থ এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, গত ৪৯ দিনে ১০১ বোতল বিদেশি মদ ও ৫১টি চোরাই মোবাইল ফোন উদ্ধার ছাড়া তাদের আর কোনো সাফল্য নেই। এ সময়ে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, দাগি অপরাধী গ্রেপ্তার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মামলা তদন্তে সাফল্য শূন্যের কোটায়।
ডিবির কার্যক্রম নিয়ে সিএমপির গত ফেব্রুয়ারি মাসের ক্রাইম কনফারেন্সে অসন্তোষ প্রকাশ করেন নগর পুলিশের পদস্থ একাধিক কর্মকর্তা। এ ছাড়া সম্প্রতি আবু বকর নামে এক ফ্রিল্যান্সারের বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট থেকে বিটকয়েন সরানোর কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে নগর ডিবির পরিদর্শক রুহুল আমিনকে কারণ দর্শানোর নোটিস এবং ছয় পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনায় ভাবমূর্তির সংকট তৈরি হয়েছে বলেও মনে করছেন নগর ডিবির দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা।
ওই ঘটনায় কাউসার নামে এক সোর্সকে গ্রেপ্তারের পর উল্টো আবু বকরের নামে ডিবি সদস্য বাদী হয়ে মামলা করেন। এর মাধ্যমে ‘উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী আবু বকরের।
জানা গেছে, সিএমপির ডিবি বর্তমানে দুটি জোনে বিভক্ত। বন্দর ও পশ্চিম মিলে এক জোন এবং দক্ষিণ ও উত্তর মিলে আরেক জোন। এ দুই জোনের দায়িত্বে আছেন দুজন উপপুলিশ কমিশনার।
অতীত রেকর্ড বলছে, নগরে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন খুনের ঘটনার রহস্যভেদ, খুনি গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা রাখতেন ডিবির চৌকস কর্মকর্তারা। কিন্তু এখন দক্ষ কর্মকর্তার অভাবে সেই সাফল্য আর ধরা দিচ্ছে না। কিন্তু সম্প্রতি দক্ষ কর্মকর্তার অভাব থাকায় অপরাধ তদন্তে ও অপরাধী শনাক্তে সফলতা আসছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে চাঞ্চল্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলা তদন্তের ভার পড়ছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট পিবিআই ও সিআইডির ওপর।
তবে নগর ডিবি পুলিশের ‘ব্যর্থতা’ এবং ‘ভাবমূর্তি সংকটে’ পড়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানা পুলিশ বা ডিবি পুলিশ সব ইউনিট সমন্বিতভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। অপরাধী গ্রেপ্তার বা বিশেষ অভিযানে থানা পুলিশের সাফল্য আছে। তার অর্থ এই নয় যে, ডিবি পুলিশ ব্যর্থ। এটা পুলিশ কমিশনার স্যারের কৌশল। কখন কোন ইউনিট দিয়ে তিনি কাজ করাবেন।’
সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ডিবির উত্তর বিভাগে পাঁচ টিমের মধ্যে ডিসি, এডিসিসহ সদস্য আছেন ৭০ জন। এর মধ্যে পরিদর্শক ৮, এসআই ১২, এএসআই ১৮ ও কনস্টেবল ৩২ জন। আর বন্দর জোনের সদস্য সংখ্যা ৭০ জন। এর মধ্যে পরিদর্শক ৬, এসআই ৮, এএসআই ২০ ও কনস্টেবল রয়েছেন ৩৬ জন।
