আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গতকাল রবিবার থেকে ট্রেনের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। অনলাইনের মাধ্যমে শতভাগ টিকিট বিক্রি হওয়ায় ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে আগের মতো টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন কিংবা দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও টিকিট না পাওয়ার যন্ত্রণা নেই এবার। যাত্রীদের নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের পাশাপাশি টিকিট নিয়ে কালোবাজারি বন্ধে ইতিমধ্যে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
যাত্রীদের টিকিট কেনা সহজলভ্য করার সুবিধার্থে পশ্চিমাঞ্চলে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট সকাল ৮টা থেকে এবং পূর্বাঞ্চলের আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরু হয় দুপুর ২টা থেকে। পৃথক সময়ে টিকিট বিক্রি শুরুর ফলে টিকিট বিক্রির অনলাইন সার্ভারে চাপ তুলনামূলক কম হওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া কালোবাজারি বন্ধে নানা পদক্ষেপের কারণে এবার ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই অতীতের মতো টিকিট শেষ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। যাত্রীরা তুলনামূলক আস্তে-ধীরে ঈদযাত্রার টিকিট সংগ্রহ করতে পেরেছেন।
প্রথম দিনে টিকিট পেয়েছেন ৩ এপ্রিলের যাত্রীরা। আজ সোমবার বিক্রি হবে ৪ এপ্রিলের টিকিট। একইভাবে ২৬ মার্চ পাওয়া যাবে ৫ এপ্রিলের টিকিট, ২৭ মার্চ ৬ এপ্রিলের টিকিট, ২৮ মার্চ ৭ এপ্রিলের টিকিট, ২৯ মার্চ ৮ এপ্রিলের টিকিট এবং ৩০ মার্চ ৯ এপ্রিলের টিকিট বিক্রি হবে। আর ফিরতি টিকিট বিক্রি আগামী ৩ এপ্রিল শুরু হয়ে চলবে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত। এ ছাড়া ১০, ১১ ও ১২ এপ্রিলের টিকিট বিক্রি হবে ঈদের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে। ঈদের অগ্রিম ও ফেরত যাত্রার টিকিট রিফান্ড করা হবে না।
গতবারের মতো এবারও ঈদযাত্রার কোনো টিকিট কাউন্টারে বিক্রি করা হচ্ছে না। অনলাইনের মাধ্যমে রেলওয়ের ওয়েবসাইট, রেল সেবা অ্যাপ ও সহজ ডটকমের প্ল্যাটফর্ম থেকে টিকিট সংগ্রহ করা যাচ্ছে। তবে যাত্রার দিনে নন-এসি কামরায় মোট আসনের এক-চতুর্থাংশের সমান দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিট বিক্রি করা হবে। ঈদ উপলক্ষে সারা দেশের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেনের ৩৩ হাজার ৫০০টি টিকিট বিক্রি হবে। ঈদ উপলক্ষে সারা দেশের বিভিন্ন রুটে চলবে আট জোড়া বিশেষ ট্রেন।
অনলাইনে টিকিট সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো ওটিপি বা নির্দিষ্ট কোড ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ টিকিট সংগ্রহ করতে গেলে একটি নির্দিষ্ট ওটিপি বা সাংকেতিক কোড যাত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিবন্ধিত মোবাইল ফোন নম্বরে চলে যাবে। সেটি নিশ্চিত করার পরই টিকিট সংগ্রহ করতে পারবেন তিনি। একজন যাত্রী ঈদ অগ্রিম ও ফিরতি যাত্রার সময় (৩-১৯ এপ্রিল) সর্বোচ্চ একবার করে টিকিট কিনতে পারবেন। প্রতিবার সর্বোচ্চ চারটি টিকিট কেনার সুযোগ রয়েছে।
রেলপথমন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিকিট বিক্রি শুরুর পর ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে টিকিট শেষ হয়ে যায়। সার্ভার ডাউনের কারণে সাইটে প্রবেশ করা যায় না। এগুলো সব সত্যি। এই টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট জড়িত। যাদের সঙ্গে সহজের লোক এবং রেলের লোকও জড়িত। ইতিমধ্যে দুটি সিন্ডিকেটকে ধরে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ঠিকমতো টিকেটিং ব্যবস্থা চালু রাখার জন্য সহজকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া টিকিট কালোবাজারি বন্ধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ বন্ধেও নেওয়া হয়েছে নানারকম ব্যবস্থা।
আগাম টিকিট বিক্রির প্রথম দিন টিকিটের চাহিদা অন্য সময়ের চেয়ে কিছুটা কম দেখা গেছে। সকাল ৯টা পর্যন্ত কয়েকটি ট্রেনের কিছু আসন ফাঁকা ছিল। অন্য সময় টিকেট বিক্রি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি ট্রেনের টিকিটের চাহিদা বেশি। তবে একতা, দ্রুতযান, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, রংপর, নীলসাগর এক্সপ্রেস, লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ হয়ে যায়।
রেলওয়ের তথ্যমতে, পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন রুটের আন্তঃনগর ট্রেনের মোট আসনসংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। সকাল ৮টা থেকে টিকিট বিক্রি শুরুর পর দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ অঞ্চলে প্রায় ১৪ হাজার টিকিট বিক্রি হয়েছে। পরে সেই সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে।
কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. মাসুদ সারওয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথম দিনে টিকিটের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকলেও আস্তে আস্তে তা বাড়বে।’
টিকিট বিক্রির ব্যবস্থাকে আধুনিক এবং কালোবাজারি প্রতিরোধে গত বছর ১ মার্চ থেকে ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে অনলাইনে ও অফলাইনে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এরপরও নতুন নতুন কৌশলে চলছে টিকিট কালোবাজারি।
রেলের টিকিট বিক্রির বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজ ডট কম এবং রেলওয়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। গত শুক্রবার সহজ ডট কমের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই অভিযোগে এর আগেও সহজ ডট কম এবং রেলওয়ের কর্মচারীরা গ্রেপ্তার হয়েছেন।
