কুয়েতের মাটিতে বাংলাদেশকে ৫-০ গোলে হারানোর পরও ফিলিস্তিন দল নিয়ে কোনো নেতিবাচক ভাবনা নেই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের। আগামীকাল মাঠে ৯০ মিনিট তারা গলা ফাটাবে বাংলাদেশের জন্য। তবে যোগ করা সময়টুকু তারা বরাদ্দ রেখেছে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন দেখাতে।
বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপ যৌথ বাছাইয়ের বাংলাদেশের মলিন দশার অন্যতম কারণ ২১ মার্চ কুয়েতের মাটিতে ফিলিস্তিনের কাছে ৫-০ গোলে হার। আগামীকাল বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় সেই বড় হারের ক্ষতে প্রলেপ লাগানোর সুযোগ মিলবে। আঙিনার সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নিশ্চয় চাইবে প্রবল প্রতিপক্ষর কাছ থেকে পয়েন্ট কেড়ে নিতে। তাই স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রতিশোধস্পৃহা থাকার কথা বাংলাদেশের সবার মধ্যে। তবে সে রকম কিছু নেই। ফুটবলাররা হয়তো ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছেন, ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তেমন কিছু নেই। উল্টো তাদের মধ্যে কাজ করছে অন্য কিছু। ইসরায়েলের আগ্রাসনে ফিলিস্তিনের গাজায় মরছে হাজারো নিরীহ মানুষ। নারী, শিশুও বাদ পড়ছে না। বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের এই হামলার প্রতিবাদ হচ্ছে জোরালো কণ্ঠে। বাংলাদেশের মানুষ শুরু থেকেই ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের শোষণের প্রতিবাদ করে আসছে। সেটা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে অনেক। যার বহিঃপ্রকাশ বাংলাদেশের মানুষ করছে নানাভাবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে খেলার মাঠেও বাংলাদেশিদের হাতে লাল-সবুজ পতাকার পাশে শোভা পাচ্ছে ফিলিস্তিনের তেরঙা পতাকা। আগামীকালও এর ব্যতিক্রম হবে না। বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা প্রস্তুত প্রিয় দেশের ফুটবলারদের আতিথ্য দিতে। মাঠে প্রথম ৯০ মিনিট বাংলাদেশকে সমর্থন জানালেও যোগ করা সময়টুকু তারা বরাদ্দ রেখেছে ফিলিস্তিনের জন্য। বাংলাদেশের মানুষের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সমর্থনের কথা অবশ্য অজানা নয় দুদিন আগে ঢাকায় পা রাখা ফিলিস্তিন দলের। বাংলাদেশ তাদের কাছে যেন সেকেন্ড হোম।
রবিবার দুদলেরই রুদ্ধদ্বার প্র্যাকটিস সেশন ছিল। বাংলাদেশ কিংস অ্যারেনার প্র্যাকটিস সেশনে বিকেলে যে সময়টায় ঘাম ঝরিয়েছে, ঠিক সেই সময়টাতেই উত্তরার আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ন গ্রাউন্ডে প্রথমবারের মতো অনুশীন করে ফিলিস্তিন। যেহেতু মিডিয়ার অনুমতি ছিল না তাই বাধ্য হয়েই অন্যভাবে চেষ্টা চালিয়ে শেষ পর্যন্ত কথা বলা গেছে ফিলিস্তিন দলের ম্যানেজার জাবের জাব্বারিনের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে ফোনে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখানে আসার পর থেকে মনে হচ্ছে আমরা নিজেদের দেশেই আছি। বাংলাদেশ আমাদের সেকেন্ড হোম। এদেশের মানুষ যে সবসময় আমাদের পাশে আছে, সেটা এখানে আসার আগে থেকেই টের পেয়েছি। কুয়েতে হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি দুই দলকেই সমর্থন জানিয়েছে। যা দেখে অভিভূত হয়েছি। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দেখেছি তাদের ভালোবাসা ও সমর্থন। আমরা সত্যিই এরকম একটা দেশে খেলতে এসে খুব খুশি।’ ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলিদের বোমা হামলায় দুই শতাধিক ফুটবল সংশ্লিষ্টের মৃত্যুর কথা জানিয়ে জাব্বারিন বলেন, ‘ইসরায়েলিদের হামলায় প্রতিদিন শত শত মানুষ মরছে। এর মধ্যে ফুটবলাঙ্গনের প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে আমরা হারিয়েছি। আরও কত হারাতে হবে তা আল্লাহই বলতে পারেন।’
ফিলিস্তিন যে নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছে, এটা জানা বলেই বাংলাদেশে নিয়মিতই হয় এ নিয়ে প্রতিবাদ। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্রথম পর্বে মালদ্বীপের বিপক্ষে এবং দ্বিতীয়পর্বে লেবাননের বিপক্ষে ম্যাচের সময় ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নানা প্ল্যাকার্ড ও পতাকা ওড়াতে দেখা গেছে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের। কিংস অ্যারেনার বাইরে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন, স্টপ জ্যানোসাইড’ এ রকম ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মিছিল করতে দেখা গেছে বাংলাদেশ দলের স্বীকৃত ফ্যানগ্রুপ বাংলাদেশি ফুটবল আলট্রাসের সদস্যদের। এবার সেই ফিলিস্তিন দল খেলবে বাংলাদেশের বিপক্ষে। তাই বেশ কিছু প্রস্তুতি নিয়ে প্রায় সাতশ আলট্রাস মাঠে আসবে আগামীকাল। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান অভি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা প্রায় সাতশ সদস্য মাঠে থেকে দুই দলকে সমর্থন দেব। তবে প্রথম ৯০ মিনিট আমরা গলা ফাটাব নিজেদের দল বাংলাদেশের জন্য। তবে যোগ করা সময়টায় আমরা ফিলিস্তিনকে সমর্থন দেব।’
গ্যালারিতে আলট্রাসদের সরব উপস্থিতি বেশ প্রশংসিত হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে। আবার তাদের কারণেই সম্প্রতি ফিফার বড় জরিমানা গুনতে হয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে। দর্শকরা নিষিদ্ধ দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে স্টেডিয়ামে আবীর ওড়ানোয় বাফুফেকে ৪০ হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হয়। এবার আর অমন কিছু হবে না কথা দিয়ে অভি বলেন, ‘আমরা দেশের ক্ষতি হোক অমন কিছু আর করব না। আমাদের সব পরিকল্পনা বাফুফের কর্তাদের জানিয়েছি। তারা যেগুলো নিষেধ করছেন, সেগুলো বাদ দিচ্ছি। যেমন মাঠে এমন কোনো প্ল্যাকার্ড নিয়ে যাব না যাতে রাজনৈতিক কোনো ইস্যু হয়। তবে প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলের প্রতি ঘৃণা জানানোর বেশ কিছু পরিকল্পনা আমাদের ছিল। সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে আমরা ব্যতিক্রম কিছু উদ্যোগ নেব। যেমন ম্যাচের আগে মাঠের বাইরে আমরা ফিলিস্তিনের নিরীহ মানুষদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করব। সেখান থেকে ওঠানো অর্থ আমরা দলের হাতে তুলে দিতে চাই।’ ফিলিস্তিনের পাশাপাশি ম্যাচটি স্বাধীনতা দিবসে বলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে কেন্দ্র করে বিশেষ প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের পরিকল্পনা আছে আলট্রাসের।
বাফুফে আগে জানিয়েছিল এই ম্যাচের টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তবে রবিবার বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার বললেন ভিন্ন কথা, ‘গ্যালারিতে খুব বেশি দর্শক ধারণ করার সুযোগ নেই। যে কটি আসন, সেই কয়টা টিকিটই ছাড়া হয়েছে। এর মধ্যে সৌজন্য টিকিটের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই টিকিট বিক্রি থেকে খুব বেশি অর্থ উঠবে না। এত কম টাকা ফিলিস্তিনের হাতে তুলে দেওয়াটা সম্মানজনক হবে না।’
মাঠের লড়াইয়ে বাংলাদেশ কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে আগামীকাল কিংস অ্যারেনায় বিশেষ কিছু দৃশ্যের অবতারণা হবে, সেটা সমর্থকদের প্রস্তুতি দেখেই আগাম টের পাওয়া যাচ্ছে।
